শৈলী

শৈলী


হিমেই বিয়ে

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০১৯      

হাসান শাওন

কবি আবুল হাসান লিখেছিলেন এক অবিনাশী সত্য কথন। 'মানুষ মূলত বিরহকামী, কিন্তু মিলনই মৌলিক।'

সেই মৌলিকত্বের খোঁজেই মানব-মানবীর সঙ্গে মিলিত হয়। আমাদের সমাজ ও ধর্মীয় রীতিতে এই মিলন আখ্যায়িত হয় বিয়ে নামে। জীবনের আশ্চর্য এই লগ্ন নিয়ে চলে তুমুল মাতামাতি। ঘরের অন্দরসজ্জা থেকে বাইরের আলোকসজ্জা- কিছুই বাদ থাকে না। অতিথি আপ্যায়ন থেকে নববধূকে বরণের সব আয়োজনেই থাকে আন্তরিকতা। বাদ যায় না পোশাকও। বর-কনের চেষ্টা থাকে এ উপলক্ষে সবার চেয়ে আলাদা থাকার। সেইসঙ্গে বিয়েতে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব সবারই থাকে পোশাক নিয়ে একটি ভিন্ন রুচি প্রদর্শনের প্রবণতা।

ঋতু অনুযায়ী আমরা পার করছি হেমন্ত। এই হেমন্ত, শীত আর বসন্ত আমাদের অঞ্চলে বিয়ের ঋতু হিসেবে শনাক্ত হয়ে থাকে। প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে মানুষও চায় মেতে উঠতে। তাই এই বিয়ের মৌসুমে একটা সাজ সাজ রব চোখে পড়ে।

বিয়ের পোশাক বদলেছে যুগে যুগে। আমাদের দেশে ষাটের দশকের বিয়ের পোশাক আর সাম্প্রতিক সময়ের বিয়ের পোশাকের মধ্যে পার্থক্য অনেক।

একটা সময় বিয়ের পোশাক মানে অবধারিতভাবে মনে করা হতো বেনারসি শাড়ি। আর পুরুষদের জন্য শেরওয়ানি। এখন অনেকটা বদলেছে এ প্রথা। নানা নিরীক্ষা চলছে বিয়ের পোশাক নিয়ে। শুধু পোশাক নয়, বিয়ে নিয়ে গড়ে উঠেছে বিরাট এক বাণিজ্যিক খাত। প্রতিষ্ঠিত হয়ে উঠছে ওয়েডিং প্ল্যানার প্রতিষ্ঠানগুলো। বিয়ের পোশাক, খাবার, ছবি তোলা এখন শুধু পরিবারের মধ্যেই আবদ্ধ থাকছে না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন রকম সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

তরুণ ওয়েডিং প্ল্যানার, ডিজাইনার ও হ্যাপি ইভেন্টসের কর্ণধার সাফিয়া সাথী মনে করেন, বিয়ে নিয়ে এই পরিবর্তন ইতিবাচক।

তিনি বলেন, একটা সময় বিয়ের আগে মার্কেটে মার্কেটে ঘুরে বিয়ের পোশাক বা অন্য অনুষঙ্গগুলো কেনা হতো। অনেক সময় অর্থের অপচয় হতো। এখন একটি ওয়েডিং প্ল্যানার প্রতিষ্ঠান সবই করে দিচ্ছে। নতুন একটি সেবা খাত গড়ে উঠছে দেশে। উচ্চবিত্তদের একটি অংশ এখনও বিয়ের কেনাকাটার জন্য বিদেশে যাচ্ছে। মধ্যবিত্তরা এখন দেশেই বিয়ের বাজার-সওদা করছে।

বিয়ের পোশাকের সাম্প্রতিক প্রবণতা সম্পর্কে সাফিয়া সাথী বলেন, সাম্প্রতিক বিয়ের পোশাকে নতুনত্ব চায় বর-কনে উভয়ই। গতানুগতিক পোশাক পরতে নারাজ এই সময়ের ব্রাইডরা। তিনি বলেন, চলতি ট্রেন্ড ও ক্রেতার চাহিদা মাথায় রেখে এবার বিয়ের মৌসুমের পোশাক ডিজাইন করেছি আমি। পোশাকে হেভি বা ভারী কাজ নিয়ে চিন্তা না করে এখনকার কনেরা চাচ্ছেন একটু ভিন্নতা। বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে স্টাইল এবং স্মার্টনেস। তা ছাড়া বিয়ের পোশাকটি সবার চেয়ে আলাদা হওয়াটাও জরুরি। একই সঙ্গে তা হওয়া চাই ক্ল্যাসিক ও স্টাইলিশ।

বিয়ের শাড়ি সংরক্ষণ করে পরবর্তী প্রজন্মকে দেখানোর একটি রীতি আমাদের অঞ্চলে আছে। এটি হতে পারে এক দিনের পোশাক। কিন্তু এর ধারাবাহিকতা চিরজীবনের।

