শৈলী

শৈলী

সময় এখন ব্যাডমিন্টনের

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০১৯

আসাদুজ্জামান

পশ্চিমাকাশে সূর্য অস্ত গিয়ে রাত নেমে আসতে না আসতেই দূর থেকে শব্দ ভেসে আসছে। একটু কাছে যেতেই শব্দ আরও জোরালো হলো। 'স্ম্যাশ, নো...সার্ভিস লস্ট, সাইড চেঞ্জ, গেম বল...' কোর্ট থেকে ভেসে আসছে চিৎকার। খেলায় টানটান উত্তেজনা। দু'পাশে বাঁশের সঙ্গে বোর্ড ঝুলিয়ে লাগানো হয়েছে ডজনখানেক লাইট। সেই আলোর ঝলকানিতে র‌্যাকেট আর কর্কের ঠাসঠাস শব্দ। চারদিকে র‌্যাকেট হাতে অপেক্ষমাণ খেলোয়াড়, ছোট-বড় অনেক দর্শকের মধ্যেও তুমুল উত্তেজনা। কাঁঠালবাগানের খান হাসান আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভেতরে গেলে চোখে পড়বে ব্যাডমিন্টন খেলার এমন চিত্র। শুধু এখানে নয়, রাজধানীসহ দেশের বেশিরভাগ এলাকাই এখন ব্যাডমিন্টন খেলায় সরগরম। শীতের শুরু থেকেই ধুম পড়ে এ দেশে মৌসুমি খেলা হিসেবে পরিচিত ব্যাডমিন্টনের।

খেলা ঘিরে মিলনমেলা

একটি মাঠে একসঙ্গে শুধু চারজনের খেলার সুযোগ থাকায় অনেকের খেলা সম্ভব হয় না। তাই প্রয়োজন হয় একাধিক কোর্টের। তা সম্ভব না হলে দুই এক সেট পরপর খেলোয়াড় পরিবর্তন করে খেলা হয়। খেলার জন্য কোর্ট কাটা ও সরঞ্জাম কেনার প্রয়োজন হয় বেশ কিছু টাকার। ব্যক্তিগত র‌্যাকেট ছাড়া সবই নিয়মিত খেলোয়াড়দের চাঁদা থেকেই করা হয়। খেলা ঘিরে গল্প-আড্ডা ও অনেকের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। তুলনামূলক ভালো খেলোয়াড়দের কদরও বেড়ে যায়।

খেলোয়াড়দের অধিকাংশই ক্লাস কিংবা অফিস শেষ করেই প্রস্তুতি নেন মাঠে যাওয়ার। এ সময় তাদের জন্য অন্যরকম একটি পাওয়া। ব্যাডমিন্টন মন ও শরীর ভালো রাখার অন্যতম মাধ্যম। সঙ্গে বাড়তি বিনোদন পাওয়া।

দর্শক এবং ছোটদের সঙ্গে আসা অভিভাবক ও খেলোয়াড়দের মিলনমেলায় পরিণত হয় একেকটি খেলার মাঠ। নানা খাবারের আয়োজনও হয় হরহামেশা। খেলতে খেলতে আনাড়ি প্লেয়ারও পাকা প্লেয়ার বনে যান। তখন একটি টুর্নামেন্ট আয়োজন না করলেই নয়। প্রত্যেক মৌসুমের শেষে ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্ট আয়োজন চোখে পড়ে। আবার বিজয় দিবস ও থার্টি ফার্স্ট নাইটে চলে বিশাল আয়োজন। ক্রমেই শীতের প্রকোপ বাড়তে থাকে। শীত জেঁকে বসলে খেলার আনন্দ বেড়ে যায়।

