শৈলী

শৈলী


হিমালয়কন্যার কাছে

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০১৯      

মুনতাসির রশিদ খান

সকাল বেলায় যাত্রা শুরু নেপালের সীমান্তে। জাতীয় দিবস বলে উৎসবমুখর ফাঁকা রাস্তায় ৪০ মিনিটেই পৌঁছে গেলাম পানির ট্যাঙ্ক বলে পরিচিত ভারত-নেপাল বর্ডারে। সীমান্তরক্ষী বিএসএফের লোকজন জাতীয় দিবসের শুভেচ্ছা হিসেবে চকলেট-মিষ্টি খাওয়াল। বর্ডার পেরিয়ে বাসে টিকিট কেটে অপেক্ষা...

ছুটিতে ঘুরে বেড়াতে চাইলে প্রথমেই সমস্যা বাধে ভ্রমণসঙ্গী নিয়ে। কারও সঙ্গে ছুটি মেলে না, আবার কারও বাজেট টানাটানি, কেউ-বা চায় অল্প কষ্টে অভিযানের স্বাদ না নিতে। এমন নানা ঝামেলায় বিরক্ত হয়ে ঈদের রাতে রওনা হলাম 'যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে'- বলে হিমালয়কন্যা নেপালের উদ্দেশে। প্ল্যান হচ্ছে চ্যাংড়াবান্ধা হয়ে শিলিগুড়িতে রাতযাপন করে নেপালের সঙ্গে ভারতের রানীগঞ্জ বর্ডার পার হয়ে বাসে চেপে কাঠমান্ডু যাওয়া। সেখান থেকে বাসে পোখারা হয়ে আবার বর্ডার পার হয়ে শিলিগুড়িতে রাত কাটিয়ে সোজা ঢাকা।

সন্ধ্যা ৭টায় ঢাকা থেকে শ্যামলী এন আর বাসে চেপে রওনা হওয়ার সময় কিছুটা দুশ্চিন্তা কাজ করেছে। কারণ ফেরার টিকিট নেই। এর মধ্যেই দৈববলে মিলে গেল বন্ধুর সহকর্মী সুদীপ্ত, যে কি-না কলকাতা হয়ে আসছে শিলিগুড়িতে নেপাল যাবে বলে। এবারের ভ্রমণ একেবারেই অনিশ্চিত। কোনো জায়গায় কোনো বুকিং নেই, সবটাই পথে। রাতভর বাসে চড়ে ভোররাতে সীমান্তে পৌঁছে যে বিশাল লাইন আর চরম অব্যবস্থাপনা দেখলাম, তাতে ধৈর্যের চূড়ান্ত পরীক্ষা দিতে হলো সকাল থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে। সন্ধ্যায় ঝুম বৃষ্টিতে পৌঁছে গেলাম শিলিগুড়ি শহরে। পরদিন ভারতের জাতীয় দিবস বলে সীমান্ত বন্ধ থাকার আশঙ্কাকে উড়িয়ে খেতে গেলাম বিখ্যাত হোটেল ভজহরি মান্নাতে। নিরামিষ রান্নাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে আলুর দম, শুক্তো, কলার মোচা থেকে শুরু করে নানা রকম মাছের ফ্রাই আর পাতুড়ি খেয়ে যা থাকে কপালে বলে ঢুকে পড়লাম সিটি শপিংমলের সিনেপ্লেক্সে সিনেমা দেখতে।

সকাল বেলায় যাত্রা শুরু নেপালের সীমান্তে। জাতীয় দিবস বলে উৎসবমুখর ফাঁকা রাস্তায় ৪০ মিনিটেই পৌঁছে গেলাম পানির ট্যাঙ্ক বলে পরিচিত ভারত-নেপাল বর্ডারে। সীমান্তরক্ষী বিএসএফের লোকজন জাতীয় দিবসের শুভেচ্ছা হিসেবে চকলেট-মিষ্টি খাওয়াল। বর্ডার পেরিয়ে বাসে টিকিট কেটে অপেক্ষা বিকেল ৪টার বাসের জন্য। আমাদের ১ টাকা নেপালের ১.৩৪ রুপির সমান। তাই প্রথমবার কম টাকা বদলে বেশি পেয়ে আনন্দে নেপালি থালি দিয়ে মধ্যাহ্নভোজ সেরে কাউন্টারেই ছোট ঘুম দিয়ে বাসে উঠলাম। সামনে ১২ ঘণ্টার জার্নি, বাস ভাড়া এক হাজার ২০০ রুপি। অনেকটা পথ আমাদের দেশের মতোই লাগছিল। আস্তে আস্তে বদলে যেতে লাগল ভূপ্রকৃতি। মাটির বদলে পাথর বাড়তে থাকল। দূরে দেখা যেতে লাগল পাহাড়ের হালকা রেখা, মেঘ আর পাহাড়ের যেন সম্মিলন। কিছুদূর পরপর খরস্রোতা পাহাড়ি নদী। এমন করে চাঁদনী রাতের পাহাড়ি পথে চলতে দারুণ লাগছিল। পথে যাত্রাবিরতিতে নেমে দোকানে দোকানে আমাদের দেশের কনফেকশনারি পণ্য দেখে ভালো লাগা আরও বেড়ে গেল।

