শৈলী

শৈলী


সাজে পোশাকে গায়ে হলুদে

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০১৯      
বর্তমানে বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ হয়েছে বিভিন্ন মাত্রা। গায়ে হলুদের আয়োজনেও এসেছে ভিন্নতা। আমাদের দেশে সাধারণত বর আর কনের গায়ে হলুদের আয়োজন আলাদাভাবে হয়ে থাকলেও ইদানীং একসঙ্গেই আয়োজিত হচ্ছে বর ও কনের গায়ে হলুদ। বাংলাদেশি বিয়ের সব থেকে রঙিন এবং জাঁকজমকপূর্ণ হয়ে থাকে গায়ে হলুদের অংশ। এই অনুষ্ঠানে তাই বর আর কনের সাজও হওয়া চাই একদম অসাধারণ। একটা সময় ছিল যখন বিয়ের গোসলের আগে কনেকে সারা গায়ে চন্দন ও হলুদ মাখিয়ে ভালোমতো গোসল করিয়ে দেওয়া হতো। যেন বিয়ের পোশাকে কনের গায়ের রং অনেক উজ্জ্বল ও সুন্দর দেখায়। কালক্রমে এই আনুষ্ঠানিকতার আলাদা একটা নাম ও রূপ নিয়েছে। এখন অনেক ঘটা করে গায়ে হলুদ করা হয়। বরাবরই আমাদের দেশে কনের হলুদ শাড়ি হিসেবে দেওয়া হতো হলুদ শাড়ি লাল পাড়। তবে দিনে দিনে এরও অনেক পরিবর্তন এসেছে। এখন অনেকে গায়ে হলুদেও ভিন্ন রকম শাড়ি পরে থাকে।

এখন কেবল হলুদ নয়, বরং একরঙা লাল, কাঁচা মেহেদির রং, সবুজও চলতে পারে। আপনি চাইলে ভিন্ন রঙে নিজেকে রাঙিয়ে নিতে পারেন। ফেব্রিক হতে পারে মসলিন, সিল্ক্ক, কটন, জামদানি। শাড়িতে খুব জমকালো কাজ না থাকলেই ভালো। এ অনুষ্ঠানে বরপক্ষের ও কনেপক্ষের আত্মীয়রাও একই ধরনের বা রঙের কাপড় পরলে ভালো। সঙ্গে উভয় পক্ষকে সহজেই আলাদা করা যায় এবং দেখতেও ভালো লাগে। অতীতে এ প্রচলনটাই ছিল। শুধু হলুদকে বেজ করে আপনি শাড়িতে নানা রঙের পাড় বসিয়ে দিতে পারেন। তাহলে আপনার শাড়ি ও সাজে আসবে ভিন্নতা।

তবে শুধু শাড়িই যে পরতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। আপনি যদি কমফোর্ট ফিল করেন তাহলে পরে নিতে পারেন লেহেঙ্গা অথবা লং কামিজ। আর সঙ্গে মানানসই গহনা ও সাজ। যেহেতু এ অনুষ্ঠানে ফুলই প্রধান আকর্ষণ হয়ে আসছে দীর্ঘদিন থেকে, তাই আপনি চাইলে একটু ভিন্নভাবে ফুল এবং ফুল ছাড়া গহনা দিয়ে সাজতে পারেন।

শাড়ি-গহনা সব যদি একই রঙের ম্যাচ করে পরে থাকেন তাহলে দেখতেও অনেক ভালো লাগবে।

এ আয়োজনের মাধ্যমেই বিয়ের অনুষ্ঠানের শুরু, তাই যতটা সম্ভব সুন্দর ও রুচিসম্মতভাবে সাজা যায় ততই ভালো। এ অনুষ্ঠানে শাড়ি সাধারণত এক প্যাঁচেই পরতে দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রেই শাড়ি পরার পরে মাথায় দেওয়ার জন্য অসুবিধা হয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে মাথায় আলাদা ওড়না রাখা যেতে পারে হলুদের অনুষ্ঠানে। পোশাক ও সাজে বৈচিত্র্য থাকবে কিন্তু সেখানে যেন দেশীয় সংস্কৃতির প্রভাব থাকে, তা উল্লেখ করেছেন ডিজাইনার বিপ্লব সাহা।

