শৈলী

শৈলী

জিনিয়াতের স্বপ্ন বোনা

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০১৯

শৈলী ডেস্ক

সহপাঠী আর আশপাশের বন্ধুরা যখন একটি চাকরির পেছনে ঘুরছেন তখন জিনিয়াত ঘুরে বেড়াতেন প্রকৃতির পেছনে। ভ্রমণপ্রিয় মানুষ হিসেবে এ সময় বাঁধা ৯-৫টার চাকরি তার কখনোই ভালো লাগেনি। নতুন নতুন জায়গা ঘুরে দেখতে, নতুন নতুন সংস্কৃতিতে বিচরণ করতে ভালো লাগত তার। তবে শুধু ঘুরলেই তো হবে না। জীবন-জীবিকার জায়গাটাও নিশ্চিত করতে হবে।

এই কিছু একটা করার তৃষ্ণাই ঘুরে দাঁড় করায় জিনিয়াতকে। প্রথাগত চাকরি আর চ্যালেঞ্জ ছাড়া কাজ কখনোই ভালো লাগেনি তার। চ্যালেঞ্জ নিয়ে অনেক পাহাড় ট্র্যাকিং করতে করতে মনের কনফিডেন্টটাও কবে যেন আকাশছোঁয়া হয়ে গিয়েছে।

তাই তিনি এমন কিছু করতে চাইলেন যেটা তিনি পছন্দ করেন আর তার শখের সঙ্গেও সামঞ্জস্য হয়। জিনিয়াত শুধু নিজের জন্যই নিজেকে তৈরি করতে চাননি, চেয়েছেন অন্যদের অনুপ্রেরণার উৎস হতে আর মেয়েদের জন্য সুন্দর সিকিউর পরিবেশে কর্মসংস্থান তৈরি করতে। তিনি শুধু মেয়েদের নিয়েই কাজ করতে চান কারণ, তার ভাষ্যমতে, অনেক প্রতিষ্ঠানে মেয়েদের অনেক সময় খারাপ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়, যা তার অভিজ্ঞতা থেকে জানা।

সেখান থেকে জিনিয়াত জাহানের স্বপ্ন বোনা আর সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন হয় 'কাশ্মীরি বিউটি বাই জিনিয়াত' উদ্যোগ।

স্বপ্ন শুধু দেখলেই হয় না, সেটাকে যত্নের সঙ্গে লালন করে বাস্তবে রূপ দিতে হয়। প্রয়োজন হয় এগিয়ে যাওয়ার সাহসের। সেই সাহসকে সঙ্গে নিয়ে ২০১৭ সালের শেষের দিকে এই তরুণ উদ্যোক্তা শুরু করেন 'কাশ্মীরি বিউটি বাই জিনিয়াত' নামের অরগানিক বিউটি কেয়ার প্রোডাক্টের অনলাইনভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি। স্টুডেন্ট হিসেবে টাকার ইনভেস্টমেন্টকে পুঁজি হিসেবে ধরতে না পেরে অস্ত্র হিসেবে ধরেছেন প্রবল পরিশ্রম আর আত্মবিশ্বাসকে। যেই স্বপ্নের লালন ছিল অনেক দিনের সেটি সফলতার মুখ দেখতে দেরি করেনি। অচিরেই সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠেন জিনিয়াত জাহান। প্রথমে ভারতের একেক জায়গায় কোনো প্রকার পরিকল্পনা ছাড়াই চলে গিয়েছেন, বিশেষ কিছু খুঁজে পাওয়ার আশায়। বর্তমানে ভারতের ব্যাঙ্গালুরুর একজন এরোমাথেরাপিস্ট জিনিয়াতের জন্য অরগানিক প্রোডাক্টগুলো বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। ভারতের পাশাপাশি শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া এবং মিসরের বাজার থেকেও বিউটি কেয়ার প্রোডাক্টের কাঁচামালগুলো সংগ্রহ করা হয়।

প্রথম দিকে এসেনশিয়াল অয়েলসহ রূপচর্চা বিষয়ক পণ্যগুলো বিক্রি করা সহজ ছিল না। উন্নত দেশগুলোতে এগুলোর ব্যবহার অনেক বেশি হলেও বাংলাদেশের মানুষের কাছে অধিক মূল্যের এসব এসেনশিয়াল অয়েল কেনার বিষয়টি ছিল একদমই নতুন। পণ্যগুলো ব্যবহারের উপকারিতা জানানোর মাধ্যমে মানুষের মনে এ ক্ষেত্রে আগ্রহ তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে সফলতার মুখ দেখতে পায় জিনিয়াতের স্বপ্ন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এই এসেনসিয়াল অয়েল। শুধু এসেনশিয়াল অয়েল নয়, জিনিয়াতের সংগ্রহে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের অরগানিক পাউডার এবং প্রায় শ'খানেক ফেসপ্যাক পাউডার।

এ ছাড়াও কাশ্মীর থেকে জাফরান সুলভ মূল্যে বাংলাদেশের মেয়েদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন জিনিয়াত। বাংলাদেশের বাজারে ভেজালমুক্ত বিউটি কেয়ার পণ্য খুঁজতে গিয়ে অধিকাংশ মেয়ে এখন কাশ্মীরি বিউটিকেই প্রাধান্য দেয় এবং বাংলাদেশের বাজারের কথা মাথায় রেখে সবসময় উন্নতমানের পণ্য নিয়ে আসেন তিনি। এ জন্য তাকে দেশের বাইরে অনেক নতুন বাজারেরও সন্ধান করতে হচ্ছে তাকে। নিজের ভ্রমণের সঙ্গে এই কেনাকাটার কাজটিও করে ফেলেন তিনি। তবে সে ক্ষেত্রে ভ্রমণ উপভোগের সঙ্গে ক্রেতার জন্য সঠিক পণ্যটি খুঁজে পেতে কষ্টও কম করতে হয় না তাকে। যখন ভ্রমণসঙ্গীরা ভ্রমণের আনন্দ উপভোগ করতে ব্যস্ত তখন তিনি গুগল ম্যাপ হাতে নেমে পড়েন নতুন পণ্যের খোঁজে।

বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি এবং সেটি বাজারে সঠিক ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়া, সবমিলিয়ে কাজটি কিন্তু একজন নারীর জন্য খুব সহজ নয়। তবে এসব বাধাকে ডিঙিয়ে নিজের লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রবল ইচ্ছাশক্তি ছিল জিনিয়াতের কাছে।

শুধু রাজধানী নয়, দেশের ৬৪টি জেলাতেই এখন মানুষের কাছে পণ্য পৌঁছে দিচ্ছেন জিনিয়াত এবং স্বপ্ন দেখেন প্রতিটি জেলা শহরে নিজের প্রতিষ্ঠানের শাখা স্থাপনের। এসব শাখায় তিনি নিযুক্ত করতে চান সেসব অঞ্চলের নারীদেরকেই। ইতোমধ্যে তিনি চট্টগ্রাম, খুলনা, যশোর ও নারায়ণগঞ্জে তার প্রতিষ্ঠানের অনলাইন শাখা খুলেছেন এবং সুযোগ তৈরি করেছেন ব্যবসার মাধ্যমে নারীদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার। ভোক্তাদের কাছে নিরাপদে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য ব্যবসার শুরু থেকেই পাঠাও তার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে এবং ইতোমধ্যে স্বীকৃতি পেয়েছেন পাঠাওয়ের একজন টপ মার্চেন্ট হিসেবে।া