সকাল ১০টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম বাস কাউন্টারে। অনেকের মতো থামেল এলাকায় না থেকে সিদ্ধান্ত নিলাম এখানেই রাত কাটাব। হোটেলে ব্যাগ রেখে বেরিয়ে পড়লাম ট্যাক্সি ঠিক করার জন্য। রোমিং করা থাকলে ইন্টারনেট দেখে সহজেই আপনি চার থেকে পাঁচ হাজারের মধ্যে সারাদিনের জন্য ট্যাক্সি নিয়ে নিতে পারবেন। না হলে কিছুটা ঠকে যেতে পারেন। কাঠমান্ডু ও তার আশপাশের মূল দর্শনীয় স্থানগুলো হলো নাগরকোট, কাঠমান্ডু দরবার স্কয়ার, শয়ম্ভুনাথ মন্দির, বৌদ্ধনাথ মন্দির, পশুপতিনাথ মন্দির এবং প্রাচীন ভক্তপুর শহর। এর বাইরেও রয়েছে বহু মন্দির, চক ও স্কয়ার। কাঠমান্ডু এমন একটি শহর, যেখানে ইতিহাস মিশে রয়েছে প্রতি ইঞ্চিতে। যে জায়গাগুলো টিকিট কেটে দেখতে হয়, সেগুলোতে সার্কভুক্ত দেশের জন্য টিকিটমূল্য নামমাত্র। সূর্যাস্ত বা সূর্যোদয় দেখতে চাইলে সবচেয়ে ভালো হচ্ছে নাগরকোট। বেশ উঁচু টাওয়ারে উঠে আপনি দেখতে পাবেন বেশকিছু পর্বতশৃঙ্গ। দুপুর ১২টার মধ্যে নাগরকোট দেখে চলে এলাম প্রাচীন শহর ভক্তপুরে। বিভিন্ন ছবির শুটিং স্পট হওয়ায় আপনার চেনা লাগতেই পারে পৌরাণিক এই শহর। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অনেকটাই পুনর্গঠিত এখন। এরপর আমরা গেলাম নেপালের অ্যাভিয়েশন মিউজিয়ামে। প্রায় হাজার খানেক বাণিজ্যিক এবং সামরিক প্লেনের মডেল দেখে সময়টা ভালোই কাটল।

বিকেলে দরবার স্কয়ার আর নানা মন্দিরের সঙ্গে বিকেলের বাকি সময় থামেলের কাছে 'গার্ডেন অব ড্রিমস'-এ ঘুরে মনে হলো পুরোনো কাঠমান্ডুর অলিগলিতে যেন একটা আজব টান রয়েছে। দরবার স্কয়ারের দিকে সন্ধ্যাটা বেশ জমে ওঠে নানা বয়সী মানুষের ভিড়ে। পুরোনো কাঠমান্ডু আর থামেলের আশপাশ হেঁটে ঘোরাটা একটা দারুণ অভিজ্ঞতা। সন্ধ্যায় থামেলের গলিগুলো জমে ওঠে নানা রকম খাবার, দোকানের পসরায়। এসব দেখতে দেখতে কখন রাতের অর্ধেকটা সময় কেটে গেল, সেটি টেরই পাওয়া গেল না।

