শৈলী

শৈলী

স্বপ্নভূমি সিকিমে

প্রকাশ: ১২ জুন ২০১৯     আপডেট: ১২ জুন ২০১৯

সিকিমের রাস্তা যত ওপরে উঠছে ততই ঠাণ্ডা ভাব গায়ে ছুঁয়ে যেতে লাগল এবং অন্ধকারও হয়ে আসতে থাকল। আমরা সিকিমের উদ্দেশে শিলিগুড়ি থেকে রওনা দিয়েছি সাড়ে ৩টা নাগাদ! রাঙপোতে বিনা জটিলতায় অনুমতি পেয়ে পথিমধ্যে ম্যাগি আর মোমো খেয়ে গ্যাংটক পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত ৯টা প্রায়। হোটেল কোনটায় উঠব জানি না, কিন্তু এমজি মার্গের প্রেমে পড়ে গেলাম।

এই গল্পের শুরু ফেব্রুয়ারিতে। তখন আমি নেপাল যাই, যখন আমার একদল বন্ধু সিকিম যায়। বরফের দাপটে তারা অনেক স্থানেই যেতে পারেনি। কিন্তু আমার কানে লেগে থাকল একটি শব্দ বরফ! আমি বাবা গরমের দেশের মানুষ। গরমে আমার প্রেম থাকে না, মন বসে না পড়ার টেবিলে, মেজাজ শূলে চড়ে থাকে। ঠাণ্ডা মানেই আরাম! পাঁয়তারা করতে থাকলাম কী করে এই বরফ ছোঁয়া যায়। কাছে পিঠে এত সুন্দর জায়গা, যার নাম সিকিম- সেখানে যাব না? তাও আবার এত কম খরচে? মার্চ মাস পুরোটা গেল কেমনে যাই কেমনে যাই ভেবে। অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ! রওনা দিলাম এপ্রিলের ১৬ তারিখ রাতে। ভোরে চেংরাবান্ধা, দুপুরে শিলিগুড়ি এবং সেখান থেকেই মূল যাত্রার সূচনা। প্রথমেই জিপ ভাড়া করার সময় এলো।

ট্যুরিস্টদের চাপ বেশি থাকার কারণে জিপের ভাড়া বেশি। কেউই ৩৫০০ রুপির নিচে যাবে না। আমার ট্রিপের অন্যতম উপদেষ্টা শাহরিয়ার অবশ্য বলেছিল ২৮০০ থেকে ৩০০০, যেটা তখন সম্ভব নয়। তো জিপ ঠিক করলাম! এখানে বলে রাখা ভালো, জিপ যে দেখায়, যে টাকা নেয় এবং যে চালায় তারা সবাই আলাদা। শিলিগুড়ির এজেন্টরা মূলত মধ্যস্থতা করে সিকিমের ড্রাইভারের হাতে আমাদের জীবন সঁপে দেয়। পরে তাদের হাতে! তাই সব পরিস্কার করে বলা ভালো। আমরা সবাই ছিলাম বলে ড্রাইভার বেশি ঝামেলা করেনি। আমরা সবাই পাসপোর্টের মূল পাতার ফটোকপি, ভিসা ও পোর্ট এন্ট্রির ফটোকপি, ছবি, এন্ডোর্সের পাতার ফটোকপি নিয়েছি ১০-১২ কপি করে। কারণ সব জায়গাতে এগুলো দিতে হয়েছে অনুমতির জন্য।

সিকিমের রাস্তা যত ওপরে উঠছে ততই ঠাণ্ডা ভাব গায়ে ছুঁয়ে যেতে লাগল এবং অন্ধকারও হয়ে আসতে থাকল। আমরা সিকিমের উদ্দেশে শিলিগুড়ি থেকে রওনা দিয়েছি সাড়ে ৩টা নাগাদ! রাঙপোতে বিনা জটিলতায় অনুমতি পেয়ে পথিমধ্যে ম্যাগি আর মোমো খেয়ে গ্যাংটক পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত ৯টা প্রায়। হোটেল কোনটায় উঠব জানি না, কিন্তু এমজি মার্গের প্রেমে পড়ে গেলাম। খুব সুন্দর রাস্তা। একটা অংশ শুধুই হাঁটার জন্য। মানে ট্যুরিস্টের জন্য কোল বিছিয়ে রাখা আর কী। যে হোটেলে উঠলাম তার নাম ডোমা রেসিডেন্স। এখানে হোটেলের ভাড়া ১৩০০ রুপি থেকে শুরু করে ৩০০০ রুপির মতো হতে পারে। এমজি মার্গেই হোটেল নেওয়া ভালো। বেশ হৈ হৈ এলাকা। নিজের রুচি এবং স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী রুম নিলে আরও স্বস্তি হবে!