সুস্থ শরীর সুস্থ মন

ব্যাডমিন্টন খেলা সম্পর্কে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ শাহরিয়ার বলেন, ব্যাডমিন্টন একটি শারীরিক কসরতের খেলা। এটি মানসিক ক্লান্তি দূর করে কাজের আগ্রহ বাড়ায়। ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। গাজীপুর হেলথ কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. তারিক হাসান বলেন, এক ঘণ্টা ব্যাডমিন্টন খেললে প্রায় ৫০০ ক্যালরি শক্তি বার্ন হয়। কাজের প্রতি আগ্রহ এবং মনোযোগ বাড়ায় এই খেলা। মন সতেজ ও ফুরফুরে রাখে। নিয়মিত খেলায় বাড়ে দক্ষতা ও সহনশক্তি।

সারাদেশে অনন্য এক খেলা

বিশেষ করে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ খেলা সারাদেশে বিস্তার লাভ করে। শহর-গ্রাম-গঞ্জে, কলোনি-পাড়া-মহল্লায় প্রতিটি স্থানেই ব্যাডমিন্টন খেলার ধুম পড়ে। সন্ধ্যা হলেই বড়দের মাঠে ছুটতে দেখে ছোটরাও আবদার করে একটা র‌্যাকেট ও শাটল, যা নিয়ে তাদের সময় কাটে। প্রতিবছরের মতো এবারও হালকা শীত পড়তে না পড়তেই পাড়া-মহল্লায় শুরু হয়ে গেছে ব্যাডমিন্টন খেলা। মাঠ, ফাঁকা জায়গাগুলোয় কাটা হয়েছে ব্যাডমিন্টনের কোর্ট। তরুণদের পাশাপাশি ছোট ও মধ্যবয়সীরাও যোগ দিচ্ছেন ব্যাডমিন্টন খেলায়। পিছিয়ে নেই নারীরাও। বিভিন্ন স্থান ঘুরে পুরুষের পাশাপাশি নারী খেলোয়াড়দেরও দেখা যায়।

হিম কুয়াশায় ঢাকা

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা- কাঁঠালবাগান, ধানমন্ডি, কলাবাগান, লালবাগ, আজিমপুর, মিরপুর, কল্যাণপুর, মোহাম্মদপুর, ইন্দিরা রোড, শান্তিনগর, খিলগাঁও, বেইলি রোডসহ রাজধানীর প্রতিটি এলাকাতেই কোর্ট কাটা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় সব হলেই কাটা হয় ব্যাডমিন্টন কোর্ট। হলের এসব কোর্টে খেলা চলে তুলনামূলক গভীর রাত পর্যন্ত। হাকিম, মল ও ডাস চত্বরেও ছড়িয়ে পড়ে খেলার রেশ। হাতিরপুলের ফিকামলি ও আব্দুল হালিম কমিউনিটি সেন্টারে মাসিক চাঁদায় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জিমনেশিয়ামের দুটি স্থায়ী কোর্টে সদস্য হয়ে খেলতে পারেন বছরজুড়ে। ধানমন্ডি লেকের পাড় ধরে রয়েছে ৯টি কোর্ট। শীতে চাপ বাড়লেও বছরজুড়ে খেলাপ্রেমীরা ব্যস্ত রাখেন কোর্টগুলো। অনেকে আবার বাসার ছাদেও ব্যবস্থা করেছেন খেলার। এতে অংশ নেন পরিবারের বিভিন্ন বয়সী সদস্য। শীতের মৃদু হাওয়া যেন খেলায় কোনোরকম বাধা সৃষ্টি করতে না পারে, সেজন্য পাটের চট, ত্রিপল টানানো হয়।

কলাবাগানে বাসার ছাদে ব্যাডমিন্টন খেলার ব্যবস্থা করেছেন মোহাম্মদ আরেফিন সিদ্দিক। তিনি বলেন, ব্যাডমিন্টন খেলা আমার শখ। প্রায় সারাবছর সকালে লেকের ধারে খেলা এখন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। শীত এলে বাসার ছাদে নিয়মিত খেলোয়াড় ছাড়াও আমার বাড়ির বিভিন্ন বয়সের সদস্যকে খেলার সুযোগ করে দিই। এটি একটি পারিবারিক উৎসবে রূপ নেয়। শুধু শারীরিকভাবে নয়, এই খেলা আমাকে মানসিকভাবেও শক্তি জোগায়।

