শৈলী

শৈলী

ধনেশ পাখির উৎসবে

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০১৯

প্রতি বছর ১ থেকে ১০ ডিসেম্বর নাগাল্যান্ডের কিসামায় হর্নবিল উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। উৎসবে প্রতিদিন থাকে নাগাল্যান্ডের ১৬টি আদিবাসীর ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনা। এ ছাড়া থাকে নাগা কৃষিপণ্য, ফুল, ফল, আলোকচিত্র, শিল্পকর্ম ও নানা ঐতিহ্যবাহী পণ্যের প্রদর্শনী। ঘুরে এসে লিখেছেন গাজী মুনছুর আজিজ

ঠিক দুপুরে পৌঁছি নাগাল্যান্ডের কিসামার হর্নবিল উৎসবে। মেঘালয়, আসাম হয়ে একটানা প্রায় ৩৮ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে আসি এখানে। উৎসবে তখন নাগাল্যান্ডের আদিবাসীদের নাচ-গানের পরিবেশনা চলছে। গ্যালারিতে বসে কিছুক্ষণ পরিবেশনা দেখার পর দুপুরের বিরতি। এরপর মঞ্চে শুরু হয় নাগা মরিচ খাওয়ার প্রতিযোগিতা। এটিও উৎসবের অংশ। ঝালের জন্য নাগা মরিচ পৃথিবী বিখ্যাত। কিছুক্ষণ মরিচ খাওয়া দেখে ট্যাক্সিতে আসি আমাদের থাকার জায়গায়। উৎসবের জায়গা থেকে এটি প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। জায়গাটির নাম ডাউন। আর জায়গার নামই ডাউন হোম স্টে। পথের পাশে পাহাড়ের কোলঘেঁষা একটি বাড়ি। বাড়ির উঠান আর বারান্দাজুড়ে ফুলের টব, সাজানো-গোছানো ছিমছাম। এক দেখাতেই ভালো লাগল। দলের তিন সদস্য কামাল, আমির আর মতিন ভাইয়ের জায়গা হয়েছে নাগাল্যান্ডের রাজধানী কোহিমা শহরের একটি হোটেলে। দলনেতা মনা ভাই, মানিক, ফাহমি ও আমি থাকব এ বাড়িতে। কোহিমা থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে এ বাড়ি। বাড়িতে উঠে ব্যাগ রেখে ঠান্ডা পানিতে গোসল সেরে ফ্রেশ হয়ে চা-বিস্কুট খাই। এরপর আবার ট্যাক্সিতে আসি উৎসবে। গ্যালারিতে বসে দেখি স্থানীয় আদিবাসীদের নাচ-গানের পরিবেশনা। স্থানীয়দের পাশাপাশি গ্যালারি জুড়ে আছেন বিভিন্ন দেশ ও ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা অসংখ্য পর্যটক-দর্শক।

হর্নবিল বা ধনেশ পাখির নামে এ উৎসবের আয়োজক নাগাল্যান্ড সরকারের নাগাল্যান্ড ট্যুরিজম। এবারের উৎসব ১৯তম আয়োজন। প্রতিবছর ১ থেকে ১০ ডিসেম্বর এ উৎসব হয়ে আসছে। ২০০০ সালের ১ ডিসেম্বর নাগাল্যান্ড রাজ্য দিবস উদযাপন উপলক্ষে এ উৎসবের সূচনা হয়। সেই থেকে প্রতি বছর হয়ে আসছে। মূলত স্থানীয় আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের লক্ষ্যেই এ উৎসবের আয়োজন।

আমরা উৎসবে যোগ দিই ৭ ডিসেম্বর। একপাশে পাহাড়ের কোলঘেঁষে গ্যালারি। অন্যপাশে মঞ্চ। মাঝে খোলা মাঠ। এ মাঠেই চলছে পরিবেশনা। সবই দলীয় পরিবেশনা। প্রতি দলেই আছেন নারী-পুরুষসহ ২০ থেকে ৩০ জন। কিছু দল নারী-পুরুষ মিলে। আবার কিছু দল শুধু পুরুষ নিয়ে আর কিছু দল শুধু নারী নিয়ে। তারা তাদের কৃষিকাজ, মাছ ধরাসহ জীবন-যাপনের নানা সংস্কৃতি ও তাদের উৎসব-পার্বণের ঐতিহ্যকে তুলে ধরছেন নাচ-গানসহ বিভিন্ন পরিবেশনার মাধ্যমে। সবার পোশাকই উজ্জ্বল রঙের। এর সঙ্গে আছে বিচিত্র ধরনের গহনা। ধনেশ পাখির কৃত্রিম ঠোঁট ও পালকের ব্যবহারও আছে গহনায়। এ ছাড়া আছে রঙিন পুঁতি ধাতব, সুতাসহ নানা ধরনের গহনা। এসবের পাশাপাশি প্রায় সবার মাথায় রয়েছে সুতা-কাপড়, ধনেশ পাখির কৃত্রিম ঠোঁট, পালকসহ বিচিত্র ধরনের মুকুট। কিছু কিছু দল তাদের পরিবেশনায় ব্যবহার করে ঢাল-বল্লম, বড় আকৃতির ঢোল, কৃষি সরঞ্জাম ইত্যাদি। সব কিছু মিলিয়ে বৈচিত্র্যময় পরিবেশনা।

