শৈলী

শৈলী

অহঙ্কারের জামদানি

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯

গাণিতিক সমীকরণের বয়ন কৌশল হয় জামদানির। সোনারগাঁর বাড়ি বাড়ি তাঁত। জামদানি তাঁত। এর রয়েছে বিশিষ্টতা। হাতেই এ তাঁতের সম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন হয়। খাদি সুতায় প্রথমে শাড়ির টানার দিক সাজিয়ে নিয়ে কারসাজি চলে পড়েন জুড়ে। লিখেছেন সারাহ দীনা

একেকটি জনপদ গড়ে ওঠার পেছনে রয়েছে ভিন্ন গল্প। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁরও রয়েছে তেমনি। এখানকার গল্পটি কিছুটা রূপকথার মতো। শুনতে বা পড়তে বসে বিভ্রম হতে হয়। এ গল্প বাঙালির ঐশ্বর্যের। টানা আর পড়েনের। সানা আর বীমের। নাচনি কাঠি, নানান রকম মোটিফ আর রঙের। গল্পটি জামদানির।

গাণিতিক সমীকরণের বয়ন কৌশল হয় জামদানির। সোনারগাঁর বাড়ি বাড়ি তাঁত। জামদানি তাঁত। এর রয়েছে বিশিষ্টতা। হাতেই এ তাঁতের সম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন হয়। খাদি সুতায় প্রথমে শাড়ির টানার দিক সাজিয়ে নিয়ে কারসাজি চলে পড়েন জুড়ে। এমনটাই জানালেন তাঁতশিল্পী ইয়াজউদ্দিন। বাহারি সুতার খেলা চলে নিপুণ কৌশলে। নকশার আকৃতিগত মাধুর্য আর সুতার প্রায়োগিক বিন্যাসে তৈরি হয় বারো হাত ঐশ্বর্য। নেই কোনো গ্রন্থগত বিদ্যার ক্ষুরধার যুক্তি, কিংবা প্রযুক্তির প্রতাপ। পুরোটাই বংশগতির দান। প্রতিটি বুনন একেকটি শিল্পকর্ম। মনোযোগ দিয়ে প্যানা ফুলের মাঝে বুটি নকশা তুলতে তুলতে তাঁতশিল্পী আনিস শোনালেন সোনারগাঁর রূপকথা। বললেন, 'এক সময় মিসর থেকে লোক আসত এই সোনারগাঁয়। হীরা-জহরতের বিনিময়ে চাইত এ অঞ্চলের মসলিন।' ইতিহাসের পাতাতেও রয়েছে এমনই গল্প। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে এই অঞ্চলে এবং ইউরোপ ও ইংল্যান্ডে পুরুষ ও নারীদের শৌখিন বস্ত্র হিসেবে জামদানি অত্যন্ত আদরণীয় ছিল। বর্তমানেও মর্যাদাপূর্ণ পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে জামদানি এক অপরিহার্য পরিধেয়।

সময়ের স্রোতে হারিয়েছে নানা কিছু। তার মাঝে জামদানির নিজস্বতা অন্যতম। গর্বের ঐতিহ্যে বিষাদ করেছে ভর।

উনিশ শতকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে শুরু হয় জামদানির অবনতি। মোগল রাজশক্তি তখন ক্ষয়িষ্ণু। এমন প্রেক্ষাপটে জামদানি বয়নশিল্পীরা বঞ্চিত হন জরুরি পৃষ্ঠপোষণ থেকে। তার বাইরেও মুখে মুখে শোনা যায় চরম নৃশংসতার গল্প। সে গল্প আঙুল কেটে নেওয়ার। তাঁতশিল্পীর নান্দনিক শিল্পবোধের প্রতি চরমতম অত্যাচার। ইংল্যান্ডে বয়নশিল্পে তখন প্রযুক্তিগত উন্নতি। নতুন আধুনিক মেশিনারি সংযোজন। কায়িক পরিশ্রমে নয়, যান্ত্রিকতায় তৈরি তখন বস্ত্র। স্থানীয় বাজারে ইউরোপের তুলনামূলক সস্তা অথচ নিম্নমানের সুতার অনুপ্রবেশ ঘটছে। এ বিষয়গুলো জামদানি শিল্পকে দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত করে। এরই ধারাবাহিকতায় সুতার মান হয় নিম্নগামী। দাম পড়তির দিকে। বংশপরম্পরার জামদানি বুননের নেই কোনো গ্রন্থিত ব্যাকরণ। লিপিবদ্ধ নেই কোনো কৌশল। গাণিতিক কৌশলের জামদানির জৌলুস কালের বিবর্তনে তাই খানিকটা ম্রিয়মাণ।

