শৈলী

শৈলী


নীলে সাদায় অনিন্দ্য

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০১৯      

গোলাম কিবরিয়া

আবহমানকাল ধরে বাংলার নারী আর শাড়ি যেন একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। আর বসনের এই সাজসজ্জার সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রকৃতির রং নীল ও সাদা। সাদা মেঘমালা ভেসে বেড়ায় নীল আকাশে। সঙ্গে ডানা মেলে উড়ে বেড়ানো একঝাঁক সাদা বক, নদীর ধারে শুভ্র কাশফুলের দোলা, শিউলির সুগন্ধি স্মৃতিপটে মনে করিয়ে দেয় রবিঠাকুরের সেই কবিতা- 'আজি কি তোমার মধুর মূরতি/হেরিনু শারদ প্রভাতে/হে মাত বঙ্গ, শ্যামল অঙ্গ/ঝলিছে অমল শোভাতে'।

শরৎ বিদায় নিয়েছে, এসেছে হেমন্ত। এখনও চলছে মেঘ রৌদ্রের লুকোচুরি খেলা। আকাশে কখনও কখনও হঠাৎ মুখ গোমড়া হয়ে নেমে পড়ে অঝোর ধারায়, কখনও আবার সোনারদ্দুর। সকালে দূর্বাঘাসের ডগায় জমে শিশির কণা। নীল আকাশে সাদা সাদা মেঘ, দখিনা বাতাস, কাশফুলের মাঠ। সব মিলিয়ে এক শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশ। প্রকৃতির এই বিচিত্র খেলায় জীবনকে আরও বৈচিত্র্যময় করতে সাজ-পোশাকে আনা যেতে পারে ভিন্নতা।

মনোমুগ্ধকর প্রকৃতি বসনে ফুটিয়ে তুলেছে বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস। বিকেলে বেড়ানো, বিভিন্ন অনুষ্ঠান, নিমন্ত্রণে নীল সাদা শাড়ি পরে নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলায় ভাসতে পারেন। বন্ধুদের আড্ডায় নীল-সাদা সালোয়ার-কামিজে তুলে ধরতে পারেন শরৎ প্রকৃতি। নীল-সাদায় এ সময়ের প্রকৃতি উঠে এসেছে শাড়িতে। প্রকৃতির এই নীল-সাদা সময়ে, বসনেও থাকুক সেই ছোঁয়া। তুলতুলে সাদা মেঘ যেমন নীল আকাশের ক্যানভাসে। নীল শাড়ি নিয়ে শরৎচন্দ্র রাজলক্ষ্মীর মনোমুগ্ধরূপের বর্ণনায় বলেছেন, 'পরিয়া আসিয়াছে একখানা নীলাম্বরী শাড়ি, তাহারি সরু জরি পাড়ের সঙ্গে এক হয়ে মিশিয়াছে গায়ের নীল রঙের জামা।' এ সময়ের প্রকৃতি ফুটিয়ে তুলতে রংয়ের ক্ষেত্রে নীল রংকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। নীল রংয়ের সঙ্গে বাংলার প্রকৃতির মাধুরী দারুণভাবে মানিয়ে যায়। এ কারণে বেশিরভাগ শাড়ি নীলের ছোঁয়া রাখা হয়েছে। নীলের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি কম্বিনেশন করা হয়েছে সাদা রংয়ের।

কথা হয় অঞ্জন'স-এর স্বত্বাধিকারী ও ডিজাইনার শাহীন আহম্মেদের সঙ্গে। তিনি বলেন, 'প্রকৃতি, নীল আকাশের সঙ্গে মিল রেখে শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, টপস, পাঞ্জাবি এবং শার্ট তৈরি করা হয়েছে। যেখানে নীল-সাদা রং প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। নকশার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে টাইডাই, স্ট্ক্রিনপ্রিন্ট এবং ব্লক প্রিন্ট। গরমে সুতিই সবচেয়ে আরামদায়ক।' নীলের সঙ্গে সাদার মিশেল আর নকশার বৈচিত্র্যে সাজানো হয়েছে শরৎ সংগ্রহ। অঞ্জন'স টাঙ্গাইলের সুতি শাড়িকে বেছে নিয়েছে নীল-সাদার জন্য। বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস ঘুরে দেখা যায়, শাড়ি, সালোয়ার-কামিজে ব্লক, হ্যান্ডপেইন্ট, টাইডাই, স্ট্ক্রিনপ্রিন্ট এবং কাঁথা ফোঁড়ের নকশা করা হয়েছে। বেশিরভাগ নকশাতেই ঠাঁই পেয়েছে ফুলেল ও জ্যামিতিক মোটিফ। আবার শুধু রংয়ের মাধ্যমেও তুলে ধরা হয়েছে সুনীল আকাশ, কাশফুলের শুভ্রতা প্রভৃতি।