একে একে ১৬টি আদিবাসী দলের পরিবেশনা দেখে গ্যালারি ছাড়ি। ততক্ষণে বিকেল গড়িয়েছে। পরের অনুষ্ঠান সন্ধ্যার পর। এ ফাঁকে আমরা আসি 'নাগা ঐতিহ্য গ্রাম' ঘুরতে। মূলত জায়গাটির নাম কিসামা হলেও এর পোশাকি নাম নাগা ঐতিহ্য গ্রাম। উৎসবের গ্যালারির পাশেই পাহাড়ের কোলঘেঁষে এ গ্রাম। এটি আসলে মডেল বা নমুনা গ্রাম। নাগার ঐতিহ্যবাহী যে ১৬টি আদিবাসী আছে, তাদের নমুনা গ্রাম এটি। এ গ্রামে প্রতিটি আদিবাসীর আলাদা নমুনা বাড়িঘর আছে। উৎসবে যারা পরিবেশনা করেন, তারা উৎসবের দিনগুলোতে এ বাড়িতে থাকেন, রান্নাবান্না ও খাওয়া-দাওয়া করেন। খাবারগুলোও থাকে তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যের। খাবারের যেসব তৈজসপত্র, যেমন-গ্লাস, মগ, থালাবাটি এসবও কাঠ বা বাঁশের তৈরি কিংবা তাদের ঐতিহ্যের। প্রতিটি বাড়ির ভেতর-বাইরে উপস্থাপন করা হয়েছে তাদের পোশাক, গহনা, কৃষি সরঞ্জাম, দা, ছুরি, কাঁচি, বাঁশ, বেত বা কাঠের তৈরি ঝুড়ি, ডালাসহ বিভিন্ন পাত্র, ঢাল, বল্লমসহ জীবন-যাপনের নানা অনুষঙ্গ। বাড়িগুলো কাঠ, বাঁশ, বেত, পাতার তৈরি। সব ঘরের ভেতর তাদের নমুনা চুলাসহ রান্নাঘরও আছে। সব বাড়ির চালাই ছন বা পাতার।

গ্রাম দেখে সন্ধ্যার পর আবার বসি গ্যালারিতে। এ পর্বের পরিবেশনা লোকগানের প্রতিযোগিতা। এ প্রতিযোগিতাও উৎসবের অংশ। এ পর্ব শেষে হাঁটতে শুরু করি থাকার জায়গার উদ্দেশে। বেশ ঠান্ডা পড়ছে। এর মধ্যেই হাঁটছি আমরা। অনেকটা নির্জন পাহাড়ি পথ। বেশ লাগছে। ঘণ্টা খানেক লাগল আসতে। সকালে নাশতা সেরে আবার আসি নাগা ঐহিত্য গ্রামে। প্রায় সব বাড়ির উঠানে দেখি আদিবাসীদের নাচের প্র্যাকটিস। অর্থাৎ আজ মঞ্চে তারা যে পরিবেশনা করবেন, তারই প্র্যাকটিস করছেন। ঘুরে ঘুরে তাদের প্র্যাকটিস দেখি। সেইসঙ্গে দেখি তাদের বাড়িঘরের অন্দর-বাহির। অনেক বাড়ির সামনে তাদের ঐহিত্যবাহী পণ্য ও খাবার দিয়ে প্রদর্শনীর মতো করা হয়েছে। এর মধ্যে তাদের ঐতিহ্যবাহী বন্দুকও আছে। বারুদ দিয়ে চলে এ বন্দুক। আমাদের মানিক ভাই সম্ভবত একশ' রুপি দিয়ে ফাঁকা আওয়াজ করে দেখেছেনও।

উৎসব উপলক্ষে নাগা কৃষিপণ্য, ফুল, ফল, আলোকচিত্র, শিল্পকর্ম ও নানা ঐতিহ্যবাহী পণ্যের প্রদর্শনী চলছে। নাগা তথ্য ও প্রকাশনা বিভাগ, শিল্প ও বাণিজ্য বিভাগ, শিল্প ও সংস্কৃতি বিভাগ এর আয়োজন করেছে। পাশাপাশি রয়েছে রাইফেলস বিভাগের অস্ত্র ও অন্য সামরিক বিষয়ের প্রদর্শনী। এসব প্রদর্শনী দেখে আসি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জাদুঘরে। এটি উৎসবস্থলেই। এ জাদুঘরের বর্ণনা দেব আরেক গল্পে। সব দেখে বসি গ্যালারিতে। ততক্ষণে দিনের প্রথম পরিবেশনা শুরু হয়েছে। আয়োজকদের কাছ থেকে জানা গেল উৎসবের প্রতিদিনই নাগাল্যান্ডের ১৬টি আদিবাসীর পরিবেশনা থাকে। আমরা দুপুর পর্যন্ত দেখে বের হই কোহিমার উদ্দেশে।



ছবি :লেখক