সুফিয়ান নাহারের বয়স সত্তরের কিছু বেশি। চার ছেলে-মেয়ে বিদেশে প্রতিষ্ঠিত, জীবনের প্রয়োজনে বিদেশেই থাকেন তারা। স্বামী-স্ত্রী দু'জন থাকেন রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে। তাদের বিদেশে ভালো লাগে না। এপ্রিলের ৮ তারিখে তার স্বামীর করোনা পজিটিভ ধরা পড়ে। করোনা শনাক্ত হওয়ার মাত্র চার দিনের মাথায় তিনি মারা যান। আত্মীয়স্বজন সুফিয়ান নাহারের স্বামীকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করেন। বিদেশে থাকা ছেলেমেয়েদের তখন দিশেহারা অবস্থা। প্রিয় পিতার জীবনের শেষ মুহূর্তে কাছে থাকতে পারেননি। আর এই দুঃসময়ে বৃদ্ধ মা একেবারেই একা। এর মধ্যে গৃহপরিচারিকারও কভিড পজিটিভ। পরদিন থেকে শুরু হচ্ছে দেশে সর্বাত্মক লকডাউন। এই পরিস্থিতিতে মাকে দেখবে কে? মায়ের পাশে কেউই নেই। রাত ২টার দিকে সুফিয়ান নাহারের সেবায় বাসায় হাজির হন দু'জন নারী স্বেচ্ছাসেবী। একজন নিকট আত্মীয় সংযোগ : কানেক্টিং পিপল নামে একটি সংগঠনের 'কেয়ারগিভার' থেকে এই সহযোগিতা নেন। এই সার্ভিসে সেই মাসেই যোগ দেন এই দুই স্বেচ্ছাসেবী মেহেরুন নেসা জ্যোতি ও সাদিকা ইসলাম পপি। তারা দু'জন পুরো এক মাস সুফিয়ান নাহারকে সেবা, মমতা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন। সাভার নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থী সাদিকা ইসলাম জানান, 'গতবারের লকডাউনটা হুট করে শুরু হয়ে গিয়েছিল। মানুষের এত বিপদ হবে আন্দাজই করতে পারিনি। করোনা রোগীকে ফেলে রেখে চলে যাওয়ার খবর নিজেকে খুব কষ্ট দিত। যদি তাদের পাশে দাঁড়াতে পারতাম তাহলে খুব ভালো লাগত। এপ্রিলের ৭ তারিখ রাতে এনাম মেডিকেলের একজন স্বেচ্ছাসেবী ডাক্তার ইমতিয়াজ ভাই আমার রুমমেট জ্যোতিকে ফোন করে জানান, 'সংযোগ' নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে কেয়ারগিভার হিসেবে কাজ করবে কিনা? কাজ হবে করোনা আক্রান্ত মানুষকে সেবা দেওয়া। সে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যায়। আমাকেও যুক্ত করে।' ৮ এপ্রিল সকাল ৮টা থেকে আমাদের ডিউটি শুরু হবে। আমার ডিউটি তেজগাঁওয়ের একটা বেসরকারি হাসপাতালে আর জ্যোতির ডিউটি মোহাম্মদপুরের একটি বাসায়। সাদিকা ইসলাম সেবা করেন বিলকিস বেগম নামের এক নারীর। তার স্বামী চাকরিজীবী, দু'জন ছেলের হাসপাতালের ওয়ার্ডে থাকার অনুমতি নেই। তাকে সেবা দেওয়ার জন্য পরিবারের কেউ নেই। একা হাসপাতালে এক ধরনের ভীতি কাজ করছিল। সাদিকা আসায় মানসিক শক্তি পেয়ে যান। ৮ এপ্রিল বিলকিস বেগমের অক্সিজেন সিচুরেশন ছিল ৫ লিটারে ৯১-৯৩। তার ওপর আবার ডায়াবেটিস ছিল। সাদিকা দিনভর অক্সিজেন সিচুরেশন খেয়াল রাখা, ইনসুলিন দেওয়া, ওষুধ খাওয়ানো, মনোযোগ দিয়ে রোগীর কথা শোনা, খাবার খাওয়ানোসহ নানারকম সেবা দিতে থাকেন। তিন দিন পর তার অক্সিজেন সিচুরেশন স্বাভাবিক হয়ে আসে। পরের দিন তিনি হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরেন। এর মধ্যে আমরা সংযোগ থেকে কিছু প্রশিক্ষণ নিই। যাতে রোগীদের গুণগত সেবা দেওয়া যায়। আমার বান্ধবী জ্যোতি সেবা দেন মোহাম্মদপুরের ওয়াহিদা খাতুন নামে ৭৫ বছরের একজন নারীকে। তিনি ছয় দিন পর সুস্থ হলে আমরা দুই বান্ধবী সেদিন রাত ২টায় এই বাসায় আসি। এখানে আমরা এক মাস সুফিয়ান নাহারের বাসায় সেবা দিয়েছিলাম। এখন পর্যন্ত আমি আটজন রোগীর সেবা দিয়েছি। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয় সংযোগের এই 'কেয়ারগিভার' সার্ভিস। সংযোগের প্রতিষ্ঠাতা প্রকৌশলী আহমেদ জাভেদ জামাল জানান, গত বছর মার্চ মাসে কভিড রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য এই অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন। প্লাজমা, অক্সিজেন সেবা থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকমের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে এই গ্রুপ থেকে। গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে কয়েকজন পেশেন্টের পরিবার থেকে আমাদের কাছে কেয়ারগিভার খোঁজা হচ্ছিল। বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক কেয়ারগিভার না থাকায় আমরা এটা নিয়ে চিন্তা করি। আমাদের কাছে অনেকে আবার চাকরি, টিউশনি বা আর্থিক সহযোগিতা চেয়ে আবেদন করতেন। সেখান থেকে ভাবলাম সামান্য প্রশিক্ষণ দিয়ে কেয়ারগিভার তৈরি করি। আহমেদ জাভেদ জামাল বলেন, 'জিল্লুর রহমান নামের একজন একদিন আমাদের ফেসবুকে কমেন্ট করে চাকরি চান। করোনার কারণে জিল্লুর ১৪ বছরের পুরোনো চাকরি হারান। তার স্ত্রী অসুস্থ, বাবা কর্মক্ষম। মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান আর ভাইকে নিয়ে তার পরিবার চালানোটা অনিশ্চিত হয়ে যায়। তিনি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তাকে কেয়ারগিভার হিসেবে কাজ করতে বললে তিনি রাজি হয়ে যান।' জিল্লুর রহমান এখন পর্যন্ত ১৫-১৬ জন রোগীর সেবা করেছেন। এর মধ্যে ১০-১২ জন সুস্থ হয়েছেন।

জিল্লুর রহমান বলেন, 'যখন রোগী সুস্থ হয়ে বাসায় ফেরেন তখন আনন্দ লাগে। এই আনন্দ বলে বোঝাতে পারব না।' সংযোগের 'কেয়ারগিভার' ইউনিটের সমন্বয়ক সাদিয়া শামীম। তিনি বলেন, 'ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, বরিশাল, রাজশাহী, গাজীপুরে আমাদের সংযোগ কেয়ারগিভার আছেন ৫৪ জন; এ পর্যন্ত প্রায় ৩৫০ জন মানুষকে সেবা দেওয়া হয়েছে। দিন দিন চাহিদা বাড়ছে। আশা করি করোনা চলে যাবে। তবে যাদের মা-বাবা একা থাকেন বা অসুস্থ, তাদের বাসায় সেবা দেওয়ার জন্য আমরা কেয়ারগিভার চালু রাখব।'

মন্তব্য করুন