হলুদের পোশাক নিয়ে ফ্যাশন হাউস বিশ্বরঙ-এর কর্ণধার বিপ্লব সাহা বলেন, হলুদের সাজে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। দেশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে পাশ্চাত্যের ধারা মিশিয়ে নতুন কিছু করার চেষ্টা নজরে আসছে। যেমন চোখের কাজলে কিংবা হেয়ার স্টাইলে পাশ্চাত্যের বিভিন্ন ধারার প্রভাব দেখা যায়। তবে আমরা যে কাজটা করি আসলে সেখানে ট্র্যাডিশনাল কাজের ছোঁয়াটা থাকলে সাজটা সুন্দর দেখা যায়। আজকাল গায়ে হলুদের সাজে খুব বেশি পাকিস্তানি ও ভারতীয় প্রভাব রয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি যেন এটা এত বেশি না থাকে। আমাদের নিজদের একটা সংস্কৃতি আছে। তা যেন অটুট থাকে সাজে, তার চেষ্টা করা হয়। তিনি এর সঙ্গে আরও যোগ করে বলেন, এখন গায়ে হলুদের নাম পর্যন্ত পরিবর্তন করে হিন্দি বা উর্দু ভাষায় নামকরণ করা হচ্ছে। আমরা চাইছি এই ধারা যেন না থেকে দেশীয় ধারা টিকে থাকে আমাদের পোশাকে-সাজে। দেশীয় আয়োজনেও থাকে বৈচিত্র্য। হলুদের জন্য সুতি, হাফসিল্ক্ক, মসলিন, কাতান ও জামদানি শাড়িতে ডিজাইন করা হয় দেশি ম্যাটেরিয়াল দিয়ে। হলুদ, সবুজ, কমলা, ম্যাজেন্টা রঙের সংমিশ্রণ থাকছে শাড়িতে। বলতে পারেন একটা সচেতনতাও তৈরি করা, যেন দেশীয় পোশাকে সাজতে সবাই উদ্বুদ্ধ হয়। এমনকি আমরা ৭০-৮০-এর দশকের গায়ে হলুদের সাজকেও প্রাধান্য দিয়ে থাকি এখনকার গায়ে হলুদে।

হলুদের গহনা : হলুদের শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে গহনা তৈরির চিন্তাটাও মাথায় রাখতে হবে। হলুদের সাজের পূর্ণতা আনতে গহনা অবশ্যই জরুরি। সময়টা যেহেতু শীতকাল, তাই এখন ফুলের মৌসুম। কাঁচা ফুলের গহনাই বেশি মানানসই। এ ছাড়া শুকনো ফুলের সঙ্গেও পুঁতি-জরির কাজ, স্টোন দিয়ে তৈরি কৃত্রিম ফুলের মালা কিনতে পাওয়া যায়, যা আপনার শাড়ির রঙের সঙ্গে ম্যাচ করে অর্ডার দিয়ে বানিয়েও নিতে পারেন। যেমন গহনাই পরা হোক না কেন, ফুলের আকার ছোট হলেই ভালো। সাজে একটু ভিন্নতা আনতে চাইলে রুপা বা পুঁথির গহনাও পরতে পারেন। হাতে থাকতে পারে ফুলের গহনা। বাজুতে ফুল এবং হাতভর্তি কাচের চুড়ি।

সাজ : গায়ে হলুদে হালকা মেকআপ করলেই ভালো। কারণ বিয়ের জন্য গর্জিয়াস মেকআপ করতে হবে। তা ছাড়া হলুদের অনুষ্ঠানে একটা ঘরোয়া ভাব সবসময় বজায় থাকে। গায়ে হলুদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হলুদ রঙের শাড়ি পরানো হয়। তাই মেকআপে গোল্ডেন, ব্রাউন, ব্রোঞ্জ শেড ব্যবহার করলেই ভালো লাগে। মেকআপ হালকা হলেই ভালো দেখায়, চোখের সাজে নিজের চোখটাকে হাইলাইট করে তুলুন। গোল্ডেন, ব্রোঞ্জ, ব্রাউন আইশ্যাডো ব্যবহার করুন। সঙ্গে গাঢ় করে আইলাইনার। মাশকারা ও আইল্যাশের ব্যবহার চোখ দুটোকে করে দেয় অনেক বেশি প্রমিনেন্ট। গালে ব্রাউন ব্লাশঅন, শেড আর ঠোঁটে ন্যাচারাল লিপস্টিক। গ্লস না লাগানোই ভালো। এমন লিপস্টিক সিলেক্ট করুন, যা বেশিক্ষণ পর্যন্ত থাকে এবং হলুদে অনেক মিষ্টি খাওয়ার পরও যেন অক্ষত থাকে।

চেহারায় বাড়তি একটি সোনালি আভা আনার জন্য ব্যবহার করুন গোল্ডেন ব্রাউন শিমার। চুলে করতে পারেন খোঁপা, খোঁপায় পরতে পারেন ফুল। এ ছাড়া খোঁপার পরিবর্তে লম্বা বিনুনি করে ফুলের মালা জড়িয়ে দিতে পারেন বেণিতে বা অন্য কোনোভাবে বেণিকে ডেকোরেট করুন।

শাড়ি পরার ঢং

শাড়িটা যেমনই হোক, সেটা পরার মাধ্যমে কনের লুক বদলে দেওয়া যায়। অনেকেই আজকাল থিম ধরে হলুদের শাড়ি বাছেন। সিল্ক্ক, কোটা, তাঁত বা জামদানি কনের শাড়ি যেমনই হোক, তা পরার ধরনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। হাফ সিল্ক্কের একরঙা শাড়ি কোমরে বিছা জড়িয়েও পরতে পারেন। আবার চাইলে বাঙালিয়ানার ধাঁচেও পরতে পারেন। আবার কুঁচি বা আঁচল নিয়েও ভাবতে পারেন নতুন করে। মুনিরা এমদাদ শাড়ি পরার বেশ কিছু ধরনের কথা বললেন-

বাঙালিয়ানায়

শাড়ির আঁচল পেছনে রাখার পরিবর্তে সামনেই রাখতে পারেন। হাফ সিল্ক্ক, তসর, কাতানের শাড়ির সঙ্গে কোমরে বিছা জড়িয়ে পরা যেতে পারে। তখন গহনা একটু ভারী হলেই ভালো দেখাবে।

লেহেঙ্গার ধাঁচে

ব্লাউজ ওপরে দিয়ে কটির মতো করেও শাড়ি পরা যেতে পারে। এতে শাড়ি দেখাবে লেহেঙ্গার মতো। শাড়ির আঁচল একপাশে রেখে কিংবা চাইলে পেছন থেকে সামনে এনেও রাখতে পারেন। এ ক্ষেত্রে ব্লাউজ হতে হবে জমকালো। মখমলের কাপড় দিয়েও তৈরি করতে পারেন ব্লাউজ। আজকাল শাড়ির রঙের সঙ্গে কনট্রাস্ট (বিপরীত রং) রেখেও ব্লাউজ বেছে নিচ্ছেন কনেরা।

আঁচল টেনে ঘোমটা দিয়ে

নিত্যদিনের মতোই হলুদের শাড়িটাও পরতে পারেন। কুঁচি দিয়ে শাড়ি পরে ঘোমটা দিতে পারেন আঁচল টেনেই। সেখানে ফুলের সঙ্গে পুঁতি বা ধাতবের মিশ্রণে তৈরি গয়না ভালো দেখাবে।

