২০০১ সালে তালেবানকে উৎখাত করে মার্কিন ও যৌথ সেনাবাহিনীর প্রচেষ্টায় আফগানিস্তানে প্রতিষ্ঠিত হয় গণতন্ত্র। শরিয়াহ শাসনের কঠোরতা থেকে বের হয়ে রাষ্ট্রটি বিভিন্ন অঙ্গনে সাফল্য লাভ করে। বিশেষত, শিক্ষা ও স্বাধীনতার ক্ষেত্রে, যা একসময় দেশটির লাখো নারীর কাছে স্বপ্নই ছিল। ২০ বছর পর পুনরায় তালেবানের হাতে আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ আসার পর আবারও একই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে- কী ঘটতে চলেছে দেশটির লাখো নারীর জীবনে? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন আব্দুল্লাহ আল মামুন

গতকালই পূর্ণ হলো ২০০১ সালে আমেরিকার নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে আল কায়দার বিমান হামলার ২০ বছর। যার পরিপ্রেক্ষিতে আল কায়দার প্রধান আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠা সে সময়কার তালেবান নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তানে সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ শুরু করে আমেরিকা। শরিয়াহ শাসনের নামে নির্যাতন, সন্ত্রাস আর নারীদের অবমাননাসহ নানা কারণে তালেবান সরকার বিশ্ববাসীর চক্ষুশূলে পরিণত হয়। আল কায়দা ও তালেবানকে হটিয়ে মার্কিন সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় জনতার সরকার গঠিত হয় আফগানিস্তানে।

২০ বছর পর এ বছরের শুরুর দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যখন আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন, তখন থেকেই আতঙ্ক- তবে কি আবারও অন্ধকার যুগে ফিরে যাবে আফগানিস্তান! দুশ্চিন্তা আর আলোচনার মধ্যেই আগস্ট মাসের ১৫ তারিখ তালেবান দখল নেয় আফগানিস্তানের প্রায় সব অঞ্চল।

তালেবানের আফগানিস্তান দখলের পর থেকে প্রধান প্রশ্ন দাঁড়ায়, দেশটির নারীদের কী হবে? ২০ বছর আগেকার তালেবান শাসনামলে নারীদের স্বাধীনতার বিষয়টি ছিল প্রায় শূন্যের কোঠায়। নারী শিক্ষার ছিল না কোনো বালাই, পর্দা এবং সঙ্গে একজন পুরুষ সঙ্গী ছাড়া রাস্তায় বের হওয়াও ছিল নিষিদ্ধ। প্রশাসন কিংবা খেলাধুলায় নারীদের অংশগ্রহণ ছিল অলীক কল্পনার মতো। ২০০১ সালের পর জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা পেলে আফগান নারীরা রাজনীতি, প্রশাসন, আইন, শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, শিক্ষা, গবেষণাসহ প্রায় সব মাধ্যমেই নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ রাখতে শুরু করে। কিন্তু তালেবানের হাতে আবারও আফগানিস্তানের শাসনভার চলে আসার পর থেকে দেশটির হাজারো নাগরিকের সঙ্গে পালানোর চেষ্টা করে বিভিন্ন মাধ্যমের প্রতিষ্ঠিত নারীরা। তাদের একটাই ভয়, তালেবান তাদের বাঁচতে দেবে না।

