বাংলার নারী অগ্রযাত্রা ও ক্ষমতায়নে অন্যতম পথিকৃৎ নীলিমা ইব্রাহিম। তিনি একাধারে ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক এবং সমাজকর্মী। মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসন এবং তাদের মর্মস্পর্শী বেদনা ও সংগ্রামের প্রকাশে তার অবদান স্মরণীয়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বাংলাদেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গেছেন মহীয়সী এই নারী। ১১ অক্টোবর তার জন্মশতবার্ষিকী; তাকে নিয়ে এই আয়োজন...

নীলিমা ইব্রাহিমের সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি আছে। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি তার ছাত্র ছিলাম। তিনি আমাদের শিক্ষক ছিলেন এবং আমার এখনও মনে আছে অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে তিনি আমাদের চর্যাপদ পড়াতেন। কিন্তু সে পরিচয়ের সম্পর্ক গাঢ় হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পর বীরাঙ্গনাদের নিয়ে তিনি যখন কাজ শুরু করেন। তখন বঙ্গবন্ধু নির্যাতিত নারীদের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র করেছিলেন। সমাজে তাদের যথাযথভাবে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সে প্রক্রিয়ার সঙ্গে অধ্যাপক নীলিমা ইব্রাহিমও যুক্ত ছিলেন। সে অভিজ্ঞতা নিয়ে পরে তার রচিত 'আমি বীরাঙ্গনা বলছি' মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের নিয়ে প্রথম প্রামাণ্য গ্রন্থ। তিনিই প্রথম লিখেছিলেন এবং এই বই লিখতে গিয়ে তার কেমন বিড়ম্বনা হয়েছে, কেমন অভিজ্ঞতা হয়েছে, সেটা আমি আমার একটা বইয়ের ভূমিকায় উল্লেখ করেছি।

আমি দেখেছি, আন্তরিকতা ও মায়ের মমতা দিয়ে নারীর পাশে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। '৭১-এর নির্যাতিত বেশিরভাগ নারী ছিলেন কম বয়সী। সেসব নারীর মর্মস্পর্শী সব ঘটনা বলতে গিয়ে নীলিমা আপা কেঁদে ফেলেছিলেন। আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসেছে এবং সেই পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দিয়েছিল; তারপর মুক্তিযুদ্ধের অনেক তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে। আজকে যদি সে রেকর্ডগুলো থাকত তাহলে '৭১-এর গণহত্যায় আলবদর-রাজাকারদের বিচার আরও সহজ হতো।

নীলিমা ইব্রাহিম একজন মহীয়সী নারী ছিলেন। তিনি অনেক বই ও সাহিত্য লিখেছেন কিন্তু আমার কাছে মন হয় অধ্যাপক হিসেবে তিনি সফল অধ্যাপক ছিলেন এবং সফল শিক্ষাবিদ ছিলেন। কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য যে কারণে মানুষ তাকে মনে রাখবে বা আমরা তাকে মনে রাখব, তা হলো মুক্তিযুদ্ধের নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসনে তিনি যে অসামান্য অবদান রেখেছেন। সে কারণে জাতি তাকে সবসময় স্মরণ করবে।

নীলিমা ইব্রাহিমের পরিবার অনেক মুক্তমনা ছিল। ডাক্তার ইব্রাহিমকে বিয়ে করার পর তার পাঁচ কন্যাকে তিনি উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছিলেন। নীলিমা ইব্রাহিমের চলন, কথন, ক্লাসে তিনি যেভাবে কথা বলতেন তার পাঠদান, সব কিছুর মধ্যে তার একটি সংস্কৃতির ছোঁয়া ছিল এবং বাংলা সংস্কৃতির প্রতি যে তার অনুরাগ ছিল, তিনি তার ছাত্রদের ও পাঠদানের সময় তা বলতেন একটি অসাম্প্রদায়িক শিক্ষা আমাদের দিয়েছেন। পাকিস্তান আমলে যখন আমরা তার ছাত্র ছিলাম, তখন সব ছাত্র একটাই কথা বলত- তিনি একজন অসাধারণ শিক্ষক ছিলেন। নীলিমা ইব্রাহিমের জন্মশতবার্ষিকী নিয়ে বলতে গেলে আমি মনে করি যার যে প্রাপ্য মর্যাদা যথাযথভাবে রাষ্ট্রীয়ভাবে সে সম্মাননা পাচ্ছে কিনা জানি না। তবে বঙ্গবন্ধু নীলিমা ইব্রাহিমকে যথেষ্ট সম্মান করতেন।

লেখক:সভাপতি, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি

মন্তব্য করুন