পরদিন যাব লাচুং। এখানেও অনুমতির ব্যাপার আছে। স্থানীয় গাইড অমরের কাছে ছবি-টবি দিয়ে এলাকার সেরা চাওমিন খেয়ে ঘুমাতে গেলাম। ঘুম থেকেই উঠে শুরু হবে বরফের দিকে যাত্রা। এখান থেকে আমাদের যাত্রা বেশি আনন্দের হয়ে গেল। কারণ আমাদের চালক শম্ভু এবং তার ভাগ্নি যে কি-না গাইড আলিশা হয়ে গেল আমাদের বন্ধু। আমরা যেদিন বর্ডার পার করলাম সেদিন বাংলাবান্ধা বন্ধ ছিল। বাংলাবান্ধা দিয়ে গেলে আরও দ্রুত শিলিগুড়ি যাওয়া যায় বটে, কিন্তু নানা সীমানায় নানা কারণে প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারে। ভ্রমণের আগে সেগুলো লক্ষ্য রাখা বাঞ্ছনীয়।

লাচুঙের দিকে যাওয়ার পথ থেকে শুরু হলো আমার স্বপ্নের পথ। এই সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশের উপায় নেই। কিছু কিছু বিষয় চোখ দিয়েই শুধু দেখা যায় আর মনের খাতায় লেখা যায়। রাস্তায় মেঘ, ঠাণ্ডা, তিস্তার আঁকাবাঁকা পথ আর পাহাড়!

আমরা যাচ্ছি... সেই চারদিনের দিকে... যে চারদিন হয়তো আরেকবার প্রমাণ করল বেঁচে থাকা সত্যি আনন্দের। লাচুুঙে যখন পৌঁছাই তখন সন্ধ্যা! যে হোটেলে ছিলাম সেখানকার খাবার কী যে মজার! সবজি! কিন্তু কব্জি ডুবিয়ে খাওয়ার মতো। পেটপুরে খেয়ে পরদিন সকালে জিরো পয়েন্টে যাওয়ার ইচ্ছা। সকালে ঝর্ণার ঝিরঝির শব্দে যখন ঘুম ভাঙল, তখন তাকিয়ে দেখি ঘরের সামনে মেঘ, মেঘের ভেতর দিয়ে ঝর্ণার উঁকি... ঝর্ণার গা ঘেঁষে পাহাড়! আবার সেই পাহাড়ের কোলে মেঘ! একি ক্যামেরাতে ধরা সম্ভব?

তৈরি হয়ে রওনা দিলাম। আমরা আসার পথে দেখছি মজে যাওয়া বরফ! মন খারাপ! শম্ভু খালি বলে, 'চালিয়ে না।' এই সেই করতে করতে গেলাম জিরো পয়েন্ট। তিব্বতের বর্ডারের গা ঘেঁষা! ওরে বরফ। ঠাণ্ডা মাইনাসের কাছাকাছি। এই বরফে লাফিয়ে পড়ছি তো ওই বরফে ঝাঁপ দিয়ে ছবি তুলছি। আমি চুপচাপ পা ঝুলিয়ে বসেছিলাম একটা কোনায় কিছুক্ষণ। এখানেই নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করা যায়। আমি, বিধু, সুরভী, পার্থ, সুমন এবং ওমর ভাই মনের আশ মিটিয়ে বরফ নিয়ে খেললাম। এবং তারপর! তারপর শুরু হলো তুষারপাত! কে বলেছে তুষারপাত পাব না। কিছুক্ষণের জন্য আবেগে স্তব্ধ হয়ে গেলাম সবাই। কিন্তু আবহওয়া খারাপ হলেও বিপদ। গেল সপ্তাহেই ল্যান্ডস্লাইডের কারণে এখানে কেউ আসতে পারেনি। তাই আমরা রওনা দিলাম ইয়ামথ্যান ভ্যালির উদ্দেশে। বরফের পাহাড়, মেঘ কেটে যেখানে পৌঁছলাম- সেটাও ট্যুরিস্ট স্পট। নদীটা ছোঁয়া যায়। কিন্তু জিরো ডিগ্রিতে তা না ছোঁয়াই ভালো!

