শৈলী

শৈলী

আনন্দে উচ্ছল শৈশব

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯

শিশুকাল খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়েই মানবিক বিকাশ হয়ে থাকে। একটি শিশুর আনন্দঘন শৈশব তাকে সারাজীবন সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা দেয়। শিশুর বিকাশ ঘটে বাবা-মা অথবা অভিভাবক তাকে কেমন করে গড়ে তুলতে চায় তার ওপর। তাই আচরণ ও প্রাত্যহিক রুটিনে ছোট ছোট বার্তাই তার ভেতর গড়ে তুলবে সুন্দর শৈশব।

মানসিক বিকাশ হলো আচার-ব্যবহার, চিন্তা-চেতনা, কথা বলা, অনুভূতি ও ভাবের আদান-প্রদানের ক্ষমতা অর্জন। শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ছাড়া শিশু তথা মানুষের পরিপূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়। গর্ভকালে মায়ের অপুষ্টি, মা-বাবার মধ্যে কলহ, পারিবারিক নির্যাতন, মাদকাসক্তি, থাইরয়েড ও অন্যান্য হরমোনের আধিক্য অথবা অভাব, জন্মগত ত্রুটি, প্রসবকালীন জটিলতা, শব্দদূষণ, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের কারণে শিশুর বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। সন্তানের মাঝে দয়াশীলতা গড়ে তুলতে চাইলে নিজের আচরণে তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। বাড়ির সব সদস্যের সঙ্গে সুন্দর আচরণই সন্তানকে আচরণের প্রশিক্ষণ হিসেবে কাজ করবে। বিপরীতে কোনো উদ্ধত বা নেতিবাচকতা থাকলে সেটাই সন্তান শিখবে। অভিভাবকের প্রতিটা শব্দ সে নিজের মাঝে নেওয়ার চেষ্টা করবে। সুতরাং একটু খেয়াল রাখুন, আপনি তার সামনে কেমন আচরণ করছেন? কোন ধরনের শব্দ ব্যবহার করছেন? আপনি তার সামনে যত বেশি ইতিবাচক আচরণ করবেন তার আচরণে ইতিবাচক প্রভাব তত পড়বে। আপনার আচরণ সন্তানের কাছে আয়নার মতো। মূলত ছোট থেকেই শিশুদের মাঝে আপনার ও তার চারপাশের আচরণের প্রতিফলন ঘটে। সেটাই সে ধীরে ধীরে নিজের ভেতরে ধারণ করে। মনের অজান্তে প্রতিদিনই আমাদের ছোটখাটো ভুল হয়ে যায়, না চাইলেও। এই ভুলটি ধরতে পারা ও তার জন্য দুঃখ প্রকাশ এক অসাধারণ গুণ। যে কোনো ভুলে দুঃখ প্রকাশ করুন; সন্তানকেও দুঃখ প্রকাশে অভ্যস্ত করুন।

সন্তান আপনার কাছ থেকে প্রতিনিয়ত শিখছে। সেই শেখার প্রতিফলন যদি তার আচরণে লক্ষ্য করেন তাহলে তাকে অনুপ্রাণিত করুন। তার ওই আচরণের প্রশংসা করুন। ইতিবাচক আচরণের প্রভাব ও তার মাঝে জন্ম নেওয়া দায়িত্ববোধ, সাহায্য করা ও অন্যের কষ্ট বুঝতে পারার বোধের প্রশংসা করলে সে এ ধরনের কাজ করতে নিজের ভেতর থেকে এক ধরনের সাড়া পাবে। দায়িত্ববোধ, মানুষের পাশে দাঁড়ানো, মহানুভবতা একজন মানুষকে কতটা মহান করে তুলতে পারে, সে সম্পর্কে সন্তানের সঙ্গে আলোচনা করুন। এতে তার ভেতরের সুপার হিরো ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ হবে।

আমাদের দেশে প্রচুর সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবামূলক সংগঠন আছে। সন্তান একটু বড় হলে তাকে এসব সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে পারেন। সংগঠন ছাড়াও সে নিজ দায়িত্বে সেবামূলক কাজ করতে পারে। যেমন, একসঙ্গে তাদের ক্লাসরুম, স্কুলের মাঠ সব বন্ধু মিলে পরিচ্ছন্ন করা, তার জমানো টাকা দিয়ে প্রতিবেশী সুবিধাবঞ্চিত কারও জন্য ভালো কিছু করতে চাওয়া ইত্যাদি তার ভেতরে ধীরে ধীরে ধারণ করানোর চেষ্টা করুন। ঈদে ওর জন্য জামা কেনার পাশাপাশি গৃহপরিচারিকা, দারোয়ান কিংবা বাসার পাশেই একজন গরিব মানুষের জন্য একটি জামা কিনতে পারেন। কারও জন্য কেনা উপহারটি তাকে দিয়েই পাঠান। কিংবা তাকে বলুন তার একটি পুরনো খেলনা বা জামা অন্য কাউকে দিতে। এতে তার আনন্দ অনেক বেড়ে যাবে। তৈরি হবে পরিবার, দেশ ও জাতির প্রতি দায়িত্ববোধ।

মা-বাবার ঝগড়া প্রত্যক্ষ করলে পরবর্তীকালে তা অনেক শিশুর ব্যক্তিত্বে প্রভাব ফেলে। কখনও তা অস্বাভাবিকতায়ও রূপ নেয়। এতে সমাজে মানিয়ে চলতে তাদের অসুবিধা হয়। গর্ভকালে যেসব মা নির্যাতনের শিকার হন অথবা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকেন, তাদের সন্তান জন্মের পর নানা জটিলতায় ভোগে। নিউইয়র্কের মাউন্ট সিনাই মেডিকেল সেন্টারের ট্রমাটিক স্ট্রেস স্টাডিজ বিভাগে সম্পন্ন এক গবেষণায় দেখা যায়, মাতৃগর্ভে থাকার সময় যাদের মা মানসিক আঘাতের শিকার হয়েছিলেন, সেই শিশুদের সহজেই মানসিক চাপে ভেঙে পড়া এবং তাদের মধ্যে অ্যাংজাইটি বা পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্র্রেস ডিজঅর্ডার হওয়ার আশঙ্কা বেশি।

মানুষের প্রয়োজনে এগিয়ে যাওয়ার শিক্ষা পরিবার থেকেই শুরু হয়। আর শিশু যত তাড়াতাড়ি মানবিক আচরণে অভ্যস্ত হবে ততই সুন্দর হবে তার চিন্তাধারা। মানবিক গুণাবলির চর্চা এবং বিকাশকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। কেননা, মানবিকতাই পারে একটি সুন্দর মন তৈরি করতে; নৃশংসতা কমিয়ে সুন্দরকে স্থায়ী করতে।



লেখা : ফারজানা নীলা

মডেল : রুমাইশা; ছবি : শৈলী