২০২০ সালের অক্টোবর মাস। 'ধর্ষকের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ' আন্দোলনে রাজপথে নেমে এসেছিল দেশের তরুণ সমাজ। আন্দোলনের ঢেউ লেগেছিল সব বয়সের মানুষের মাঝে। ধর্ষণবিরোধী নানা স্লোগানে ফুঁসে ওঠে আন্দোলনকারীরা। ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান হওয়ায় সফলভাবে সমাপ্তি হয় এই গণআন্দোলনের।

আন্দোলনের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে একটি চিত্রকর্ম। চারদিকে সাড়া ফেলে এই চিত্রকর্মটি। রাতারাতি মানুষের ফেসবুক প্রোফাইলে জায়গা করে নেয় তা। বলছিলাম ধর্ষণবিরোধী চিত্রকর্ম 'স্টপ রেপ'-এর কথা। যেটি এঁকেছিলেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমাইয়া তানজিদ মনীষা।

'স্টপ রেপ' চিত্রকর্মটিতে ধর্ষকদের হাতে একজন নারী কতটা অসহায়, তা ফুটিয়ে তুলেছিলেন তিনি। নারীর কপালের টিপকে মুছে ফেলার মাধ্যমে বুঝিয়েছেন ধর্ষিত নারীকে সমাজ কলঙ্কের দাগ দিয়ে দেয়। মুখে আর কপালে হাত দিয়ে চেপে ধরে ধর্ষক প্রতিবাদের শক্তি কেড়ে নেয়। যার ফলে একজন নারী অসহায়ভাবে ধর্ষকের হাতের পুতুল হয়ে যায়। সব মিলিয়ে চিত্রকর্মটির করুণ আকুতি মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছিল। যার ফলে তা হয়ে ওঠে ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা।

চিত্রকর্মটির শিল্পী মনীষা বলছিলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গেলে শুধু ধর্ষণের সংবাদ পেতাম। এসব সংবাদ দেখতে দেখতে অতিষ্ঠ হয়ে যাই। তখন মনে হলো, আমার জায়গা থেকে প্রতিবাদ করা হবে। আমি যেহেতু চিত্রশিল্পী, তাই প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে চিত্রকর্মকে বেছে নিই। ফারজানা মিম নামের একজন ফেসবুকে একটি মেয়ের মুখ চেপে ধরা ছবি পোস্ট করেন। আমার কাছে মনে হলো, এই ছবিটি ধর্ষণের শিকার মেয়েদের অসহায়ত্ব তুলে ধরবে। শুরু হলো আমার কাজ। কপালের টিপ আধা মুছে, চোখের পানি যোগ করে পেন্সিলের আঁচড়ে বানিয়ে ফেললাম স্কেচ।

মনীষা বলছিলেন, ছবিটি আঁকার পর ফেসবুকে পোস্ট করে দিই। হঠাৎ একদিন ঘুম থেকে জেগে দেখি, বিভিন্ন পোস্টে আমার নাম জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। আর ফেসবুকে সবার প্রোফাইলে আমার আঁকা ছবিটি ঘুরছে। ভাইরাল হয়ে গেছে 'স্টপ রেপ' ছবিটি। তখনকার অনুভূতি আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না, ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনে আমার ছবিটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে দেখে নিজেকে সফল মনে হয়েছে- এভাবেই ছবিটি ভাইরাল হওয়ার গল্প বলছিলেন মনীষা।

প্রতিবাদী স্কেচটির চিত্রশিল্পী মনীষা নরসিংদীর মেয়ে। ছোটবেলা থেকে আঁকাআঁকি ভালো লাগত তার। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ছবি আঁকাকে জীবনের লক্ষ্য স্থির করে নেন। কারও সাহায্য ছাড়া বাড়িতে বসে চিত্রকর্ম শিখলেও, পেয়েছেন জাতীয় স্বীকৃতি। তার আঁকা স্কেচ শিল্পকলা একাডেমির প্রদর্শনীতে নির্বাচিত হয়েছিল। সৃজনশীলতা আর আর্ট দিয়েই জীবনটাকে প্রাণবন্ত রাখতে চান তিনি।

সুমাইয়া তানজিদ মনীষা বলেন, 'ধর্ষণের বিরুদ্ধে আমাদের সবাইকে প্রতিবাদ করতে হবে। যার যতটুকু সামর্থ্য আছে, তা দিয়ে প্রতিবাদ করতে হবে। আমি আমার জায়গা থেকে সেই প্রতিবাদ শুরু করেছিলাম। আমি নিজেও কখনও ভাবিনি এর কতটা ভালো ফল আসতে পারে।'

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমরান কবির চৌধুরী বলেন, 'শিক্ষার্থীরা সৃজনশীল কাজে যখন ভালো করে তখন আমরা খুব আনন্দিত হই। আমাদের শিক্ষার্থীর আঁকা ছবি ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনে নতুন শক্তি সঞ্চার করেছিল তা জেনে আমার গর্ব হয়েছে। মনীষার চিত্রকর্ম আরও এগিয়ে নিতে আমরা পাশে থাকব।'

মন্তব্য করুন