শৈলী

শৈলী


শীতে সুরভিত

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০১৯      
ফ্যাশনের ঋতু শীত চলে এসেছে। নিজেকে তাই সবসময় রাখতে পারেন ফিটফাট। পোশাকের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে ত্বক চায় বাড়তি যত্ন। তাহলেই এই শীতে থাকবেন সুরভিত। ত্বকের যত্নের আদ্যোপান্ত নিয়ে লিখেছেন তৌহিদুল ইসলাম তুষার

এই আবহাওয়ায় যে কারও ত্বক নিষ্প্রাণ ও রুক্ষ হয়ে পড়ে। এতে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছুই নেই, দরকার আলাদা যত্ন। যারা সারাদিন বাইরে কাজ করেন, তাদের ত্বকে বাইরের ধুলাবালি জমা হবেই। তাই সন্ধ্যা বা রাতে বাড়ি ফিরে জমে থাকা ময়লা বা ব্যবহূত মেকআপ উঠিয়ে নেওয়া জরুরি। সে সঙ্গে নিতে হবে ত্বকের বাড়তি যত্ন। অনেকেই তাই রাতে রূপচর্চায় ব্যস্ত সময় কাটান। এটা মোটেও খারাপ কিছু নয়। কারণ এই ময়লা তুলে না ফেললে ত্বকের ছিদ্রগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। ত্বক স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারবে না। ফলে ব্রণ, ব্ল্যাক হেডস, হোয়াইট হেডস বা ত্বকের আরও সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রথমেই খেয়াল রাখতে হবে আপনার ত্বক কেমন। সাধারণ, রুক্ষ, তৈলাক্ত নাকি দুটির সংমিশ্রণ। খুব সহজেই জানতে পারবেন বিষয়টি। খুব সহজে একটা পরীক্ষা করতে পারেন। ঘুম থেকে উঠে মুখে হাত বুলিয়ে দেখুন। যদি আপনার ত্বক মোলায়েম হয়, খুব বেশি তৈলাক্ত না হয়, তবে আপনার ত্বক সাধারণ। যদি ত্বক মোলায়ম না হয় আর খসখসে অনুভব করেন, তবে রুক্ষ ত্বক। আর তৈলাক্ত ত্বকে হাত দিলেই বুঝতে পারবেন।

শীতে অনেকেই পানি লাগাতে চান না। তারা প্রয়োজনে হালকা গরম পানি করে নিন। তবুও শীতের রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে অবশ্যই ত্বক পরিস্কার করে নেওয়া প্রয়োজন। এ জন্য প্রথমে অলিভ অয়েল বা বেবি অয়েল দিয়ে মুখ ভালো করে ম্যাসাজ করে নিতে পারেন। এর পর কুসুম গরম পানিতে কাপড় ভিজিয়ে মুখটা মুছে ফেলুন। পরে ভালো কোনো ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধুয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন।

রাতে রূপচর্চার ক্ষেত্রে অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে চোখের যত্ন ঠিকমতো হচ্ছে কি-না। চোখের ডার্ক সার্কেল কমাতে ঘুমানোর আগে কোরানো শসা বা আলু ব্যবহার করতে পারেন। এগুলো সবার ঘরেই কম-বেশি থাকে। আলু বা শসা আগে থেকে কেটে ফ্রিজে সংরক্ষণ করতে পারেন। কারণ ঠান্ডা হলে ভালো। চাইলে ঠান্ডা টি-ব্যাগ চোখের ওপর ১০-১৫ মিনিট রাখতে পারেন। মানসিক চাপের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে চোখের ওপর। স্ট্রেস বা টেনশন থেকে যথাসম্ভব দূরে, মনের আনন্দে থাকার চেষ্টা করুন। পর্যাপ্ত পানি খান, সময়মতো ঘুমান। চোখ নিমেষে হয়ে উঠবে ঝকঝকে, উজ্জ্বল।

অনেকে আবার শীতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ে ঠোঁট ফাটা নিয়ে। এ সমস্যা খুব সহজে সমাধান করা যায়। আধা চা চামচ মধু ও এক চা চামচ অলিভ অয়েল মিশিয়ে ঠোঁটে লাগিয়ে ঘুমাতে পারেন। চাইলে ব্যবহার করতে পারেন গ্লিসারিনও।

একটু সময় পেলে পুরো শরীরেই রাতে ময়েশ্চারাইজার লাগাতে হবে। সম্ভব হলে ঘুমানোর আগে কুসুম গরম পানিতে শরীর ধুয়ে নিন। সমপরিমাণ অলিভ অয়েল বা বডি অয়েল ও পানির মিশ্রণ গলা থেকে পা পর্যন্ত লাগাতে পারেন। যে কোনো ধরনের ত্বকেই এটি মানিয়ে যায়। এই মিশ্রণ লাগানোর পর ডিপ ময়েশ্চারাইজিং ক্রিম লাগিয়ে নিতে পারেন। আবার তেল মালিশ করতে না চাইলে শুধু ডিপ ময়েশ্চারাইজিং ক্রিমও ব্যবহার করা যায়।

