শৈলী

শৈলী

গহনায় প্রকৃতি

প্রকাশ: ১২ জুন ২০১৯

সারাহ্‌ দীনা

শিল্প এখন আর আটকে নেই ক্যানভাস কিংবা মঞ্চে। বিভিন্নভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে জীবনের সঙ্গে। বর্তমান সময়ের মানুষ প্রকৃতির মায়া নিয়ে ভাবছে। জীবনযাপনে প্রযুক্তির ছোঁয়া জাদুর কাঠি হলেও প্রকৃতির অবদান যে কোনোভাবেই সামান্য অবহেলার নয়, তা নিয়ে আর সংশয় নেই। বরং জীবনের সব ক্ষেত্রেই প্রকৃতির ছোঁয়া আর প্রাকৃতিক উপাদানের জয়জয়কার। শিল্পমনা ফেরদৌসী আক্তার তিন্নি পড়েছেন আর্কিটেকচার নিয়ে। আগ্রহ তার শিল্পকর্ম তৈরিতে। এ জন্য তার পছন্দের অন্যতম মাধ্যম গহনা। প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রাকৃতিক মোটিফ নিয়ে কাজ করছেন তিনি। তৈরি করছেন নান্দনিক গহনা। তিন্নি বলেন, 'অফিস শেষ করে প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতাম গুলশান লেকের হাঁটা পথে। নজর কাড়ত নানারকম গাছ, লতা, পাতা, ফুল, ঘাস। প্রিয় প্রকৃতির এসব উপাদান কীভাবে শিল্প হিসেবে তুলে ধরা যায়, ভাবতে ভাবতেই মাথায় আসে গহনার কথা। ধাতুর গহনাতে প্রাকৃতিক উপাদান তুলে আনার মাধ্যমে প্রকৃতির আরও কাছে যাওয়ার বিষয়ে ভাবতে থাকি।'

গহনায় প্রাকৃতিক মোটিফ তুলে আনার গল্পের এভাবেই শুরু। ভাবনা পরবর্তী পর্বে তিন্নির যাত্রা জানতে চাইলাম। তিন্নি বলেন, 'বিভিন্ন গহনার কারিগরের কাছে গিয়েছি। খুঁজে দেখেছি নানারকম গহনা তৈরির কারখানা। তথাকথিত ছাঁচের গহনা তৈরি করতে চাইনি। তাই কিছুটা কঠিন হয়ে পরে কারিগর খুঁজে পাওয়া। কেননা আমার নকশা করা গহনা মূলত কোনো বহুল ব্যবহূত ডাইস থেকে তৈরি নয়। তাই বেশ কষ্টসাপেক্ষ হবে তৈরির প্রক্রিয়া। আবার যেহেতু আমার নকশার গহনা আমি ভাস্ট প্রডাকশনের মাধ্যমে করতে চাই না, তাই সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়ার মধ্য থেকে যেতে হবে। এই পরিমাণ পরিশ্রম এবং সময় দিয়ে তেমনভাবে লাভবান হতে পারবেন না কারিগররা। তাই হুট করেই গহনা তৈরি করতে পারিনি আমি। বেশ ভাবতে হয়েছে। ঘুরে বেড়াতে হয়েছে কারিগরের খোঁজে। যখন দেখলাম কারিগরের অভাবে আটকে আছে স্বপ্ন, তখন নিজেই নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলাম। কিনে ফেললাম গহনা তৈরির সরঞ্জাম। নিজের বাসাতেই বানালাম ওয়ার্কশপ। এরপর শুধুই পথ হেঁটে যাওয়া, গহনার উপাদান সংগ্রহ আর গহনা তৈরি।' তিন্নি আরও জানান, গহনার জন্য মোটিফ হিসেবে তিনি মূলত ব্যবহার করেন জার্মান সিলভার। সামনে আরও নানা ধরনের ধাতু নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে। জার্মান সিলভার বেছে নেওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, 'মূলত গহনার দামের কথা ভাবতে গিয়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া। অন্য ধাতুতে গহনার মূল্য বেশ বাড়তির দিকে হবে। যেহেতু মানুষের জন্য তৈরি করছি গহনা, তাই তাদের সাধ্যের নাগালেই রাখার চেষ্টা করেছি।'

