শৈলী

শৈলী


দিল্লি আখড়ার স্বর্গরাজ্যে

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০১৯      

ফারুখ আহমেদ

কালাডোবা, বিথঙ্গল, লক্ষ্মীর বাঁওড় হয়ে দিল্লির আখড়া। জায়গাটা পর্যটকের ভিড়শূন্য। নিরুত্তাপ দিল্লির আখড়ায় কোলাহল বহু দূরের কথা। তবে কিছু কোলাহল আছে- পানকৌড়ির কিচিরমিচির



দিল্লি আখড়ার গল্প প্রথম শুনি বাদল সাহার কাছে। তিনি একজন ট্রাকচালক। কিশোরগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে চা পান করার সময় পরিচয়। সে সময় তার কাছেই শুনেছি লক্ষ্মীর বাঁওড় জলাবন ও হিজলগাছের গল্প। তারপর বহুদিন পার হলেও যাওয়া হয়ে ওঠেনি কাটখালের চারবাংলা ও জোড়বাংলা দিল্লি আখড়া ও লক্ষ্মীর বাঁওড় দর্শনে। হঠাৎ সুযোগ চলে এলো। ঝুমুরদি সে সুযোগ করে দিলেন। ঢাকা থেকে আমরা চারজন পরিব্রাজক শরতের এক রাতে বাসে চেপে হবিগঞ্জ চলে এলাম। তারপর কালাডোবা, বিথঙ্গল, লক্ষ্মীর বাঁওড় হয়ে দিল্লির আখড়া। এই জায়গাটা পর্যটকের ভিড়শূন্য। নিরুত্তাপ দিল্লির আখড়ায় কোলাহল বহু দূরের কথা। তবে কিছু কোলাহল আছে- পানকৌড়ির কিচিরমিচির। সে গল্প বলার আগে চলুন দিল্লি আখড়ার ইতিহাস জেনে নিই।

দিল্লির আখড়ার বয়স প্রায় ৪০০ বছর। এখানে আখড়াপ্রধানকে বলা হয় সেবায়েত বা মোহন্ত। বর্তমান সেবায়েতের নাম নারায়ণ দাস। দিল্লির আখড়াতেই পরিচয় ও আলাপ। তারপর তাকে সঙ্গে করে পুরো আখড়া ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখি। তার কাছেই জানতে পারি দিল্লি আখড়ার ইতিহাস। দিল্লি আখড়ার প্রতিষ্ঠাতার নাম নারায়ণ গোস্বামী। এখানে প্রায় সাড়ে তিনশ' একর জায়গায় শুধু হিজল গাছের সারি। পুরো জায়গা দান করেছেন দিল্লির সম্রাট জাহাঙ্গীর। এবার তিনি আখড়া নিয়ে বিভিন্ন মিথ বা গল্প বলা শুরু করেন। আপনারাও শুনুন মোহন্ত বা সেবায়েতের কাছে শোনা সেসব গল্প বা মিথ। দিল্লি আখড়ার আশপাশে কোনো ঘরগেরস্থ ছিল না সেই আগে থেকেই। পুরো এলাকা পানিবেষ্টিত। এই পানিবেষ্টনী বা জলাভূমির নাম লক্ষ্মীর বাঁওড়। আর চারপাশে পানি আর মধ্যখানে দ্বীপের মতো জায়গাটি বর্তমান দিল্লির আখড়া।