সেখানে ভরপুর ছবি তোলা হচ্ছে। এবং আবার তুষারপাত! দ্বিতীয়বারের মতো। এবার আরও তীব্র। আমি দুই হাত তুলে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। এটাই তো চাইবার ছিল। এটাই দেখার ছিল! 'জীবন এত ছোট কেনো এ ভুবনে'- ভাবতে ভাবতে গাড়িতে ফিরে আসা।

আমরা যাচ্ছি আর তুষার ঘিরে রাখছে- বরফ ঢাকা পথ বিদায় দিচ্ছে... ভালোবাসার শুভ্রতায় রাঙাচ্ছে। বের হয়েছিলাম ভোর ৬টায়। ফিরে এলাম দুপুর সাড়ে ১২টায়। লাচুঙের হোটেলে। খেয়েই বের হবো। কারণ সেই একই আবহাওয়া খারাপ করছে কোথাও আটকানো চলবে না। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে রওনা দিলাম গ্যাংটকের উদ্দেশে। আরও ঝর্ণা এবং কয়েকটি স্পট দেখে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা। লাচুঙে যাতায়াতের পথে টুকটাক স্পট যেমন ভিউ পয়েন্ট, বাটারফ্লাই গার্ডেন- এগুলো দেখায়। আগে বোঝাপড়া করে নিলে ভালো হবে। লাচুঙ থেকে গ্যাংটকে ফিরতেই ভরপুর হাঁটাহাঁটি এবং টুকটাক শপিং শেষে আবার ঘুম। সকাল সকাল তৈরি সবাই আরেকবার। এবার উদ্দেশ্য সাংগু লেক। এই রাস্তাটা ছবির মতো সুন্দর। 'রোড টু হেভেন' প্রতিটা বাঁকে বাঁকে। ছবি তোলা তো যায়-ই, তবে চোখে গেঁথে নিলে আরও ভালো। ওপরে উঠছি আর উঠছি। আবার বরফের হাতছানি। ধীরে ধীরে রাস্তার ওপর জমে থাকা মেঘ আর হিমেল বাতাস জড়িয়ে ধরছে আমাদের। যাচ্ছি সাংগুর উদ্দেশে। বড় বড় কেশরওয়ালা মহিষ আর রাস্তার ওপর গাঢ় মেঘ, বুঝলাম চলে এসেছি। সাংগুর ওপর তখন বরফ জমা নেই বটে, কিন্তু বরফের পাহাড়ের ছায়ার মায়ায় ঠিক পাগল হওয়ার দশা। দলের একজন কেবল কারের খোঁজ নিয়ে আসতেই হৈ হৈ করে চড়ে বসলাম। অমনি মেঘ কেটে উঠে গেলাম কোন সে পাহাড়ের চূড়ায়। আর আমাদের পায় কে। ঝিরঝির করে বরফের বৃষ্টি হচ্ছে। নাক জমে লাল। কমলা গাল আর মেঘের চাদর। কোন দিক দিয়ে সময় চলে গেল জানি না। কীভাবে বরফের পাহাড়ের মোহে পড়ে গেলাম সেটাও জানি না। শুধু জানি ওই দুটি ঘণ্টা আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সময়। এই সময়ে লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন পায়ের দিকে। নিজে নিজের শীতকাতরতা বুঝে শীতের কাপড় পরা খুব প্রয়োজন। যেমন পার্থর পা জমে গিয়েছিল ঠাণ্ডায়। কারও কারও হাত জমে গেছে। আবার আমার মতো বরফপ্রেমী গ্লাভস খুলে বাচ্চাদের মতো নেচেছেও।

নিচে নামতে নামতে আবহাওয়া একটু বেদিশা। মেঘ নেমে আসছে লেকের ওপর একদম!