প্রতি রাতে পা ধুয়ে লোশন লাগিয়ে ঘুমাতে যান। রাতে পা প্রথমে সাবান দিয়ে পরিস্কার করে ২ টেবিল চামচ কুসুম গরম অলিভ অয়েলের সঙ্গে ১ চা চামচ লবণের মিশ্রণ তৈরি করে তা পায়ে ভালো করে ম্যাসাজ করুন। এতে মৃতকোষ ঝরে যাবে, গোড়ালি নরম হবে, রক্ত চলাচল ভালো হবে। মুখের জন্য যে স্ট্ক্রাব ব্যবহার করেন তা দিয়েও ম্যাসাজ করতে পারেন। পা ধুয়ে লোশন লাগিয়ে শুয়ে পড়ুন। সারাদিন পর পা দুটিকে যথোপযুক্ত আরাম দিন। হাতের যত্নও নিতে পারেন একইভাবে। মুখ, হাত, পা যে কোনো ম্যাসাজই করতে হবে হালকা হাতে, আলতোভাবে। যাদের বড় চুল, তারা বেণি করে নিন ঘুমানোর আগে। তাতে চুল সারারাত ঘষা খাবে না। ছোট চুল হলে অসুবিধা নেই। তেল ম্যাসাজ করলে ভালো ঘুম হবে হবে। নখ ফেটে বা ভেঙে যাওয়ার সমস্যা কমাতে ঘুমানোর আগে হাত-পায়ের নখে অলিভ অয়েল ম্যাসাজ করে নিন। এতে সারারাত নখ আর্দ্রতা পাবে।

ত্বকের বাড়তি যত্ন

সপ্তাহে একদিন ব্যবহার করতে পারেন ফেস মাস্ক। মাস্ক শুধু ত্বক থেকে ময়লা, টক্সিনস, ইমপিউরিটিস দূরই করে না, বরং ময়েশ্চারাইজও রাখে। এই মাস্কগুলো কিনে বা বাড়িতে বানিয়ে ব্যবহার করতে পারবেন। বেসন, হলুদ, মধু, টমেটো, মুলতানি মাটি, চন্দন ইত্যাদি মিলিয়ে মাস্ক তৈরি করা যায়।

অনেকে ত্বকের তৈলাক্তভাব দূর করতে পাউডার ব্যবহার করেন, যা ত্বকের জন্য অনেক ক্ষতিকর। এগুলো ত্বকের লোমকূপ বন্ধ করে দেয়। তাই পাউডার ব্যবহার না করে টিস্যু বা ব্লটিংপেপার ব্যবহার করুন।

মেকআপ পছন্দ করলেও কিছু বিষয় মাথায় রাখবেন। এই সময় ফাউন্ডেশন ব্যবহার না করাই ভালো। এর বদলে টিনটেড ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন। মেকআপ ব্রাশ এবং স্পঞ্জ সবসময় পরিস্কার রাখুন।

বারবার ত্বকে হাত দেওয়ার ফলে হাতে থাকা ব্যাকটেরিয়াগুলো চলে যায়। তাই ত্বকে হাত দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। সবসময় ফেস টাওয়াল পরিস্কার রাখবেন। মেকআপ প্রোডাক্ট এবং ব্রাশ অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার করবেন না।

পিম্পল হলে সেটা গেলে দেওয়া থেকে অনেকেই বিরত থাকতে পারেন না। কারণ, এটা অনেক তৃপ্তিদায়ক। পিম্পলের ওপরে সামান্য টি ট্রি অয়েল লাগিয়ে রাতে ঘুমাতে যান।

ত্বকের কোনো সমস্যা হলে জরুরি ভিত্তিতে ডাক্তারকে দেখান। সমস্যাগুলো জানান এবং পরামর্শ নিন। কারণ, এই সময়ে হরমোনাল সমস্যাগুলো দেখা দেয় অনেক বেশি। তাই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে কিছু করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

স্বাস্থ্যবান এবং সতেজ ত্বক পেতে সানস্ট্ক্রিন ব্যবহার করতেই হবে। বাইরে যাওয়ার ২০ মিনিট আগে সানব্লক ব্যবহার করবেন। সানব্লকটিতে যেন কমপক্ষে এসপিএফ ৩০ থাকে।

কিছু পরামর্শ

কখনোই মেকআপ না মুছে ঘুমাতে যাওয়া উচিত নয়। মেকআপ যখনই করুন, মুখ পরিস্কার করতে হবে, তা না হলে ত্বকের ক্ষতি হবে।

কী ধরনের ক্রিম ব্যবহার করবেন সেটা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ কতটা ক্রিম ব্যবহার করেন। তৈলাক্ত ত্বকের জন্য কম ক্রিম ব্যবহার করতে হয়। তবে যাদের ব্রণ আছে তাদের নাইট ক্রিম ব্যবহার না করাই ভালো। শুস্ক ত্বকের জন্য বেশি পরিমাণে ক্রিম প্রয়োজন।

নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি। যারা বাড়ির কাজ করেন, প্রত্যেকবার হাত ধুয়ে নিলে ত্বক শুস্ক হয়ে যায় ও বলিরেখা পড়ে। তাই নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা দরকার। এতে ত্বকে পুষ্টি জোগায়।

ঘুমানোর আগে এক গ্লাস পানি খেয়ে নিন। পেট পরিস্কার রাখার জন্যও পানি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। রাতে খাওয়ার পর খেতে পারেন এক কাপ চায়নিজ জেসমিন টি। এতে শরীরে মেদ জমবে না।

নিয়মিত পরিচর্যা, সুষম খাবার, সুন্দর জীবনযাপন আপনাকে ভালো ও সুস্থ রাখবে আর সুস্থতা প্রতিফলিত হবে আপনার বাহ্যিক সৌন্দর্যে। তাই আপনার বিরামহীন কর্মব্যস্ততার মধ্যেও ঘুমের আগে এটুকু ঘরোয়া পরিচর্যায় আপনি থাকবেন একদম সুস্থ, প্রাণবন্ত ও সুন্দর।