শৈলী

শৈলী


বর্ণের মেলা

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০      

মিনাক্ষী বিশ্বাস

ভাষার ইতিহাস জানা যায় কী করে? ইতিহাসের জন্য বেশ কিছু পদ্ধতি অবশ্য আছে। যেমন সরকারি কাগজপত্র, বিভিন্ন লেখকের প্রকাশিত পুস্তকাদি, সংবাদপত্র ইত্যাদি। তবে এর থেকেও আদিম ইতিহাস আছে আজকের এই ভাষা আর ভাষার লিখিত রূপ বর্ণমালার। প্রাচীন মানুষের তৈরি গুহাচিত্র ধরা হয় যোগাযোগের জন্য প্রথম চিত্রিত লিপি। তাদের চিত্রিত ছবি তারা ব্যবহার করত সাংকেতিক চিহ্ন হিসেবে। এমনকি প্রাচীন মিসরের চিত্রলিপিও ভাষা ইতিহাসে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীন মিসরের চিত্রলিপিকে বলা হয় হায়ারোগ্লিফিক, যা এক ধরনের সাংকেতিক বর্ণমালা। আমাদের বাংলা বর্ণমালার ইতিহাস বেশ পুরোনো। ব্রাহ্মীলিপি থেকে নানা বিবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসেছে আজকের বাংলা বর্ণমালা, যা কিনা চলছে তিন সহস্রাধিক বছর ধরে।

পশ্চিমা সংস্কৃতিতে কালো রংকে শোকের প্রতীক ধরা হয়। তবে আমাদের উপমহাদেশে এ ধরনের কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম না থাকলেও সুপ্রকাশে সাদা পোশাকের একটা প্রাধান্য দেখা যায়। যে কোনো সংস্কৃতিতেই সাদা কিন্তু পবিত্রতা বা শান্তির প্রতীক। তবে মজার বিষয় হলো, বৈজ্ঞানিক বিশ্নেষণ দেখতে গেলে সাদা আর কালো দুটোই বৈপরীত্যের রং। বিজ্ঞান বলছে, সাদা রং তৈরি করা হয় সূর্যরশ্মি থেকে। আর আলোর অনুপস্থিতিই হলো কালো। তিনটি মৌলিক রংয়ের আলো প্রায় সমান পরিমাণে চোখে আপতিত হলে এবং তা পারিপার্শ্বিকের চেয়ে উজ্জ্বলতর হলে চোখে সাদা রংয়ের দর্শন অনুভূত হয়। আর কালো সে ক্ষেত্রে সব রংয়েরই অনুপস্থিতি। যদিও আমাদের সংস্কৃতিতে পশ্চিমের মতো ড্রেস বা কালার কোড বিষয়টি দিবস উদযাপনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবুও যে কোনো জাতীয় শোক দিবস বা একুশে ফেব্রুয়ারিতে সাদা-কালো পোশাকেই আমরা বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। সে কথা মাথায় রেখেই বাংলাদেশের ফ্যাশন হাউস সাদাকালোসহ সবাই তাদের নকশায় নিয়ে এসেছে বেশ কিছু নতুনত্ব। সাদা ও কালো রং তাদের পোশাকে প্রাধান্য তো আগে থেকেই পেত। কিন্তু এবার সঙ্গে যোগ হয়েছে বাংলা বর্ণমালা।

একুশ প্রতিটি বাঙালি জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে বাংলার দামাল ছেলেরা আমাদের মুখের ভাষা, মায়ের ভাষা রক্ষার্থে প্রাণ দিয়েছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে মাতৃভাষার জন্য এ রকম আত্মত্যাগের নজির আর নেই। সেই থেকে প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি এই শহীদদের আত্মদানকে স্মরণ করা হয় পরম শ্রদ্ধাভরে; শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে।

ভাষার প্রতি বাঙালির যে মমত্ববোধ, একুশের মাধ্যমে তা উঠে আসে লেখা, রেখা এবং দৈনন্দিন জীবন-যাপনে; এমনকি ফ্যাশনের ভুবনেও। একুশের ভাবনার সঙ্গে মিল রেখে পোশাকে বর্ণমালার ব্যবহার ব্যাপক জনপ্রিয়। আর পোশাকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একুশের গান, কবিতা, স্লোগান ও বাংলা ভাষায় রচিত পঙ্‌ক্তিমালা, যেখানে ফুটে উঠেছে বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্যের নানা গৌরবগাথা। এ ছাড়া শহীদ মিনার, মানচিত্র, পতাকাসহ একুশের বিভিন্ন চিত্রের প্রকাশ ঘটেছে একুশের পোশাকে। একুশের চেতনার সঙ্গে মিলিয়ে পোশাকের পসরাতে বিভিন্ন দোকান ও বুটিক তৈরি করছে নতুন নতুন ডিজাইনের পোশাক।