পরদিন কাঠমান্ডু থেকে পোখারা বাসে যাওয়ার পথে পাহাড়ি সৌন্দর্য বাক্‌রুদ্ধ করে ফেলল। পোখারার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে আছে ফেওয়া হ্রদ ও তার আশপাশের এলাকা, ওয়ার্ল্ড পিস প্যাগোডা, ডেভিস ফলস, ভারাহি মন্দির ও বেশকিছু জাদুঘর। আমাদের গন্তব্য ফেওয়া লেকের পাশেই লেকসাইড রিসোর্ট। পোখারা পৌঁছে বিকেলটা ঘুরে দেখলাম পাহাড়ের মাঝের লেক আর রাতে হোটেলেই দেখলাম ঐতিহ্যবাহী নেপালি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। রাতে খাওয়ার সময় কথায় কথায় এক ইতালিয়ান ব্যাংকার বললেন, তোমার দেশ তো বেশ ভালো করছে জিডিপি আর বিভিন্ন ইকোনমিক ইন্ডিকেটে।

ভোর ৮টায় আমাদের যাত্রা শুরু সারাংকোটের লক্ষ্যে সূর্যোদয় দেখার জন্য। দেশি-বিদেশি নানা দেশের মানুষের অনেকে ওখানেই নাকি ক্যাম্প করেন ভোরে সূর্য দেখবেন বলে। আমাদের চোখের সামনেই মিটিমিটি তারার মাঝে শহুরে আলো থেকে পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে পড়া সূর্যরশ্মিতে বদলে গেল। স্পটলাইটের মতো রং বদলাতে লাগল পর্বতশৃঙ্গ। সবুজ, গোলাপি, সোনালি থেকে এমন সব রং, যা ভাষায় প্রকাশ করাই কঠিন। মাঝে মাঝে যেন মেঘ ফুঁড়ে সূর্যের আলো লেজারের মতো ছুটে আসছিল।

সারাংকোট থেকে আমরা গেলাম মাহেন্দ্র কেভ আর ব্যাট কেভে। পৃথিবীর গভীরের এই সুড়ঙ্গগুলো শীতলতায় নামতে গিয়ে মনে বেশ ভয় ও কল্পনা খেলা করছিল। উপরে শত শত বাদুড় যেন ভ্যাম্পায়ার আর ব্যাটম্যানের প্রতীক হয়ে অবস্থান করছে। এর পরের গন্তব্য গুর্খা মিউজিয়াম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সেনাবাহিনীতে সল্ফ্ভ্রমের সঙ্গে জায়গা করে নেয় গুর্খারা তাদের আনুগত্য আর সাহসিকতা দিয়ে। গত শতাব্দীতে বিশ্বের প্রায় সব বড় যুদ্ধেই তাদের অবদানের কথা শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়। নেপালের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জলপ্রপাত হলো ডেভিস ফলস। প্রকৃতির এই বিস্ময়ের মোহ কাটতে না কাটতেই গেলাম গুপ্তেশ্বর গোম্পায়, যাতে আছে একটি মন্দির। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে একসময় দেখা যাবে ওপারের ডেভিস ফলসের পানি এসে মিশেছে এখানে। এখান থেকে একটু সামনেই তিব্বতি রিফিউজি ক্যাম্প, যা দেখলে আপনার মনে হবে যুগে যুগে শক্তির অহঙ্কারে দুর্বল নিপীড়নের ইতিহাস। এখান থেকে ভারাক্রান্ত মন নিয়ে যাত্রা শুরু হলো আমাদের শেষ গন্তব্য পিস প্যাগোডা। কয়েক হাজার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে আপনার মনে হবে শান্তির দর্শন আসলেই শক্ত একটা কাজ। কিন্তু বিশাল পথ পেরিয়ে শুভ্র বিশাল মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে আপনি পথের ক্লান্তি ভুলে যেতে বাধ্য। পাশের নীল ফেওয়া লেক আর রংবেরঙের ঘুড়ির মতো প্যারাসুটের সঙ্গে শান্তিময় নীরবতা আপনাকে নেপালে বারবার আসার আমন্ত্রণ জানাবে। আপনার মনের অজান্তে বেজে উঠবে বব ডিলানের ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ডের গানের কথাগুলো-

'কত বছর বাঁচে পাহাড় সাগরে মেশার আগে?

ক'বছর কেউ বাঁচে বলো মুক্তি পাওয়ার আগে?

ক'বার দেখেও না দেখার ছলনায়, মুখ লুকিয়ে পালিয়ে সে বেড়ায়?

উত্তরটা, বন্ধু আমার, আছে সবার জানা।'