সময়টা প্যান্ডামিকের। যখন পুরো পৃথিবী স্থবির হয়ে ছিল ভাইরাসের ছোবলে। ঠিক তখনই ঘরে বসে থাকা অনেক মানুষের মতো স্কুলশিক্ষিকা রওয়াইদা তানজিদা শ্রাবণীও ঝোঁকের বশে অনলাইন বিজনেসের খাতায় নাম লেখান। পেশাগত জীবনে তিনি জেলা শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন ২০১১ সালে।

এক বন্ধুর মাধ্যমে জয়েন করেন Women and e-commerce forum (WE) গ্রুপে। গল্পটা ২০২০ সালের ১৪ জুলাইয়ের। মাতৃত্বকালীন ছুটির পর মহামারির ছুটি পাচ্ছিলেন ক্রমাগত। বাচ্চার বয়স যখন সাত মাস, তখন থেকেই কাজ শুরু করলেন অনলাইনে। স্বামীর পূর্ণ সমর্থন থাকায় অনেকটা সাহস পান নতুন পথ চলতে।

শুরুতে পরিবারের কাউকে বলতে পারেননি এই নতুন পরিচয়ের কথা। জয়েন ফ্যামিলিতে থাকায় অল্প দিনের মধ্যেই সবাই জানতে পারেন তার এ পেশার কথা। যারা প্রথমে নেতিবাচক মন্তব্য করতেন কাজ নিয়ে, এখন তারা তার কাস্টমার। উদ্যোগের নাম দেন 'হাটবাজার'। প্রাথমিকভাবে নওগাঁর লোকাল পণ্য নিয়ে কাজ শুরু করেন নওগাঁর চাল, বিখ্যাত প্যারা সন্দেশ, গুঁড়া মসলা নিয়ে। পরে শীতের সময় যোগ করেন কুমড়া বড়ি আর খেজুরের পাটালি গুড়।

এই পথটা তার জন্য মোটেও মসৃণ ছিল না। শুরুতে সব নিজ হাতে করতেন। পণ্যের সোর্সিং, প্রসেসিং, প্যাকেজিং এবং শিপিং (ডেলিভারি) সব। এখন কাজ করছেন অনেকে। যুক্ত করতে চান আরও বেশি নারীদের। বন্ধুবান্ধব আর পরিচিতজনদের দিয়ে বিক্রি শুরু হলেও একপর্যায়ে তা বাড়তে থাকে এবং উইয়ের অনেক অজানা-অচেনা মানুষও 'হাটবাজার' থেকে নিয়মিত কেনাকাটা করতে থাকেন। গত রমজানে তিনি লাখপতি সেলার হয়েছেন উইতে। এখন শুধু অনলাইনে নয়, অফলাইন থেকেও অর্ডার আসে।

পাবনা জেলার ঈশ্বরদীতে জন্ম নেওয়া এই নারী শৈশব থেকেই ছিলেন আত্মনির্ভরশীল, কর্মঠ এবং সাহসী। স্কাউট, খেলাধুলা, আবৃত্তি, রচনা প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন ইভেন্টে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। তখন থেকেই নেতৃত্বের বীজ রোপিত হয়। ফলে ১২ লাখ সদস্যের উই গ্রুপের জেলা প্রতিনিধি হতে পেরেছেন। হয়েছেন উইয়ের বিশেষ আয়োজন ৬৪ জেলার ভার্চুয়াল বৈঠকখানা প্রোগ্রামের ১৬ জন ট্রেইনারের মধ্যে একজন গর্বিত ট্রেইনার। বাবার অনুপ্রেরণায় হতে চেয়েছিলেন পাইলট এবং পরে চেয়েছিলেন প্রকৌশলী। কিন্তু পড়াশোনা শেষ করার আগেই শিক্ষকতা পেশায় নিয়োগ পেয়ে যান। সরকারি চাকরি হওয়ায় ইচ্ছা থাকার পরও আর অন্য পেশায় যেতে পারেননি। পড়াশোনা শেষ করে বিয়ের পর স্থায়ীভাবে নওগাঁতে বসবাস করছেন।

যারা তার সঙ্গে ই-কমার্স নিয়ে কাজ করছেন, তাদের সবাইকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেন সব সময়। একা এগিয়ে যাওয়ার মন্ত্রে বিশ্বাসী নন তিনি। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। জেলার অন্য উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বা বিভিন্ন প্রণোদনার জন্য নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন জেলা প্রশাসন, বিসিক, যুব উন্নয়ন, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর, চেম্বার অব কমার্স, জেলা কৃষি অফিসসহ অন্যান্য সব সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে। বর্তমানে তার সঙ্গে কাজ করছেন আরও প্রায় শতাধিক উদ্যোক্তা। তিনি তাদের ডিস্ট্রিক্ট হেড হিসেবে আছেন। তাদের সমস্যাগুলো উইতে রিপ্রেজেন্ট করেন। আর বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা এনে দেন, যা তাদের উদ্যোগে কাজে লাগে বা সাহায্য করে নিজেকে পরিণত করতে।

বিভিন্ন ট্রেনিং, ওয়ার্কশপ, সেমিনারে অংশগ্রহণ করে সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ডের ছাত্রী এখন ই-কমার্স নিয়ে কাজ করছেন। শুধু নিজের উদ্যোগ হাটবাজারের পণ্য নয়, তিনি চান নওগাঁর প্রতিটি পণ্য সম্পর্কে মানুষ জানুক, চিনুক। নওগাঁর আম, ড্রাগন ফল, মাল্টা, তাঁতশিল্প ইত্যাদি পণ্যের মাধ্যমে কীভাবে ই-কমার্সে প্রভাব বিস্তার করা যায় সেই লক্ষ্যে এগোচ্ছেন। স্বপ্ন দেখেন নওগাঁকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার। মোট কথা, নওগাঁ জেলাকে ব্র্যান্ড হিসেবে তৈরি করতে চান তিনি।

মন্তব্য করুন