বহু আগে বাঁওড় এলাকার এই অংশটুকু খুব ভয়ের জায়গা ছিল, একেবারে গা ছমছমে! দিন-রাত যখনই হোক জলপথের এই অংশে নৌকা এলেই ডুবে যেত বা কোনো না কোনো সমস্যায় পড়ত। একবার দিল্লি থেকে আসা একটি নৌকা তেমন সমস্যায় পড়ল। নৌকা তো ডুবে গেলই, একজন সাপের কামড়ে মারাও গেল। দিল্লির সম্রাট জাহাঙ্গীরের খাস নৌকা ছিল সেটি। হবিগঞ্জের বিথঙ্গল আখড়ার সাধকের কানে খবর গেলে তিনি তার প্রিয় শিষ্যকে সেই এলাকায় পাঠান। গল্প সেই সাধক ও হিজল গাছের। নারায়ণ গোস্বামী বিথঙ্গল থেকে কাটখাল এসে ধ্যানে মগ্ন হলেন। ধ্যানমগ্ন অবস্থায় প্রায়ই তিনি নিজেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বাঁওড়ের জলে আবিস্কার করতেন, নিজ ক্ষমতাবলে আবার সাধনাস্থলে ফিরেও আসতেন। পুরো এক সপ্তাহ একই ঘটনা ঘটার পর তিনি আশপাশে দৈব আওয়াজ শুনতে পান। তাদের কথা একটাই- এ জায়গা আমাদের, আপনি চলে যান। এবার সাধক তাদের সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলতে চাইলে তারা স্বমূর্তি ধারণ করে। সাধক দেখতে পান বিশাল বিশাল দৈত্য তার সামনে দাঁড়িয়ে। শেষ পর্যন্ত দৈত্যকুলের সঙ্গে সাধকের রফাদফা হয়। সাধক ও দৈত্যকুল এখানে একসঙ্গে বসবাস করবেন। তবে দৈত্যকুল রূপান্তরিত হবেন একেকটা হিজল গাছে। দানব নেতা রাজি হওয়ার পাশাপাশি অনুরোধ করলেন সাধক নারায়ণ গোস্বামী যেন তার গাছতলায় বসে সাধনা করেন, সাধক তার সে কথায় সম্মতি দেন। সেই থেকে বিশেষ হিজল গাছটি শান বাঁধানো অবস্থায় এখনও রয়েছে। প্রতি অমাবস্যার রাতে সেখানে ভোগ দেওয়া হয়।

যা হোক, পরবর্তী সময় এ ঘটনা দিল্লির সম্রাটের কানে গেলে তিনি পুরো জায়গা একটা তাম্রলিপির মাধ্যমে সাধক নারায়ণ গোস্বামীকে লিখে দেন বা দান করেন। সেই থেকে আখড়ার নাম হয় দিল্লির আখড়া।

দিল্লির আখড়ার অবস্থান কিশোরগঞ্জ এলাকায়, যা লেখার শুরুতেই বলেছি। আমরা হবিগঞ্জ থেকে বানিয়াচংয়ের বিথঙ্গল আখড়ায় গিয়েছিলাম। সেখান থেকে চলে আসি দিল্লির আখড়ায়। বিথঙ্গলে আমরা দুপুরে দই-চিড়া খেয়ে দিল্লির আখড়ায় রওনা হলে সবাই ক্লান্তিতে নৌকায় ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুম কতক্ষণ ছিল জানি না। হঠাৎ ঘুম ভেঙে জেগে দেখি চারপাশ হিজল গাছে ঘেরা। হাজারো হিজলে ঘেরা পুরো এলাকা। কোনো গাছ কোমর ডুবিয়ে, কোনোটা গলা পর্যন্ত আবার কোনো গাছ পুরোটাই জেগে আছে। ক্যামেরা টেনে হাতে নিই। ছবি তুলে চলি ফটাফট, ডেকে তুলি সঙ্গীদের, প্রকৃতির অনাবিল আনন্দে ভরা পুরো এলাকা, সে এক দৃশ্য বটে। একেবারে চোখ জুড়ানো, মন ভোলানো। হিজল গাছের সবুজ ব্যাপ্তি চোখে খুব আরাম এনে দিল। ঘুমিয়ে ছিলাম শরতের নীলাকাশ আর পেঁজা তুলোর মেঘ সঙ্গী করে। সে ঘুম ভাঙবে এমন চমৎকার মুহূর্তে তা কল্পনা করিনি।

দুপুর পৌনে ২টায় বিথঙ্গল থেকে রওনা হয়ে দিল্লির আখড়ায় পৌঁছি বিকেল সোয়া ৩টায়। বিশাল সব দৈত্যরূপী হিজলগাছ আমাদের স্বাগত জানায়। সঙ্গে একজন অপরিচিত খালা ও তার মেয়ে। খালা আখড়ার খোলা রাস্তায় চডা শুকাতে দিয়েছিলেন। চডা রান্নার কাজে ব্যবহার হয়। চডা বানানো হয় গোবর আর খড় দিয়ে। এটা হাওর অঞ্চলের ঐতিহ্য।