একুশ এখন আর দুটি রংয়ের মধ্যে আটকে নেই। রংয়ের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে শোক-এর কালো, সূর্যের লাল, বিষণ্ণতার ধূসর, সত্য ও পবিত্রতার প্রতীক সাদার সমতলকে। এ ছাড়া সবুজ, হলুদ, নীল, তামাটেসহ সব রংয়ে সেজেছে একুশের পোশাক। একুশে পোশাকের ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে গর্বিত বর্ণমালার সাজ। এই দিনে বর্ণমালার পোশাক ব্যাপারটাই যেন গর্বের ব্যাপার। একুশের পোশাকের মোটিফে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে থাকছে বর্ণ ও শব্দমালার বিন্যাস। পোশাকের অবয়ব অলংকরণে নানাভাবে বর্ণমালাকে মোটিফ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বর্ণ ও শব্দমালার বিন্যাসে আমাদের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং অন্যান্য গর্বের বিষয় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ফ্লোরাল মোটিফ, জ্যামিতিক নকশার সৃজনশীল অলংকরণে তৈরি হয়েছে সালোয়ার-কামিজ, কটি-কামিজ, কুর্তি, লং কুর্তি, সিঙ্গেল কামিজ, কটি-কুর্তি, শাড়ি, পাঞ্জাবি, শার্ট ইত্যাদি। এ ছাড়াও শিশুদের জন্য রয়েছে সালোয়ার-কামিজ, কুর্তি/টপস্‌, পাঞ্জাবি, শার্ট ইত্যাদি।

একুশের পোশাকের নকশায় বর্ণমালা, ভাষা ও ভাষাশহীদদের পাশাপাশি দেশজ চেতনা ও ঐতিহ্যের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। তাই তো নকশিকাঁথা ফোঁড়, ব্লক, স্প্রে-ব্লক, অ্যাপলিক, স্ট্ক্রিন, হ্যান্ডপেইন্ট ও এম্ব্রয়ডারির কাজ চোখে পড়ার মতো। কাপড়ের ক্ষেত্রে সুতির প্রাধান্য থাকলেও তাঁত, মসলিন, সিল্ক্ক প্রভৃতির ব্যবহার কম নয়। প্রতিটি পোশাকে একুশের স্মারক হিসেবে রয়েছে বর্ণমালার প্রতি ভালোবাসা।

একুশের পোশাক নিয়ে ষাটের দশকে সর্বপ্রথম কাজ করে রূপায়ণ। একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে আমাদের গর্ব। তেমনি শহীদ দিবস হিসেবে আত্মত্যাগ ও শোকের। একুশের চেতনায় শোকের কালো রং তাই বাঙালির চাদরে। এই চিন্তাধারা থেকে একুশের পোশাকে প্রাধান্য পায় কালো চাদর। একরঙা কাপড়ে থাকতে পারে ভিন্নতা। তাই নিজের আয়েশের খাতিরে বেছে নিতে হবে কাপড় দেখে। সে ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে পাতলা সুতি চাদর। তবে অনেকেই একটু অমসৃণ হলেও বেছে নেন খাদির মতো কাপড়। এটি সম্পূর্ণ রুচির ওপর নির্ভর করে। একরঙার বাইরেও হতে পারে কালো চাদর। সেগুলোর আসল রং কালো হলেও থাকতে পারে ভিন্ন রংয়ের স্ট্ক্রিন প্রিন্ট অথবা নকশা। লাল অথবা কালোর বিপরীত সাদা যে নকশারই হোক, তা হওয়া চাই একুশের চেতনায়। এটি কিনতে পারবেন আজিজ সুপার মার্কেট, দেশীদশ ও স্বদেশীর বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসে। মান, নকশা ও প্রিন্টভেদে দাম পড়বে ৩০০ থেকে ২০০০ টাকার মধ্যে।

শহীদের শোক এবং মাতৃভাষা দিবসের গর্ব; দুটিরই দেখা মেলে টি-শার্টে। একুশের চেতনার প্রতীক হলো ছেলেমেয়ে উভয়ের। নতুন প্রজন্ম একুশকে শুধু চেতনাতেই ধরে রাখেনি; ছড়িয়ে দিয়েছে জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। বর্ণমালা ব্যবহারকে নতুনত্ব দিতে প্রতিটি শোপিস ও গিফট হ্যাম্পারে আনা হয়েছে বর্ণমালার সাজ। একুশের পোশাকের পাশাপাশি মগ বা ক্ষুদ্র অনুষঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে বাঙালির ভালোবাসার ভাষা। ছোট্ট ছোট্ট চাবির রিংয়েও প্রিয় বর্ণমালা ধারণ করে তৈরি করা হয়েছে অসাধারণ সম্ভার। বইমেলার বইয়ের ভালোবাসা তো বাঙালির জন্য পরম উপহার। একুশের এসব ছোট্ট উপহারের পসরা সাজিয়েছে আড়ং, অঞ্জন'স, আর্চিস গ্যালারির মতো দোকান।

স্বদেশপ্রেম জাগুক প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে তরুণ, বয়স্ক নির্বিশেষে সবাই মিলে মাতৃভাষা দিবস উদযাপন করবেন। তাই তো বিশেষ এই দিনটি ঘিরে বাঙালির পোশাকে থাকছে বর্ণমালার প্রতি ভালোবাসার ছোঁয়া।