শৈলী

শৈলী


যোগে আনন্দ যোগে স্বাস্থ্য

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০১৯      
শরীরে বাড়তি ওজন কমানোর জন্যে আমরা কত কিছুই না করি! না খেয়ে থাকা, বিভিন্ন ধরনের ব্যয়াম, হাঁটাহাঁটিসহ বহু চেষ্টাতেও সহজে শরীরের বাড়তি ওজন কমে না। ইয়োগার এমন কিছু আসন আছে যা চর্চায় আপনি যেমন আনন্দ পাবেন, একই সঙ্গে শরীরের বাড়তি ওজন কমিয়ে নিতে পারবেন

লিখেছেন বাপ্পা শান্তনু

ছবি তৈমুর ইউসুফ



কর্মব্যস্ত জীবনে সুস্থ শরীর ও মন নিয়ে জীবন-যাপন করা সত্যিই চিন্তাবহুল এক বিষয়। প্রতিদিন পুষ্টিকর খাবার ও ব্যায়ামই পারে আপনাকে সুস্থ রাখতে। কিন্তু ব্যস্ত জীবনে শরীরের দিকে নজর দেওয়ার মতো সময় আমাদের কই! দীর্ঘ সময় অফিসে কিংবা কম্পিউটারে বসে কাজ করে অথবা বাসায় টিভি দেখে সময় কাটিয়ে দিই আমরা। ফলে সময়ের ধারাবাহিকতায় শরীরে বাসা বাঁধে বিভিন্ন ধরনের রোগ। সমস্যা যেমন আছে তেমিন আছে তার সমাধানও। সময় নিয়ে যদি কারও জিমে বা খোলা প্রাঙ্গণে গিয়ে ব্যায়াম করার মতো সময় না থাকে তবে ঘরে বসেই আপনার শরীরকে করে তুলতে পারেন সুস্থ ও সবল। একটি যন্ত্র যেমন দীর্ঘদিন অব্যবহূত থাকলে বিকল হয়ে যায় তেমনি আমাদের শরীরও কর্মময় বা কায়িক শ্রম ব্যতীত থাকলে নানান রোগ শরীরে ঘিরে ধরে। প্রাচীন ভারতের মুনি-ঋষিরা এই সমস্যার সমাধান দিয়েছেন কয়েক শতাব্দী আগে। তারা আবিস্কার করেছেন যোগ ব্যায়াম নামে এক অনন্য প্রথা। এই পদ্ধতিতে যে কেউ ঘরে বসে এবং অল্প সময় ব্যয় করে শরীর ও মনকে রাখতে পারেন সুস্থ ও স্বাভাবিক।

যোগ ব্যায়ামের কিছু উপকারিতার কথা বলি এবার। যোগ ব্যায়াম মনের সঙ্গে শরীরের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করে তুলতে সাহায্য করে। শারীরিক সক্ষমতা ও কর্মক্ষমতা বাড়াতে যোগ ব্যায়ামের জুড়ি নেই। যোগ ব্যায়াম মনের ও শরীরের ক্লান্তি দূর করে। মানসিক চাপ মুক্ত রাখে। হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখে। ফলে আমাদের দেহে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। শরীরের বাড়তি মেয়াদ দূর করে। রক্ত সঞ্চালনের মাত্রা বৃদ্ধি করে। ফলে আমাদের হৃদযন্ত্রকে স্বাভাবিক ও সুস্থ রাখে যোগ ব্যায়াম। নিয়মিত যোগ ব্যায়াম করলে আমাদের হাড়ের নমনীয়তা ঠিক থাকে এবং হাড়ের জয়েন্ট, পিঠ এবং মেরুদেণ্ডর ব্যথাজনিত সমস্যার সমাধান হয়।

ঘরে বসে কম সময়ে চর্চা করা যাবে এমন কয়েকটি যোগ ব্যায়ামের কায়দা কানুন জেনে নেওয়া যাক এবার।

হলাসন

এই আসনে আমাদের শরীরের ভঙ্গি লাঙ্গলের মতো করে রাখা হয়। তাই একে হলাসন বলা হয়।

কীভাবে করবেন

১। চিত হয়ে শুয়ে পড়ূন। পা ভেতরে টেনে ধীরে ধীরে ওপরে ওঠান। প্রথমে ৩০ ডিগ্রি, তারপর ৬০ ডিগ্রি এবং শেষে ৯০ ডিগ্রি পর্যন্ত ওপরের দিকে ওঠাবার পর পা দুটোকে মাথার পেছনের দিকে এবং পিঠকেও ওপরের দিকে তুলে শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে নিয়ে যান।

২। পা দুটোকে মাথার পেছনের দিকে মাটিতে লাগান। শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি স্বাভাবিক রাখুন। প্রথমে সুবিধার জন্য হাতকে কোমরের পেছনে লাগাতে পারেন। পূর্ণ স্থিতিতে হাত মাটির ওপরেই রাখুন। এই অবস্থায় ৩০ সেকেন্ড থাকুন। আস্তে আস্তে অভ্যাসের মাধ্যমে সময় বাড়াবেন।

৩। ফিরে আসার সময় যে ক্রমে ওপরের দিকে গিয়েছিলেন, সেই ক্রমেই হাত দিয়ে মাটিতে চাপ দিতে দিতে পা দুটো হাঁটু থেকে সোজা রেখে মাটিতে লাগান।

সতর্কতা

উচ্চ রক্তচাপ ও মেরুদণ্ডের রোগীরা এই আসন করবেন না।

বক্রাসন

কীভাবে করবেন

১। দণ্ডাসনে (পা সোজা টান টান করে বসা) বসে ডান পা মুড়ে বাঁ ঊরুর কাছে হাঁটুর সঙ্গে ঠেকিয়ে রাখুন। বাঁ পা সোজা থাকবে।