ঝকঝকে নীলাকাশ রোদ্দুর ভরা অথচ আখড়ার ভেতর পা দিয়ে অনুভব করি শীত ভাব। জুতা খুলে আখড়ার ভেতর প্রবেশ করেই দেখি আখড়ার আঙিনায় প্রসাদ বিতরণ হচ্ছে। খিচুড়ি-ভাত দুটোই ছিল প্রসাদের তালিকায়। ভাতের খিদেয় পেট নাড়া দিয়ে যায়। সেবায়েত নারায়ণ দাস আমাদের খাবার খেতে বললে সবাই এক লাফে রাজি হই। নিরামিষ, ডাল ও ভাত খাওয়া শেষে সেবায়েতকে সঙ্গে নিয়েই বের হই। মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলি। পেছনে পুকুরপাড় ধরে চলে যাই গরু ও হাঁসের খামারের সামনে। দিল্লি আখড়ার সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় পানকৌড়ি পাখি। দিল্লির আখড়ায় চমৎকার দুটি পুকুর আছে। হিজল ছাড়াও আছে প্রচুর দেশি-বিদেশি গাছ। সেসব গাছে রয়েছে হাজারো পানকৌড়ির বাস। পানকৌড়ির চমৎকার কিছু ছবি ছিল। ক্যামেরার লেন্স না থাকায় সেসব ছবি থেকে বঞ্চিত হই, পাঠক বঞ্চিত হলেন দেখা থেকে। পানকৌড়ি ছাড়াও সেখানে দেখি প্রচুর সাদা বক, ঘুঘু, হলদে পাখি, চিলসহ নানা নাম না-জানা পাখি। দিল্লির আখড়ার ভেতর আরও রয়েছে প্রতিষ্ঠাতা নারায়ণ গোস্বামী ও তার শিষ্য গঙ্গারামের সমাধি। সেসব ঘুরে দেখি। দেখি রান্নাঘর, অতিথিদের থাকার ঘর, নাটমন্দির, ধর্মশালা ও বৈষ্ণবদের থাকার ঘর। দিল্লি আখড়ায় সেবায়েত নারায়ণ দাসসহ তিনজন বৈষ্ণব রয়েছেন। সেখানে আমাদের সবশেষ অবস্থান ছিল দৈত্যকুল নেতারূপী শান বাঁধানো সেই হিজল গাছতলা। জায়গাটি আমাদের বেশ মনে ধরে। গোটা একটি দিন ও চাঁদনি রাত এখানে কাটাতে পারলে কী ভালোই না হতো!

প্রয়োজনীয় তথ্য :দিল্লির আখড়ার অবস্থান কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইন উপজেলার কাটখালের লক্ষ্মীর বাঁওড় এলাকায়। কিশোরগঞ্জ থেকে এখানে যেতে পারেন; আবার যেতে পারেন হবিগঞ্জ থেকে। দিল্লির আখড়ায় যাওয়ার মোক্ষম সময় বর্ষাকাল। হাওরের জলে ভেসে ভেসে আখড়ায় চলে যাওয়ার মজাই অন্যরকম। হবিগঞ্জ বা কিশোরগঞ্জ যেখান থেকেই যান সময় প্রায় একই লাগবে। আমরা ঢাকা থেকে বাসে হবিগঞ্জ, তারপর কালাডোবা থেকে বজরায় কালাডোবা হাওর ও বিথঙ্গল হাওরের বুকে ভেসে বজরায় চেপে বিথঙ্গল আখড়া হয়ে দিল্লির আখড়ায় গিয়েছিলাম। কিশোরগঞ্জ থেকে দিল্লির আখড়ায় গেলে ঢাকা থেকে ট্রেনে বা বাসে কিশোরগঞ্জ। তারপর রিকশায় একরামপুর থেকে মরিচখালী বাজার। মরিচখালী থেকে বজরায় দিল্লির আখড়া। জলপথে বজরায় চলাচল করতে হবে। সুতরাং সঙ্গে গামছা, ক্যাপ বা টুপি এবং খাবার পানি সঙ্গে রাখবেন। বিলের পানিতে ভুলেও বিস্কুট, চিপস, লজেন্স ইত্যাদির প্যাকেট ও পানির বোতল ফেলবেন না। সাঁতার জানলেও সঙ্গে অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট রাখবেন।