শৈলী

শৈলী

দ্রোহের টি-শার্ট

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯

এক শান্তিপূর্ণ বাণিজ্যিক শহর হিসেবেই হংকংয়ের পরিচিতি ছিল। সেই শহরটিই এবার ফুঁ্‌সে উঠল বিক্ষোভে। প্রত্যর্পণ বিলকে কেন্দ্র করে প্রায় তিন মাস উত্তাল হয় হংকং। লাখ লাখ প্রতিবাদী নেমে আসেন শহরের রাস্তায়। পথ-ঘাট, বিমানবন্দর সব অচল করে দেয় জনতা। তাদের টি-শার্টে শোভা পায় স্বাধীনতার ডাক। সময়ের প্রকাশ ঘটায় পোশাক। হংকং বিক্ষোভে টি-শার্ট পরিহিতরা আবার যেন সেই সত্য উন্মোচন করলেন। একটু পেছনে ফিরে দেখা যেতে পারে হংকংয়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। যে কারণে পথে নামতে বাধ্য হলেন বিক্ষোভকারীরা।

১৯৯৭ সালে হংকংকে চীনের কাছে হস্তান্তর করে ব্রিটেন। এর আগে অঞ্চলটি একটি ব্রিটিশ কলোনি ছিল। তবে চীনের সঙ্গে যোগ হলেও 'এক দেশ, দুই নীতি' নিয়মের অধীনে বেশ খানিকটা স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে থাকে হংকং। অঞ্চলটির নিজস্ব আইন ও বিচার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে চলতি বছরের ৩ এপ্রিল হংকং সরকার সন্দেহভাজন অপরাধীদের চীনের মূল ভূখণ্ডে প্রত্যর্পণ করার একটি বিল উত্থাপন করে। সমালোচকদের দাবি ছিল, বিলটি পাস হলে হংকংয়ের বিচার ব্যবস্থায় চীনা প্রভাব বৃদ্ধি পাবে। এবং এতে ভিন্ন মতাবলম্বীদের চীনের কাছে প্রত্যর্পণের সুযোগ হবে। পরে ৯ জুন প্রায় ১০ লাখ মানুষ বিলটি প্রত্যাহারের দাবিতে হংকং সরকারের সদর দপ্তরের উদ্দেশে বিক্ষোভ পদযাত্রা করে। প্রথম বিক্ষোভের তিন দিন পর ১২ জুন নতুন করে পথে নামে বিলটির বিরোধীরা। তখন থেকে সহিংস আকার ধারণ করা শুরু করে এ প্রতিবাদ। বিক্ষোভকারীদের ওপর কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ছোড়ে পুলিশ। তখন থেকে টানা বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে হংকংয়ে। সময় যত গড়িয়েছে, বিক্ষোভ তত সহিংস আকার ধারণ করেছে। পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের মাত্রা বেড়েছে। পুলিশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের ওপর নৃশংস নির্যাতন চালানোর অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি চীনা হস্তক্ষেপের অভিযোগও উঠেছে। গত মাসে আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, সাদা পোশাক পরে চীনা গ্যাংয়ের সদস্যরা তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। চীন অবশ্য সে অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। এর মধ্যে জুন ও জুলাই মাসে বিলটি নিয়ে সব কার্যক্রম স্থগিত করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল হংকং সরকার। তবে তাতে থামেনি বিক্ষোভ। আন্দোলনকারীরা বিলটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।

হংকংয়ের বিগত প্রায় তিন দশকের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয় প্রত্যর্পণ বিলটি ঘিরে। পুলিশের সঙ্গে বিােভকারীদের সংঘর্ষ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। জনতা বিমানবন্দর দখলের চেষ্টা চালায়। পার্লামেন্টে প্রবেশ করে ভাংচুর চালায়। হংকংয়ের বাণিজ্যের ওপর প্রভাব পড়তে থাকে বিক্ষোভের।

গত ৮ জুন আলোচিত বিলটি বাতিল করতে বাধ্য হয় হংকং প্রশাসন। জয় হয় জনতার।

এ বিক্ষোভ যখন চলছিল, তখন ইতালির মিলানে চলে একটি ফ্যাশন শো। এর রানওয়ে থেকে সংহতি আসে বিক্ষোভকারীদের প্রতি। ফ্যাশন ব্র্যান্ড ডিএস স্কয়ার্ড টু ছিল এ ফ্যাশন শোর আয়োজক। কানাডিয়ান দু'জন ফ্যাশন ডিজাইনার ডিন ও ড্যান কাটেন ছিলেন এই ফ্যাশন শোর প্রধান নিয়ন্ত্রক। বসন্তকে তারা রূপ দিয়েছেন মুক্তির সৌরভে। রানওয়ে শুধু 'ফ্রি হংকং' লেখা টি শার্টই মডেলরা পরেননি। সেখানে সম্মাননা জানানো হয় হংকংয়ের সন্তান কিংবদন্তি ব্রুস লিকে।

এ ফ্যাশন শো-তে বিভিন্ন ধরনের পোশাকের উপস্থিতি ছিল। তবে চলমান প্রতিবাদের কারণে বেশি নজর কাড়ে হংকং আর ব্রুস লি-কে ডিজাইন করা পোশাকগুলো। হংকং থেকে ইতালির দূরত্ব কম নয়। ডিজাইনাররা প্রমাণ করলেন মানুষের বিক্ষোভে স্থান মূল বিষয়। ইচ্ছা থাকলে সংহতি জানানো যায় সহস্র মাইল দূরের মিছিলেও। ফ্যাশন শোর রানওয়েতে যেমন ঝড় তুলেছে এই পোশাক, বাজারেও তা সাড়া ফেলবে বলে মনে করছেন ফ্যাশন সার্কিটের অভিজ্ঞরা।



লেখা : হাসান শাওন

ছবি : সংগ্রহ