ফ্যাশন হাউস তাদের আয়োজনে পোশাকে তুলে ধরেছে নীল আকাশজুড়ে পাখির মতো দলবেঁধে উদাসী মেঘের ছোটাছুটি, ভোরের শিউলি, জলে ফোটা পদ্ম, নদীর পাড়ের কাশফুল প্রভৃতি। পোশাকে ব্যবহার করা হয়েছে জ্যামিতিক এবং ফুলেল মোটিফে নীল-সাদার প্রকৃতি।

এ সময়টাতে নীল-সাদা শাড়িতে বেরোতে পারেন বিকেলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কারও বাসায় নিমন্ত্রণ, বন্ধুদের আড্ডা কিংবা বাসার ছাদে দাঁড়িয়ে নীল আকাশে ভেসে বেড়ানো সাদা মেঘের ভেলা নিয়ে আসতে পারেন আপনার বসনে। নীল-সাদায় নতুন করে রঙিন হয়ে উঠছে শাড়ির পাড়, আঁচল ও জমিন।

নকশাগুলো কখনও নীল জমিনে সাদা, আবার কখনও সাদা জমিনে নীল। আর এ সমন্বয় আঁচলে, পাড়ে, কুঁচিতে নানাভাবেই বিন্যস্ত। সুতি ছাড়াও সিল্ক্ক, অ্যান্ডি সিল্ক্কসহ নানা কাপড়ের শাড়িতে নীল-সাদা ধরা দিয়েছে নানাভাবে।

সাদা আর নীল শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজ হওয়া চাই মানানসই। ধবধবে সাদা শাড়ির সঙ্গে নীল ব্লাউজ ভালো মানাবে। সেই সঙ্গে সাজটাও হওয়া চাই ঠিকঠাক। নীল-সাদা শাড়ির সঙ্গে সাজ হালকা হলেই ভালো। মেকআপ থেকে গয়না সবকিছুতেই একটি প্রাকৃতিক ভাব থাকতে হবে। চুল খোলা রাখাই ভালো। চাইলে কোঁকড়া করে ছেড়ে রাখতে পারেন। ঠোঁটে লিপস্টিকও থাকতে হবে হালকা।

এ সময়ের ভোরটা খুব স্নিগ্ধ। তবে একটু বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোদের তেজে এ আবেশ কেটে যায়। আবার হুট করে ঝরে পড়ে টাপুর টুপুর বৃষ্টি। সাজের ক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হবে এ সবকিছুই। এ সময় মেকআপের ক্ষেত্রে বেইজ মেকআপ কমপ্যাক্ট পাউডার দিয়েই সেরে ফেলুন। দিনের বেলায় চোখে কাজল, নীল মাশকারা ও আইলাইনার ভালো লাগবে। রাতে চোখে ভারি করে লাগিয়ে নিন নীল আইশ্যাডো, মাশকারা, পেন্সিল আইলাইনার ও কাজল। পোশাকের রংয়ের সঙ্গে মিলিয়ে নানা রংয়ের রঙিন কাজলের রেখাও এঁকে দিতে পারেন চোখের কোণে। সবশেষে লাগিয়ে নিন পছন্দমতো লিপস্টিক। সাজপোশাকের সঙ্গে বিশেষ করে নীল পোশাকের সঙ্গে মুক্তা এবং সিলভার রংয়ের গহনা অনেক বেশি মাধুর্য এনে দেয়। হেয়ার স্টাইলে খোলা টুল সবচেয়ে বেশি মানাবে। পেছনের চুলগুলো বেণি করে তারপর পেঁচিয়ে খোঁপা করে ফুল গুঁজে দিলেও মুগ্ধতা ছড়াবে।

নীল-সাদা শাড়ির সঙ্গে একই রংয়ের কাচের চুড়ি ভালো দেখাবে। এ ছাড়া মুক্তা বা রুপালি গয়না পরতে পারেন। তবে সেটা হালকা হতে হবে। গলায় গয়না পরলে যেমন কান খালি রাখা যায়, তেমনি কানে দুল পরলে খালি রাখতে পারেন গলা।

আকাশের নীলের সঙ্গে রং মিলিয়ে নীল শাড়ি কেনা, তার সঙ্গে নীল টিপ আর চুড়িও চাই। আবার কখনওবা সাদার শুভ্রতায় মুড়িয়ে নেওয়া নিজেকে, ঠিক যেন কাশফুলের সঙ্গে মিলিয়েই। এরপর প্রকৃতির সাজে নিজেকে সাজিয়ে বেরিয়ে পড়া বন্ধুদের সঙ্গে। ঘুরে বেড়ানো কাশবনে কিংবা কোনো নদীর পাড়ে। এ যেন কোনো উপন্যাসের গল্পের মতোই। তাই দেরি না করে সময়টাকে নিজের মতো করে উপভোগ করতে প্রকৃতির এই শান্ত-সৌম্য রূপের আবহে নীল-সাদার ভেলায় ভেসে বেরিয়ে পড়ুন। বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসেই মিলবে সাদা-নীল শাড়ি।