সাম্প্রতিক সময়ে নারীদের অপরাধ-সংশ্নিষ্টতায় বেশ কিছু সংবাদে মুখর সংবাদমাধ্যমগুলো। তাদের মধ্যে আছেন সমাজের আলোচিত ও প্রতিষ্ঠিত অনেকেই। কিন্তু নারীর এই অপরাধ প্রবণতা পুরুষের অপরাধ ঢাকার কি ঢাল নয়? আপাতদৃষ্টিতে নারীকে মূল অপরাধী মনে হলেও এর পেছনে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার যে দায় রয়েছে, এর বেশ বড় অংশই রয়ে যায় লোকচক্ষুর অন্তরালে। কখনও পরিস্থিতি বিবেচনায় বা প্ররোচনার শিকার হয়ে নারীরা অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। লিখেছেন গোলাম কিবরিয়া

নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই অপরাধ জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে। জেন্ডারের ভিত্তিতে অপরাধ নির্ণয় করা যায় না। হাল আমলে আমরা বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডে সমাজে বিভিন্ন সেক্টরের প্রতিষ্ঠিত নারীদের সম্পৃক্ততা দেখেছি। কিন্তু নারীরা কি দেখেশুনে-বুঝে এসব অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন? নাকি তারা একটা পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন। এটাও ভেবে দেখা প্রয়োজন। -ড. জিনাত হুদা, অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়




নারীরা সাধারণত কোমল ও নরম হৃদয়ের অধিকারী হয়ে থাকেন। সে কারণেই বাবার তীক্ষষ্ট ও গুরুগম্ভীর চেহারার বিপরীতে ছেলেমেয়েদের কাছে পরম নিরাপদ আশ্রয়স্থল মায়ের কোল, মায়ের স্নেহ ও ভালোবাসা। নারীকে সাধারণত মমতাময়ী মা, স্নেহময়ী ভগ্নী সর্বোপরি সর্বংসহা চরিত্র হিসেবে দেখে আসছেন সবাই এবং নারীদের দ্বারা মারাত্মক ও জঘন্য অপকর্ম সংঘটিত হবে না মর্মে সবাই বিশ্বাস করে থাকেন। অপরাধবিজ্ঞানের পথচলায় শুরুর দিকে নারীদের অপরাধ নিয়ে তেমন আগ্রহ না থাকলেও বর্তমান সময়ে নারী অপরাধ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হচ্ছে। প্রতিদিনকার খবর, সংবাদ, ঘটনাপ্রবাহ দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে নারী অপরাধ বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু আলোচনার বিষয় হচ্ছে, অপরাধপ্রবণতায় নারী কি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে?

ইয়াবা ব্যবসার অভিযোগে দেবব্রত চক্রবর্তীকে স্ত্রী ও শাশুড়িসহ ২০১৬ সালের ২৪ জানুয়ারি গ্রেপ্তার করে চট্টগ্রামের বায়েজিদ থানা পুলিশ। আপনজন সঙ্গে নিয়ে অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়ছে অপরাধীরা। বিভিন্ন অপরাধের ঘটনা বিশ্নেষণ করে দেখা গেছে, স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন, জামাই-শাশুড়ি-শ্যালক-শ্যালিকা, মামা-ভাগ্নে- এমন নিকটাত্মীয়দের নিয়ে অপরাধে জড়াচ্ছেন তারা। যাদের এড়িয়ে মানুষ অপরাধে জড়ায় তাদের নিয়েই অপরাধ সংঘটনের এই প্রবণতার নেপথ্যে প্রধান কারণ হিসেবে নৈতিক অবক্ষয়ের কথা বলা হচ্ছে। একটি পরিবারের একজন নারী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয় তখনই, যখন একজন পুরুষ তার অপরাধের হাতিয়ার হিসেবে তাকে ব্যবহার করতে চায়। পুরুষ নিয়ন্ত্রিত সমাজে পুরুষ তার অপরাধের বিস্তার ঘটাতে নারীকে ইচ্ছামতো ব্যবহার করে যাচ্ছে। সম্প্রতি পুলিশ ও র‌্যাব ঢাকায় কয়েকজন নারী অভিযুক্তের বাসাবাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার এবং তাদের বাসা থেকে মদ ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য উদ্ধার করেছে। কিছুদিন ধরে এ বিষয়ে দেশব্যাপী আলোচনা-সমালোচনা চলেছে। পুরুষতান্ত্রিক