আমরা ছবি তুলতে তুলতে বুঝলাম গাড়িতে উঠা ভুললে আজ আর ফেরার উপায় নেই। মেঘ রাস্তা কাটার আগেই ফিরতে হবে গ্যাংটক। এখানে কোনো গণ্ডগোল চলবে না।

ফেরার পথে বাঁকে বাঁকে আবার সেই রোড টু হেভেন। তবে এই দফা এই রোড টু হেভেন আরেকটু হলে হেভেনই নিয়ে নিত। কারণ, রাস্তাজুড়ে কালো মেঘ ছড়িয়ে পড়ল। এক হাত দূরের গাড়িটাও দেখা যাচ্ছে না। আমাদের শম্ভু তার ক্যালকুলাস কষে কষে এগিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ বলে, 'বরফ কা গোলা আরেহে হে!' আমরা বললাম, 'কিসকা গোল?' সে নাকিয়েই বলে- বরফ কা গোলা... তখন বুঝলাম ভারী তুষারপাতের কথা বলছে।

নাচে গানে ভরপুর সময় কাটিয়ে খাওয়া-দাওয়া শেষে দেখি মেঘ কেটে গেছে। আঁধার কাটা সোনালি বিকেল। এবার মনেস্ট্রিতে যাওয়ার ইচ্ছা। আসার পথে ঘুরে এলাম। সাদা পাহাড়ের সামনে সবুজ পাহাড়ের বুকে নানা কারুকাজে ছবির মতো আঁকা মন্দির। মন ভালো করার বিকেলে আরেকটি সোনালু স্মৃতির পালক। যে কোনো পাহাড়ি এলাকায় যে বিষয়টি আকৃষ্ট করেছে তা হলো- নানা রঙের কাপড়ে মঙ্গল বারতা লেখা। মনে হয় যেখানে যেখানে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে সেখানে এই বারতাগুলো মালার মতো ওড়ানো থাকে। যেমন দেখলাম পাহাড়ের বাঁকগুলোতে, যে কোনো সেতুতে, ঝর্ণার পাশে আবার মনেস্ট্রির দরজায়- কিংবা ভেতরে। কেন যেন মনে হয়, এই রঙ আর বারতা মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার জন্যই দেওয়া। শুধু সাজানোর জন্য নয়।

গ্যাংটকে তখনও বিকেল যখন ফেরা। কোনো মতে তৈরি হয়ে শহর দেখার পালা। এবার শপিং টুকটাক। ওদের বঙ্গবাজার মানে লাল মার্কেট ঘুরে দেখা। মোমো আর নুডলস খাওয়া। এই সেই করে সময় পর। রাতে সমাপনী আড্ডার শেষে ঘুমাতে ঘুমাতে যখন রাত অর্ধেক পার- ঘুমের মাঝে মনে হলো কেউ গান গাচ্ছে। খুব খেয়াল করে শুনলাম, গানের মাঝে হালালুইয়া- শব্দটি আছে। যেটার মানে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা। ঘুমিয়ে গেলাম। দলটা সূর্য ওঠার আগে থেকে উঠে যাওয়া অবধি শহরজুড়ে ঘুরে আর এই গান গায়। হয়তো বছরে একবারই। সেটাও পেয়ে গেলাম এই ভ্রমণে এসে! কে যে কোথায় কী পেয়ে যায় তা জানে শুধু অলৌকিক ক্ষমতা! আমরা যদি জানতামই- তাহলে কোনো কিছুকে এড়িয়ে চলতাম না। কারণ মানুষ মাত্রই ভালো লাগা আর স্মৃতি। সেই স্মৃতি নিয়ে ফিরে এলাম ঢাকায়... কৃষ্ণচূড়ার শহরে।

খরচের খাতা : মোটামুটি ভারতীয় টাকায় ১৭০০০ থেকে ২০০০০ খরচ করে অত্যন্ত বিলাসী ভ্রমণ করে আসা যাবে সিকিম থেকে। কিন্তু ভ্রমণের ব্যাপারে মাথায় রাখা দরকার, খরচ নির্ভর করে নিজ নিজ স্টাইলে ঘোরার ওপরে। কোনোভাবেই অন্যের কম খরচ দেখে নিজের ভ্রমণ ঠিক করা যাবে না।



লেখা ও ছবি : রুম্পা সৈয়দা ফারজানা জামান