জামদানি বয়নশিল্পকে ইতোমধ্যে ২০১৩ সালে ইউনেস্কো 'ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ'-এর মর্যাদা ও স্বীকৃতি প্রদান করেছে। জামদানিই বাংলাদেশের প্রথম পণ্য, যা সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ২০১৬ সালে ভৌগোলিক সূচক হিসেবে পরিগণিত হয়। বিস্ময়কর বয়নসৌকর্য বাংলাদেশের জামদানি বয়নশিল্পীদের দক্ষতা, প্রজ্ঞা ও নৈপুণ্যের সাক্ষ্য বহন করে। জীবিকার দায়ে বাজারের লঘু চাহিদার শিকার হয়ে এরাই এখন নিকৃষ্টমানের শাড়ি তৈরি করছেন দুষ্প্রাপ্য জামদানি বস্ত্রের বুনন কৌশলে। যার সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী জামদানির কোনো ধারাবাহিক সম্পর্ক নেই। তাঁতশিল্পীরা মলিন মুখে শোনান হারিয়ে যাওয়া বুনন সৌকর্য। বাজারে ভিনদেশি বস্ত্রের কদর তাদের আহত করে। জীবিকা অর্জনে গা ভাসাতে হয় স্রোতে। একটি মূল্যবান ঐতিহ্য বিনষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জামদানির প্রকৃত রূপ সবার অগোচরে রয়ে যাচ্ছে। তবে বুননের নিপুণতা যেহেতু তাঁতশিল্পীদের বংশগতির ধারকে রয়েছে, তাই বলা যায়, এই গৌরব বিস্মৃত হয়েছে মাত্র। হারিয়ে যায়নি। বাংলাদেশের বয়নশিল্পীদের অপরিসীম দক্ষতায় ভরসা রেখেই এই ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার সম্ভব। একশ' বছর আগের মিহি কাপড় ও সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণ কারুকাজ সংবলিত জামদানির অভূতপূর্ব মূলানুগ অনুকরণে সক্ষম বাংলাদেশের বর্তমান প্রজন্মের বয়নশিল্পীদের কুশলতা প্রমাণ করে, এমনটাই বলা যায় ঐতিহ্যের বিনির্মাণ শীর্ষক জামদানি উৎসব ২০১৯ ঘুরে এসে। বাংলাদেশের মাস্টার উইভারদের বংশপরম্পরায় লব্ধজ্ঞান ধরে রাখতে ও কর্মবিমুখতা রোধে তাদের সপরিবারে বয়নসংশ্নিষ্ট নতুন কাজে উদ্যমী ও অনুপ্রাণিত করা তাই জরুরি। চাই বাজারে বিদেশি বস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ। চাই জামদানির কাঁচামালের সহজলভ্যতা। একই সঙ্গে জামদানি বাজার সম্প্রসারণ ও পৃষ্ঠপোষকতা। জামদানি বয়নশিল্প বাংলাদেশের ঐতিহ্যের মৌলিক, উৎকৃষ্ট ও অন্যতম অংশ। অসাধারণ নকশায় সমৃদ্ধ জামদানি বস্তুত মসলিনেরই একটি প্রকার, যা নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ, রূপগঞ্জ ও সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চলের বয়নশিল্পীদের হাতে অনবদ্য শিল্পকর্ম। ষষ্ঠদশ শতকে মোগল শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকার নন্দিত মসলিন হয়ে ওঠে সৃজন সৌকর্যে উৎকৃষ্ট নকশাদার জামদানি। পারসিক মোটিফের সঙ্গে বাংলার নিসর্গের ফুল-ফলের নকশা সংযোজন করে বয়নশিল্পীরা জামদানিকে করে তোলেন অনিন্দ্যসুন্দর। জামদানি তাই এ জনপদের গর্ব। আমাদের ঐতিহ্যের ঐশ্বর্য। জামদানির জৌলুস রক্ষায় তাই হতে হবে নিরলস।



ছবি : রনি বাউল