ফুলের গহনা

হলুদের সাজে কনের গায়ে ফুলের গহনা তো থাকেই। তবে বদলে গেছে সেই গহনার ধরন। মিউনিস ব্রাইডালের রূপ বিশেষজ্ঞ তানজিমা শারমীন বলেন, এখন কনের শাড়ি থেকে শুরু করে চুলের বাঁধন এবং এর সঙ্গে মিলিয়ে ফুলের ব্যবহার অনেক পাল্টে গেছে। চিরায়ত যে রীতি ছিল, তা কিন্তু এখন আর নেই। সাদা, হলুদ, বেগুনি কিংবা নীলপদ্মও হলুদের সাজে ব্যবহার করা হয়।

হলুদের গহনায় ফুল বাছাই করার আগে পোশাকের রং গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে চেহারার গড়ন, চুলের দৈর্ঘ্য, ওড়না থাকবে কি-না, সেটাও দেখতে হবে।

খোলা চুলে সিঁথি করে তাতে ফুলের টায়রা বসাতে পারেন। বাকি চুলগুলো সামান্য কোঁকড়া করে একপাশে ছড়িয়ে রাখতে পারেন। এখন আবার ধাতবের সঙ্গে ফুলের গহনা মিলিয়ে পরা হচ্ছে। যেমন চোকার নেকলেসের সঙ্গে উজ্জ্বল কোনো রঙের ফুলের মালা। তাই টায়রা বা ঝাপটা হিসেবে মেটালের গহনা পরতে পারেন।

মেসি বান করে একপাশে ফুল গেঁথে নিতে পারেন। এতে সাজটা কৃত্রিম মনে হবে না। আবার আপনার চুল যদি লম্বা হয়, তাহলে উঁচু করে একটি খোঁপা করে তার পুরোটাতেই ফুল গেঁথে নিতে পারেন।

মাঝখানে সিঁথি করে পেছনের চুলগুলো একটু ফুলিয়ে খোঁপা বেঁধে নেওয়া যায়। খোঁপার চারপাশে কিংবা যে কোনো একপাশে ফুল পরতে পারেন। চুলে মুক্তার সঙ্গেও ফুল পরতে পারেন। সামনের দিকের চুলগুলো টুইস্ট করে তাতে মুক্তা বসানো যেতে পারে। আর পেছনে খোঁপা করে তাতে ফুল বসাতে পারেন। এ ধরনের স্টাইলে মাথায় ওড়নাও পরতে পারেন।

ছেলেদের পোশাক

গায়ে হলুদে ছেলের সাজে পাঞ্জাবিই সেরা। তবে পাঞ্জাবির রং উজ্জ্বল হলে ভালো। ছেলের পাঞ্জাবির রংটা হতে পারে মেয়ের শাড়ির রঙের সঙ্গে মিলিয়ে অথবা মানানসই। তবে পাঞ্জাবিতে যে কোনো একটা রঙের প্রাধান্য থাকা চাই। যে কোনো রঙের পাঞ্জাবির সঙ্গেই সাদা রঙের চুড়িদার পরলে মানানসই হয়। পাঞ্জাবির রং মিলিয়ে চুড়িদার পরলে মোটেও ভালো দেখায় না। এখন অনেকে জিনসও পরছে। পায়ে থাকতে পারে চামড়ার চটি।

কোথায় পাবেন গায়ে হলুদের সাজের সরঞ্জাম

গায়ে হলুদ এবং বিয়ের অন্যান্য আয়োজনে বাহারি ডিজাইনের ডালা, কুলা ইত্যাদি খুবই প্রয়োজনীয়। এলিফ্যান্ট রোডের বিয়ের ডালা, কুলা, বাটি বা প্রদীপ, রাখি ইত্যাদির দাম পড়বে ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে। বিয়ের উপটান, সোন্দা, চন্দন, চন্দন তেল, সোহাগপুরী ইত্যাদির দাম পড়বে ৩৫০ থেকে ৯৫০ টাকার মধ্যে। কনের জন্য আলতা ৩০ থেকে ৬০, মেহেদি ৪০ থেকে ১২০, পাটি ১৫০ থেকে ১ হাজার ৬০০, হলুদ তোয়ালে ১২০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত। বিয়ের অনুষঙ্গের মধ্যে আরও রয়েছে আফসান, রুমাল, পালকি ও ঝুড়ি। া