সাফিয়া সাথী বলেন, ট্র্যাডিশনাল বিয়ের পোশাক হিসেবে আমাদের দেশে বেনারসি, সিল্ক্ক, এন্ডি, মসলিনের জনপ্রিয়তা অনেক। এসব শাড়ির জমিনে হ্যান্ড এমব্রয়ডারি ও মেশিন ওয়ার্ক করা হয়েছে। এ ছাড়া আছে সিকুইন ও স্টোন ওয়ার্ক।

যেহেতু আজকাল কনেরা বিভিন্ন ধরনের পোশাক পরতে পছন্দ করে, তাই তাদের চাহিদার কথা চিন্তা করেন আমাদের সংগ্রহে আছে লেহেঙ্গা, সারারাহ, কামিজ, সঙ্গে লং ঘাগরা, লং ফ্রক। এসব পোশাকে প্রধানত ব্যবহার করা হয় মসলিন কাপড়। তার ওপর নিখুঁত কারচুপি কাজে নকশা বুনে তৈরি করা হয় বিয়েতে পরার মতো আড়ম্বরপূর্ণ জমকালো পোশাক।

তিনি আরও বলেন, মেনস কালেকশনে আমি সবসময়ই সিম্পলিসিটিতে প্রাধান্য দিয়ে থাকি। বিয়ে বা বৌভাতে পরার জন্য শেরওয়ানি, প্রিন্স কোট এখনও পছন্দের শীর্ষে। প্রতিনিয়ত নতুন কিছুর খোঁজে ফ্যাশন সচেতনরা। তাই কাপড়ের ধরনে বৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করেছি। কটকি, জ্যামিতিক, ফুলেল ইত্যাদি মোটিফ ব্যবহার হয়েছে আমাদের এবারের শেরওয়ানি ও পাঞ্জাবিতে। এই শীতে অর্থাৎ বিয়ের মৌসুমের কথা চিন্তা করেই তৈরি করা হয়েছে এসব পোশাক।

বিয়ের পোশাকের মতোই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হচ্ছে বিয়ের সাজ। এখন প্রতিটি মহল্লায়ই গড়ে উঠেছে মেয়েদের জন্য পার্লার। তবে এগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন করা যেতে পারে। তবে এর ফলে বিপুল নারীগোষ্ঠী উদ্যোক্তাতে পরিণত হয়েছে এটা আমরা যেন ভুলে না যাই।

বিয়ের সাজ নিয়ে স্টাইলার নুজহাত খান বলেন, 'বিয়ের সাজ নির্ভর করে ব্যক্তিগত পছন্দ ও ইচ্ছার ওপর। ট্রেন্ডের চেয়ে এই বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এ ছাড়া গায়ে হলুদ, বিয়ে ও বৌভাত অনুষ্ঠানভেদে ভিন্ন হয় সাজ-পোশাক।

বিয়ের মাসখানেক সময় হাতে রেখেই রূপচর্চা শুরু করতে হবে। নিয়ম মেনে ভালোভাবে করতে হবে খাওয়া-দাওয়া।

তিনি বলেন, মুখে মেকআপ করার আগে ভালো ব্র্যান্ডের ক্লিনজার দিয়ে মুখ ধোয়া জরুরি। বিয়ের মাসখানেক আগ থেকে মুখের ত্বক হাইড্রেটেড রাখলে মেকআপ ভালো স্যুট করে। ফাউন্ডেশন বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও বিশেষ নজর দিন। ত্বকের সঙ্গে শেড মানানসই না হলে মেকআপ ফুটে উঠবে না।

তিনি আরও বলেন, বিয়ের মেকআপের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ চোখকে সাজিয়ে তোলা। আপনি কেমন চোখের সাজ চাইছেন সেই অনুযায়ী কথা বলে নিন আপনার মেকআপ আর্টিস্টের সঙ্গে। চোখের সাজে আইশ্যাডোর ব্লেন্ডিং কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ। মুখের সাজের সঙ্গে যেন বেমানান মনে না হয় লাইনার আঁকার স্টাইল। চোখকে আরও সুন্দর করতে চোখের নিচে ব্যবহার করতে পারেন হাইলাইটার।

ঠোঁটের সাজের ক্ষেত্রে নুজহাত খান বলেন, পোশাকের রং এবং সাজের সঙ্গে ম্যাচ করছে, এমন লিপ কালারই বাছুন। আপনার সম্পূর্ণ সাজ যদি হালকা ধাঁচের হয় তবে বেছে নিতে পারেন গাঢ় লাল অথবা মেরুন লিপস্টিক। স্টেইনও ব্যবহার করতে পারেন লিপ কালার লাগানোর আগে, যা দীর্ঘ করবে ঠোঁটের রং।

তাই যারা এ বছর বিয়ের কথা ভাবছেন, তাদের জন্য নজরকাড়া পোশাক অপেক্ষা করছে, এ কথা বলাই যায়। দেরি না করে বেছে নিন বর-কনের জন্য মানানসই পোশাকটি। উদযাপন করুন জীবনের অনবদ্য লগ্নকে।া



মডেল : নাবিলা ও জুবাইদুল হক

পোশাক :সাফিয়া সাথী

মেকআপ : পারসোনা

স্টাইলিং : নুজহাত খান

সৌজন্য : ক্যানভাস স্টুডিও

ছবি : সৈয়দ অয়ন