তিন্নি কোনো ডাইস ছাড়া হাতে তৈরি করেন গহনা। ওয়ার্ক স্টেশনে নিজের শিল্পবোধ আর প্রকৃতির উপাদান মিলিয়ে তবেই কাজ শুরু করেন। সারা রাত পার করে তৈরি করেন অলঙ্কার। সৃজনশীল এই ডিজাইনারের প্রতিটি গহনা তাই আনকোরা। প্রাকৃতিক উপাদানে অনুপ্রাণিত মোটিফ তিনি গহনাতে তুলে আনেন নান্দনিক নকশার মাধ্যমে। এ ধরনের নকশার গহনা ব্যবহার করতে পারেন স্টেটমেন্ট পিস হিসেবে। একটি গহনাই হতে পারে আপনার সাজের কেন্দ্রবিন্দু। এমন জুয়েলারির সঙ্গে পোশাক বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাই কিছুটা সচেতনতা আবশ্যক। অনেক বেশি আলঙ্কারিক কারুকাজ সমৃদ্ধ পোশাক এ ধরনের গহনার সঙ্গে খুব মানানসই হবে না।

গহনা এমন একটি ফ্যাশন অনুষঙ্গ, যা শুধু মুগ্ধ হয়ে কিনে ব্যবহার করলেই চলবে না, একই সঙ্গে নিতে হবে যত্ন। কেননা গহনা বেশ নাজুক প্রকৃতির। সামান্য আঘাতে বেঁকে যায়। তাই এ দিকটি বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। অনেক দিন পুরনো হয়ে গেলে এর উজ্জ্বলতা কিছুটা কমে যায়। ধুলা বসে যায় সহজেই। উজ্জ্বলতা বাড়াতে একটি পাত্রে পানির মধ্যে একটু ডিটারজেন্ট পাউডার মিশিয়ে তার মধ্যে টুথপেস্ট লাগিয়ে গহনা কিছুক্ষণ রেখে টুথব্রাশ দিয়ে সাবধানে হালকাভাবে ঘষে নিন। দেখবেন নতুনভাবে গহনা তার উজ্জ্বলতা ফিরে পেয়েছে। এরপরও যদি কালচে ভাব থেকে যায়, তাহলে দোকানে নিয়ে পালিশ করাতে পারেন। ব্যবহার শেষে নরম, ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে ফেলতে হবে। তবে খুব বেশি ময়লা হলে পানিতে সামান্য সাবান মিশিয়ে নিয়ে ব্রাশ দিয়ে ঘষে পরিস্কার করতে হবে। অ্যান্টিকের গহনা ব্যবহার না করলে বর্ণহীন দেখায়, তবে এক ফালি লেবু নিয়ে গহনা ঘষে পরিস্কার পানি দিয়ে ধুয়ে ফেললে গহনা ঝকঝক করবে। রূপার গহনা সুন্দর রাখতে খুব সহজ যত্নের প্রয়োজন। এর জন্য প্রথমে গহনাটি ভালোভাবে মুছে তার ওপর ট্যালকম পাউডার লাগান। এরপর শুকনা সুতি কাপড় দিয়ে ঘষে পরিস্কার করে নিন। সঠিকভাবে যত্ন নিলে আপনার রূপার গহনা ভালো থাকবে দীর্ঘদিন। মনে রাখবেন স্বর্ণ, রূপা, হীরা ও মেটালের গহনা একই বাক্সে রাখা উচিত না। আলাদা বাক্সে টিস্যু দিয়ে মুড়িয়ে রাখতে হবে। ভালোভাবে গহনার যত্ন নিলে আপনার গহনা থাকবে সবসময় নতুনের মতো উজ্জ্বল, আকর্ষণীয় ও দীর্ঘস্থায়ী।