নীলিমা ইব্রাহিম রচিত 'আমি বীরাঙ্গনা বলছি' মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি নারীর ওপর পাকিস্তানি হায়েনাদের পাশবিকতার অনন্য দলিল। যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে চরম লাঞ্ছনার শিকার নারীদের সরেজমিন সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জবানিতে নীলিমা ইব্রাহিম তুলে ধরেছেন স্বাধীনতার রক্তাক্ত স্বাক্ষর। এ গ্রন্থ থেকে এক বীরাঙ্গনার কথাসংক্ষেপ এখানে পত্রস্থ হলো ...

আমার জন্মস্থান ঢাকা শহরের কাছেই কাপাসিয়া গ্রামে। বাংলার মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ওই গ্রামেরই বীর সন্তান তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী। এ কারণে ওই গ্রামের সাধারণ মানুষ মুক্তিযুদ্ধের ঘোর সমর্থক। স্কুলে-পথে-ঘাটে আমাদের সবার মুখে 'জয় বাংলা' 'জয় বঙ্গবন্ধু' কিন্তু জয়ের এ জোয়ার বেশিদিন স্থায়ী হলো না। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে বিনামেঘে বজ্রপাত। হঠাৎ নরসিংদী বাজারে প্লেন থেকে গুলিবর্ষণ করে সমস্ত বাজারে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলো। আমার বাবার ছোট্ট একটি দোকান ছিল ওই বাজারে। বাবা দর্জির কাজ করতেন। সঙ্গে ছিলেন দু'জন সহকর্মী। মোটামুটি যে আয় হতো তাতে আমাদের সংসার ভালোভাবেই চলে যাচ্ছিল এবং আমরা চার ভাইবোন সবাই পড়াশোনা করছিলাম। এক ভাই কলেজে পড়ে, থাকে নরসিংদীতে বাবার সঙ্গে। আমি, মা, আমার ছোট দু'ভাই থাকতাম কাপাসিয়ায়। ধীরে ধীরে পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠতে লাগল। আহত এবং পলাতক ইপিআর বাহিনীর সদস্যরা এ বাড়ি ও বাড়ি আশ্রয় গ্রহণ করতে থাকেন। সম্ভবত এ সংবাদ গোপন ছিল না। তখনও প্রকাশ্যে রাজাকার বাহিনী আত্মপ্রকাশ করেনি। গোপনে সংবাদ আদান-প্রদান চলছিল। একদিন হঠাৎ বিকেলের দিকে গ্রামে চিৎকার উঠল মিলিটারি আসছে, মিলিটারি! মানুষজন দিশেহারা। সবাই নিজ নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে দৌড়াতে লাগল। দেখতে দেখতে মনে হলো গ্রামের চারিদিকে আগুনে ছেয়ে গেছে। মাঝে মাঝে গুলির শব্দ। বাবা ও বড় ভাই নরসিংদীতে ওই আধপোড়া দোকানের মেরামতের কাজে ব্যস্ত। বাড়িতে আমি, মা ও ছোট দুই ভাই লালু আর মিলু। লালু গিয়েছে স্কুলের মাঠে ফুটবল খেলা দেখতে, এখনও ফেরেনি। মা ঘর পরিস্কার করছেন।