পুঁজিবাদী সমাজে নারীরা অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষের ভোগের সামগ্রী হিসেবে ব্যবহূত হয়। তদন্তে গ্রেপ্তারকৃত অভিযুক্ত নারীদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ-সংশ্নিষ্টতার সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে আদালতে তাদের বিচার হবে। এ ক্ষেত্রে কারও কিছু বলার নেই। কিন্তু তারা যেন কারও কোনো প্রতিহিংসার শিকার হয়ে হয়রানি না হন, তা সচেতন মহলের কাম্য। আদালত কর্তৃক অপরাধ প্রমাণের আগে চরিত্র হনন, তাদের অপরাধী হিসেবে আখ্যায়িত করা সমীচীন নয়। পুরুষ নিয়ন্ত্রিত সমাজে পুরুষ তার অপরাধের বিস্তার ঘটাতে নারীকে ইচ্ছামতো ব্যবহার করে যাচ্ছে। অনেকেই মনে করেন, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রিন্ট-ইলেকট্রনিক মিডিয়া, শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই অনেক মুখ্য কর্মকর্তার নারীর সমতা, ক্ষমতায়ন ইত্যাদি বিষয়ে চিন্তাভাবনার প্রতিফলন লোক দেখানো। এ ছাড়া নারীর প্রতি আচরণ, এমনকি ভাষার প্রয়োগেও প্রায়ই লক্ষ্য করা যায় অবজ্ঞা, অজ্ঞতা আর উদাসীনতার ছাপ; যা নারী অপরাধ বৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলছে। এর সমাধানে সমাজে নারীর অবস্থানের টেকসই পরিবর্তনের জন্য এসব নীতিনির্ধারক আর প্রভাবশালীকে নিয়ে সবার আগে কাজ করা প্রয়োজন। দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণগত পরিবর্তন কখনোই একদিনে আসে না। এ ক্ষেত্রে লেগে থাকাটা জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারাবিলিটি স্টাডিজের পরিচালক ও অধ্যাপক ড. মাহবুবা নাসরীনের মতে, বাংলাদেশ আর্থসামাজিক অগ্রগতির দিক থেকে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেকটা এগিয়ে। আগামী দিনে আরও এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আমরা দেখছি। কিন্তু কিছু বিষয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে মারাত্মকভাবে। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো নারীর প্রতি সহিংসতা। নারী-পুরুষ সমতা, নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিশ্চিতে আমাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। (সূত্র-সমকাল : প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২০)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা বলেন, 'সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডে নারীরা জড়িয়ে পড়ছেন। বিষয়টিকে আমরা একটু গভীরভাবে বিশ্নেষণ করলে দেখা যায়, এ কথা মনে করার কোনো কারণ নেই যে নারীরা কখনোই অপরাধ জগতের সঙ্গে ছিলেন না। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই অপরাধ জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে। জেন্ডারের ভিত্তিতে অপরাধ নির্ণয় করা যায় না। কিন্তু সামাজিক প্রেক্ষাপট, পারিবারিক মূল্যবোধ প্রভৃতি বিষয় বিশ্নেষণ করলে দেখা যায়, তুলনামূলকভাবে অপরাধের সঙ্গে নারীদের সম্পৃক্ততা কম। হাল আমলে যে অপরাধ ঘটতে আমরা দেখেছি তা লক্ষ্য করলে বলা যায় অপরাধের হার যে শুধু বেড়েছে তা নয়, অপরাধের প্রবণতার প্রকরণে অনেক ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। ব্যভিচার, খুন, নারী পাচার, ঘুষ, মাদক প্রভৃতি অপরাধে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের সম্পৃক্ততা এখন আমরা দেখছি। হাল আমলে আমরা বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডে সমাজে বিভিন্ন সেক্টরের