আফগানিস্তানের নারী বিচারকদের কথাই যদি বলি, দেশটিতে নারী বিচারকদের সংখ্যা প্রায় আড়াইশ। তালেবানের ভয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে পেরেছেন অল্প কয়েকজনই। বাকিরা রয়ে গেছেন দেশেই, পথ খুঁজছেন পালানোর। কারণ, একটা সময় এই নারী বিচারকরাই তালেবান সেনাদের বিভিন্ন অপরাধে নানা দণ্ডে দণ্ডিত করেছিলেন। গত সপ্তাহের একটি সংবাদে শোকের ছায়া নামে বিশ্বজুড়ে। আফগানিস্তানের ঘোর প্রদেশে বানু নেগার নামের এক নারী পুলিশ সদস্যকে নিজ বাসায় গুলি করে হত্যা করেছে তালেবান সদস্যরা। বানু নেগার সে সময় আট মাসের সন্তানসম্ভবা ছিলেন। এ ছাড়া তালেবানের ভয়ে আগস্ট মাসের শুরুতেই দেশ ছেড়েছেন দেশটির জনপ্রিয় পপ তারকা আরিয়ানা সইদ। আর বিশ্বমঞ্চে আফগান নারীদের স্বাধীনতা ও স্বাবলম্বিতার প্রতীক হয়ে ওঠা পরিচালক সারা কারিমি প্রাণভয়ে রাস্তায় ছুটছেন, বিশ্ববিবেক নাড়া দিয়েছে তার এ ছবি। এ ছাড়া দেশটির রাজধানী কাবুলের বিভিন্ন দেয়ালে বিজ্ঞাপনে ব্যবহূত নারী মডেলদের ছবিতে কালো রং মেখে দেওয়া হচ্ছে। আফগানিস্তানে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রথম নারী মেয়র জারিফা গাফারি। দেশটির রাজধানী কাবুল যখন দখল হয়ে যায়, তখন আর দেরি না করে পালিয়ে পরিবারসহ জার্মানি চলে আসেন গাফারি। গাড়ির সিটের পায়ের কাছে লুকিয়ে থেকে তালেবান চেকপোস্ট পেরিয়ে তাকে বিমানবন্দরে যেতে হয়।

নিজেদের গোঁড়ামির প্রথম চিহ্ন রেখেছে তালেবান সম্প্রতি নারী খেলাধুলা বন্ধ করার ঘোষণা দিয়ে। আফগান নারীদের ফুটবল ও ক্রিকেট নিষিদ্ধ করেছে দলটি। ফলে নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পেতে এবং জীবন বাঁচাতে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন নারী ক্রীড়াবিদরা। এরই মধ্যে গ্লোবাল ফুটবলার অ্যাসোসিয়েশন 'ফিফাপ্রো'র সহযোগিতায় ৫০ আফগান নারী ফুটবলার ও তাদের পরিবারের সদস্যরা অস্ট্রেলিয়ায় যেতে সক্ষম হয়েছেন। যারা রয়ে গেছেন, তারাও দেশ ছাড়তে বিশ্ববাসীর সহযোগিতা চাচ্ছেন। কাবুলের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পুনরায় খুললেও শ্রেণিকক্ষে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে পর্দা ঝুলিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বর্তমান তালেবান শাসকগোষ্ঠীর এক মুখপাত্র ক্ষমতা দখলের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে শরিয়াহ আইন অনুযায়ী নারীদের অধিকার রক্ষার কথা বলেছিল; বলেছিল, দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে নারীদের কাজেরও অনুমতি দেবে নতুন সরকার। কিন্তু শাসনভার হাতে নিয়ে আবারও বিভিন্ন পেশায় কর্মরত নারীদের কর্মস্থলে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে শাসকগোষ্ঠী। তারা বলছে, এটা যদিও সীমিত সময়ের জন্য; কিন্তু তাদের এই মিষ্টি কথায় ভুলতে চান না সে দেশের নারীরা। কেননা, সম্প্রতি নবগঠিত তালেবান মন্ত্রিসভায় কোনো নারী সদস্য নেই। যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করছেন কাবুল, হেরাত, বাদাখশান, পারওয়ান, নিমরুজসহ দেশের বিভিন্ন প্রদেশের নারীরা। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে গুলি ছুড়তে দ্বিধাও করছে না তালেবান সৈনিকরা।

আফগানিস্তানের নারীদের পাশে দাঁড়িয়েছে বিশ্ববাসী ও বিভিন্ন অঙ্গনের তারকারা। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার চাপে তালেবান সরকার হয়তো লোক দেখানোর জন্য হলেও আগের মতো কঠোর আর নির্দয় হবে না; কিন্তু আগামী দিনগুলোয় যে দেশটির নারীদের জীবন তামাশায় পূর্ণ হতে চলেছে, সে কথা বলা বাহুল্য।

তবুও আশায় বাঁধি বুক, আফগান নারীরা আবারও তাদের স্বাধীনতা ফিরে পাবেন। নারীরা যে কেবল সন্তান উৎপাদন যন্ত্র নয়, এ কথা মিথ্যা প্রমাণ করে নিজেদের যোগ্যতা দিয়ে নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা লাভ করবেন।

মন্তব্য করুন