এমন সময় একটা জলপাই রঙের জিপ এসে বাড়ির সামনে বিকট আওয়াজ করে থামল। মিলুকে বুকে জড়িয়ে ধরে আর আমার হাত ধরে মা শোবার ঘরে ঢুকলেন। কে যেন বাংলা বলছে, হ সাব, এইডাই মেহেরজান গো বাড়ি, বহুত খুব সুরত লেড়কি। আমার দেহ অবশ হয়ে আসছে। এমন সময় দরজায় লাথি। দ্বিতীয় লাথিতেই দরজা ভেঙে পড়ল। কয়েকজন লোক লুঙ্গিপরা ওদের সামনে। আমাদের টেনে বাইরে নিয়ে এলো। ক্ষীণদেহে যথাসাধ্য বাধা দিতে চেষ্টা করলাম। চুল ধরে আমাকে জিপে তোলা হলো। মা আর্তনাদ করতেই মাকে ও মিলুকে লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার করল শয়তানরা। আমাকে যখন টানাহেঁচড়া করছে দেখলাম মায়ের দেহটা তখনও থরথর করে কাঁপছে। গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার পর দেখলাম মিজুর মাথাটা হঠাৎ কাত হয়ে একদিকে ঢলে পড়ল। বুঝলাম মা ও মিলু চলে গেল। হঠাৎ করে আর্তনাদ করে উঠতেই ধমক খেলাম। 'চোপ খানকি' বোবা হয়ে গেলাম। আমাকে ওই সম্বোধন করল কী করে? আমি ভদ্র ঘরের মেয়ে, অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি হঠাৎ কেমন যেন শক্ত কঠিন হয়ে গেলাম। আমার এই মানসিক স্থবিরতা কেটেছে অনেক দিন পরে। সেখান থেকে হাত ও জায়গা বদল হয়ে কখনও একা কখনও আরও মেয়েদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলাম। মাঝখানে মনে হতো বাবা আর বড় ভাই বেঁচে আছে কি? লালু? লালু কি পালাতে পেরেছিল? আবার ভাবতাম কে বাবা, কে ভাই, লালুই-বা কে আর আমিই-বা কে? নিজেকে একটা অশরীরী কঙ্কালসার পেতনি বলে মনে হতো। কিন্তু তবুও এ দেহটার অব্যাহতি নেই! মাস দুই পর এদের নিজেদের প্রয়োজনে আমাদের গোসল করতে দিত। পরনের জন্য পেতাম লুঙ্গি আর শার্ট কি গেঞ্জি, শাড়ি দেওয়া হতো না। ভাবতাম বাঙালির শাড়িকে ঘৃণা করলে আমাদের তো সালোয়ার-কামিজ দিতে পারে। ময়মনসিংহ কলেজের এক আপাও ছিলেন আমাদের সঙ্গে। বললেন তা নয়, শাড়ি বা দোপাট্টা জড়িয়ে নাকি কিছু বন্দি মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। তাই ও দুটোর কোনোটাই দেওয়া হবে না। তাছাড়া আমরা তো পোষা প্রাণী। ইচ্ছে হলে একদিন হয়তো এ লুঙ্গি শার্টও দেবে না। আপা নির্বিকারভাবে কথাগুলো বললেন। দৃষ্টি ওপরের দিকে অর্থাৎ ছাদের দিকে। তিনি বেশির ভাগ সময়ই একা একা ওপরের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। মনে হতো যেন বাইরের আলো দেখার জন্য ছিদ্র খুঁজছেন। কদিন পর আপা অসুস্থ হলো। শুয়ে থাকত, ওকে শাড়ি পরিয়ে বাইরে নিয়ে যাওয়া হলো ডাক্তার দেখাবার জন্য, আপা আর ফিরল না। ভাবলাম আপা বুঝি মুক্তি পেয়েছেন, অথবা হাসপাতালে আছেন কিন্তু না, আমাদের এখানে এক বুড়ি মতো জমাদারনি ছিল, বলল, আপা গর্ভবতী হয়েছিল। তাই ওকে মেরে ফেলা হয়েছে। ভয়ে সমস্ত দেহটা কাঠ হয়ে গেল, এতে আপার অপরাধটা কোথায়? আল্লাহ্‌ এ কী মুসিবতে তুমি আমাদের ফেললে। কী অপরাধ করেছি আমরা? কেন এই জানটা তুমি নিয়ে নিচ্ছ না? এখানেই চিন্তা থেমে যেত। কেন জানি না মরবার কথা ভাবতাম না। ভাবতাম দেশ স্বাধীন হবে আবার বাড়ি ফিরে যাব। বাবা-মা, বড় ভাই লালু-মিলু আবার আমরা হাসব, খেলব, গল্প করব।

মন্তব্য করুন