প্রতিষ্ঠিত নারীদের সম্পৃক্ততা দেখেছি। কিন্তু নারীরা কি দেখেশুনে-বুঝে এসব অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন নাকি তারা একটা পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন। এটাও ভেবে দেখা প্রয়োজন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে চিরকালই নারী পণ্য হিসেবে ব্যবহূত হয়ে এসেছে। একদিকে আমরা নারীবাদীর কথা বলছি, অন্যদিকে নারীদের আমরা পণ্য হিসেবে নানাভাবে উপস্থাপন করছি। ইন্টারনেট, মিডিয়া, নির্বাচন, বিজ্ঞাপন প্রভৃতি ক্ষেত্রে নারীকে বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আবার সেসব নারীই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এককভাবে একজন নারী দ্রুত এতটা উপরে উঠতে পারেন না। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। হ্যাঁ, অনেক নারীবাদী সমাজে ওপরে উঠেছেন কিন্তু তারা আজীবন নীতির প্রতি অবিচল থেকে সংগ্রাম করে ওপরের দিকে উঠে এসেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বেগম রোকেয়া প্রভৃতি সফল নারীর উদাহরণ রয়েছে। কিন্তু হাল হামলে অনেক নারী দেখছি যারা হঠাৎ করে স্টার হয়ে যাচ্ছেন। হঠাৎ করে ওপরে উঠে আসছেন। কিন্তু তাদের পেছনে দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন পুরুষ নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান ও অশুভ শক্তির প্রভাব। যার কারণে নারীরা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। এর জন্য পুরুষতান্ত্রিক কঠোর সমাজ ব্যবস্থা, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফলাফল হচ্ছে অপরাধপ্রবণতায় নারীর জড়িয়ে পড়া।' একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নারী সাবিহা বিনতে মফিজের মতে, 'বর্তমান সময়ে নারীরা বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। আপাতদৃষ্টিতে নারীকে মূল অপরাধী মনে হলেও এর পেছনে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার যে দায় রয়েছে, এর বেশ বড় অংশই রয়ে যায় লোকচক্ষুর অন্তরালে।' সামাজিক উদ্যোক্তা সাহিদা আক্তার মনে করেন, কখনও স্বেচ্ছায়, কখনও পরিস্থিতি বিবেচনায় বা প্ররোচনার শিকার হয়ে নারীরা অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। আবার পারিবারিক বন্ধনের অভাবেও নারীরা বিভিন্ন রকম অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণেও নারীদের অপরাধ বাড়ছে। অনেক সময় নারীরা নিজেদের অসহায় ও নির্যাতনের শিকার দাবি করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে অন্যকে ফাঁসানো, অন্যের মানহানির চেষ্টা করার মতো ঘটনা হয়ে থাকে। আবার অনেক সময় দীর্ঘদিন অত্যাচার ও নির্যাতনের করণে নারীরা অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছেন। এসব ক্ষেত্রে পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থাই সবচেয়ে দায়ী। সাম্প্রতিক সময়ে নারী অপরাধপ্রবণতায় করোনাকালের বেশ প্রভাব রয়েছে বলে বিশিষ্টজনরা মনে করে থাকেন। অপরাধীকে শনাক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে মূল হোতাদেরও বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে পারলেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া নারীশিক্ষার মাধ্যমে নারীদের অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম করতে হবে। নারী-পুরুষের মধ্যে যে বৈষম্য, তা দূর করে নারীদের মতামত দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।

মন্তব্য করুন