২। বাঁ হাতকে ডান পা এবং পেটের মাঝখানে এনে ডান পায়ের পাতার কাছে রাখুন বা গোড়ালি ধরুন।

৩। ডান হাতকে কোমরের পেছনে মটির ওপরে সোজা করে রাখুন। গ্রীবাকে ঘুরিয়ে ডান দিকে তাকান। ৩০ সেকেন্ড থেকে শুরু করে সাধ্য অনুযায়ী থাকবেন। এভাবে ৪-৬ বার করুন। এভাবে বিপরীত দিকেও করবেন।

চক্রাসন

কীভাবে করবেন

১। মাটিতে চিত হয়ে শুয়ে হাঁটু দুটোকে মুড়ূন। গোড়ালি নিতম্বের কাছে লেগে থাকবে।

২। হাত দুটোকে উল্টো করে কাঁধের পেছনে একটু বাঁক করে রাখুন, এতে ভারসাম্য বজায় থাকবে।

৩। শ্বাস ভেতরে টেনে কোমর ও বুককে ওপরে ওঠান।

৪। ধীরে ধীরে হাত এবং পা দুটোকে কাছাকাছি আনার চেষ্টা করুন, যাতে শরীর চক্রের মতো আকৃতি তৈরি হয়। এভাবে ১০ সেকেন্ড থেকে শুরু করে সাধ্য অনুযায়ী সময় বাড়াবেন।

৫। আসন ছাড়ার সময় শরীরকে ঢিলা করে ছেড়ে কোমর মাটিতে ঠেকিয়ে দিন। এভাবে ৩-৪ বার করুন।

ভূজঙ্গাসন

এই আসনে শরীরের ভঙ্গি ফণা তোলা সাপের মতো হয়, তাই একে ভূজঙ্গাসন বলে।

কীভাবে করবেন

১। চিত হয়ে শুয়ে পড়ূন। হাতের পাতা মাটির সঙ্গে ঠেকিয়ে রেখে হাত দুটো বুকের দু'পাশে রাখুন। হাতের কনুই ওপরের দিকে উঠে থাকবে এবং হাত দুটো বুকের সঙ্গে সেঁটে থাকবে।

২। পা সোজা থাকবে এবং পায়ের পাতা পরস্পরের সঙ্গে মিলে থাকবে। পায়ের পাতা পেছনের দিকে টান টান অবস্থায় মাটির সঙ্গে লেগে থাকবে।

৩। শ্বাস টেনে বুক এবং মাথা ধীরে ধীরে ওপরে ওঠান। নাভির পেছনের অংশ মাটির সঙ্গে লেগে থাকবে। মাথা ওপরের দিকে তোলার সময় গ্রীবা যতটা পেছনের দিকে মুড়তে পারেন, মোড়া উচিত। এই অবস্থায় প্রায় ৩০ সেকেন্ড থাকা উচিত।

ধনুরাসন

এই আসনে শরীরের ভঙ্গি ধনুকের মতো তৈরি হয়, তাই একে ধনুরাসন বলে।

কীভাবে করবেন

১। মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ূন। পা দুটোকে হাঁটু থেকে মুড়ে পায়ের গোড়ালি নিতম্বের ওপরে রাখুন। হাঁটু এবং পায়ের পাতা পরস্পরের সঙ্গে মিলে থাকবে।

২। দুটো হাত দিয়ে পা দুটোকে গোড়ালির কাছে ধরুন।

সর্বাঙ্গাসন

কীভাবে করবেন

১। চিত হয়ে সোজা শুয়ে পড়ূন। পা দুটো পরস্পরের সঙ্গে মিলে থাকবে, হাত দুটো দু'পাশে রেখে হাতের পাতা মাটির দিকে করে রাখুন।

২। শ্বাস টেনে পা দুটোকে ধীরে ধীরে প্রথমে ৩০ ডিগ্রি, তারপর ৬০ ডিগ্রি এবং শেষে ৯০ ডিগ্রি পর্যন্ত ওপরের দিকে ওঠান। পা ওপরের দিকে ওঠানোর সময় হাতের সহায়তা নিতে পারেন। ৯০ ডিগ্রি পর্যন্ত যদি সোজা না হয়, তাহলে ১২০ ডিগ্রি পর্যন্ত পা নিয়ে গিয়ে হাত দুটোকে তুলে কোমরের সঙ্গে লাগান। হাতের কনুই মাটির সঙ্গে লেগে থাকবে এবং দুটো পা একসঙ্গে মিলিয়ে সোজা করে রাখুন। পায়ের পাতা ওপরের দিকে উঠে থাকবে এবং চোখ বন্ধ থাকবে, অন্যথা পায়ের বুড়ো আঙুলের ওপর দৃষ্টি রাখুন। ২ মিনিট থেকে শুরু করে এই আসন ৩০ মিনিট পর্যন্ত করা যেতে পারে।

৩। ফিরে আসার সময় পা দুটোকে সোজা রেখে পেছনের দিকে একটু ঝোঁকান। হাত দুটোকে কোমর থেকে সরিয়ে মাটির ওপরে সোজা করে রাখুন। এবার হাতের পাতা দিয়ে মাটিতে চাপ দিয়ে যেভাবে ওপরের দিকে উঠেছিলেন, ঠিক সেভাবে ধীরে ধীরে প্রথমে পিঠ এবং তারপর পা দুটোকে মাটির ওপরে সোজা করে দিন। যতটা সময় সর্বাঙ্গাসন করা হয়েছে, প্রায় ততটা সময় বিশ্রাম করুন। া