এখন সময় ব্যাডমিন্টনের

জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে ব্যাডমিন্টন খেলাকে বাংলাদেশের জনপ্রিয় খেলা বলা যায় কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে। কেননা, শীত মৌসুম এলেই ব্যাডমিন্টন খেলার তোড়জোড় লক্ষ্য করা যায়। এ সময়কে বিবেচনায় নিয়ে এলে মনে হবে ব্যাডমিন্টনই বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো সম্পূর্ণ বিপরীত। শীত মৌসুম বাংলার প্রকৃতি থেকে বিদায় নেওয়ার সঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলাও বাংলার আকাশ থেকে প্রায় হারিয়ে যায় বললেই চলে। আশার কথা হলো, ব্যাডমিন্টন ফেডারেশন, মিরপুর ইনডোর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনডোর, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাঠ, ধানমন্ডি লেকে খোলা কোর্টসহ ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু কোর্টে সারাবছরই চলে খেলা। ব্যাডমিন্টনপ্রেমীরা ব্যক্তিগত ও অফিসিয়াল কাজের ব্যস্ততা থেকে নিজের জন্য একটু সময় বের করে বাঁচিয়ে রাখেন এই খেলা।

কেনাকাটা

ব্যাডমিন্টন খেলার জন্য শুরুতে একটা যোগ্য স্থান নির্বাচন করতে হবে। সেখানে নির্দিষ্ট মাপ অনুযায়ী কোর্ট কেটে রাতে খেললে উভয়পাশে লাইট লাগানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এক হাজার টাকার মধ্যেই কোর্ট কাটা, বোর্ড ও বাঁশ কিনতে পারবেন। নিরাপদ বিদ্যুৎ সংযোগ ও হ্যালোজিন বাতি কিনতে খরচ পড়বে আরও প্রায় আড়াই হাজার টাকা। দাম নির্ভর করে কতগুলো বাতি এবং কী ধরনের তার। এখন প্রয়োজন একটি নেট। দু'পাশে বাঁশের সঙ্গে ৫০০ থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে একটি নেট কিনে নির্দিষ্ট উচ্চতায় লাগাতে হবে। মাঠ খেলার জন্য প্রস্তুত হলে আপনার প্রয়োজন র‌্যাকেট। বাজারে সাধারণত ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা দামের র‌্যাকেট পাওয়া যায়। আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী বেছে নিন। এবার প্রয়োজন শাটল, যার শরীরে চলবে যত নির্যাতন। ৫০ থেকে ১২০ টাকায় প্রতিটি শাটলকক, প্লাস্টিক বা নাইলনের শাটল কিনতে পারবেন। মাটি কিংবা পাকা যেখানেই খেলা হোক, ভালো এক জোড়া শু প্রয়োজন। এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে ভালোমানের একজোড়া শু কেনা যায়। ব্যাডমিন্টন খেলায় পোশাক একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি ফর্স্টমুভিং স্পোর্ট হওয়ায় ছোট ও ফ্লেক্সিবল জার্সি, শর্টস ও ট্রাউজার পরা প্রয়োজন। ৩০০ থেকে এক হাজার টাকার মধ্যে ভালোমানের জার্সি, শর্টস ও ট্রাউজার কিনতে পারবেন। রাজধানীর স্টেডিয়াম মার্কেট, গুলিস্তান, নিউমার্কেট, পল্টন, মিরপুরসহ শীতের সময় সুপার স্টোর ও অলিগলির স্টেশনারির দোকানেও পাওয়া যায় ব্যাডমিন্টন খেলার প্রয়োজনীয় সব জিনিস। সব প্রস্তুত হলে শুধু এ মৌসুমেই নয়, আপনি সারাবছরই খেলতে সক্ষম হবেন। হয়ে উঠবেন একজন শাটলার।

খেলার নিয়ম-কানুন

ব্যাডমিন্টনের কোর্ট সমতল আয়তাকৃতির হয়ে থাকে। একক ও দ্বৈত উভয়ক্ষেত্রে যার দৈর্ঘ্য ১৩.৪ মিটার বা ৪৪ ফুট। দ্বৈত কোর্টের প্রস্থ ৬.১ মিটার বা ২০ ফুট, এককে ৫.১৮ মিটার বা ১৭ ফুট। নেটের উচ্চতা ১.৫৫ মিটার বা পাঁচ ফুট এক ইঞ্চি।

একক ও দ্বৈত উভয় খেলায় সাধারণত ১৫ থেকে ২১ পয়েন্টে গেম হয়। উভয় খেলোয়াড় বা দল ২০-২০ পয়েন্ট অর্জন করলে সে ক্ষেত্রে ২ পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে থেকে জয়লাভ করতে হবে, অর্থাৎ ২২-২০, ২৫-২৩ ইত্যাদি।

উভয় দলের পয়েন্ট সমান হওয়াকে ডিউস বলে। মনে রাখতে হবে, এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩০ পয়েন্টের আগে পাওয়া ব্যক্তি বা দল বিজয়ী হবে। তিনটি গেমের মধ্যে যে বা যে দল দুই খেলায় জিতবে, তারাই বিজয়ী হবে।

একক খেলার সময় সার্ভিসকারীর পয়েন্ট শূন্য বা জোড় সংখ্যা হলে খেলোয়াড় তাদের ডান দিকের কোর্ট থেকে সার্ভিস করবে এবং বিজোড় সংখ্যা হলে বাম দিকের কোর্ট থেকে সার্ভিস করবে। প্রতি পয়েন্টের পর খেলোয়াড়রা তাদের সার্ভিস বা রিসিভ কোর্ট বদল করবেন।

সুস্থ শরীরের খেলা

ব্যাডমিন্টন খেলতে হলে আপনাকে অবশ্যই শারীরিকভাবে ফিট হতে হবে। কারণ, এটি উচ্চ শারীরিক কসরতের খেলা। তীক্ষষ্ট দৃষ্টি, গতি ও প্রচুর শক্তির প্রয়োজন ব্যাডমিন্টন খেলায়। দ্রুত ছোটাছুটি করতে হয় বলে বেশ শারীরিক পরিশ্রম হয়। শরীরের মেদ কমাতে এটি অসাধারণ একটি শারীরিক ব্যায়াম। নিয়মিত খেললে শারীরিক ফিটনেস বৃদ্ধি পায়। শারীরিক পরিশ্রমের পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তি দেয় এটি। শীত তাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এই খেলা আপনার ফ্লেক্সিবিলিটি ও কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।

সতর্ক থাকুন

বিপদ এড়াতে বৈদ্যুতিক লাইন চেক করে নিন। কোর্ট উঁচু-নিচু থাকলে সমতল করুন। খেলা শুরুর আগে অবশ্যই ওয়ার্মআপ করে নিতে হবে, না হলে পেশিতে টান লাগতে পারে। কেডস ও ঢিলেঢালা পোশাক পরে খেলুন। ত্রুটিপূর্ণ র‌্যাকেট পরিহার করুন, যাতে অন্য কেউ আহত না হয়। যাদের চোখে সমস্যা তারা অল্প আলোতে খেলা থেকে বিরত থাকুন। খেলার মাঠে পানি, স্যালাইন রাখতে পারেন। একাধারে দীর্ঘ সময় না খেলে মাঝে মাঝে বিরতি নিন। খেলা শেষে বৈদ্যুতিক সংযোগ ও খেলার সরঞ্জাম নিরাপদ স্থানে রাখুন, যা পরবর্তী খেলা সহজ করবে।



ছবি : অনলাইন ও মিডিয়া কাপ ব্যাডমিন্টন