শৈলী

শৈলী


শিশুর জন্য সময়

প্রকাশ: ১৮ মার্চ ২০২০      

হাসান শাওন

তিন বছরের মেয়ে তিতির। বাবা-মা দু'জনই কর্মজীবী। বাবা অফিসের জন্য বাসা থেকে বের হন সকাল ৭টায়। আর মায়ের অফিসের গাড়ি ওদের বাসার সামনে হর্ন বাজায় ৮টায়। তিতিরের সারাদিন কাটে বাসার গৃহপরিচারিকা রোজিনার সঙ্গে। এ তো গেল সকাল। সন্ধ্যার পর তিতিরের মা-বাবা একে একে বাসায় ফেরেন। এরপর যেহেতু দু'জনকেই সকালে উঠতে হয়, তাই রাত ১১টায় বিছানায় যাওয়ার সময় এ বাসায়। এদিকে সারাদিন একা থাকা তিতিরের ঘুম পায় আরও আগে। তাই বাবা-মাকে খুব কম সময়ই কাছে পাওয়া হয় এই শিশুর।

এমন তিতিরের গল্প এ সময় নতুন কিছু নয়। শহুরে সংস্কৃতি, যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারের রূপান্তর এখন এক বাস্তবতা। এই বাস্তবতায় একা বড় হচ্ছে পরিবারের ছোট্ট সদস্যটি। আবার অন্য বাস্তবতাও আছে। যেখানে বাবা-মা হয়তো বাড়িতেই থাকছেন, কিন্তু ভীষণ ব্যস্ত তারা মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ আর টেলিভিশন নিয়ে। এ ক্ষেত্রে শিশুর একমাত্র সম্বল হয়ে ওঠে মোবাইল ফোন কিংবা কম্পিউটারে ভিডিও গেমস।

কিন্তু এসব কিছু একটি শিশুর মনোজগৎকে কীভাবে প্রভাবিত করে তা গবেষণা সাপেক্ষ। শিশু বিশেষজ্ঞ শায়লা খাতুন মনে করেন, একটি শিশুর সুষ্ঠু বিকাশের জন্য দরকার আনন্দময় শৈশব। যেখানে বিশেষ ভূমিকায় থাকবেন মা-বাবাসহ পরিবারের অন্য স্বজনরা। আর শিশুর চাওয়ার দিকে যদি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে চাই অনেক কিছু। তিতিরের মতো শিশুর চাই বিশাল মাঠ, তাজা বাতাসে ভরপুর সবুজাভ প্রান্তর। সমাজের নতুন সদস্য সব সামাজিক দীক্ষা পাবে সমাজ থেকেই। এমন শৈশবই কাম্য সবার। শিশুদের মোবাইল ফোনে আসক্তি নিয়ে অনেক গবেষণা চলছে বিশ্বজুড়ে। গবেষকরা জানাচ্ছেন, এ ধরনের শিশুরা হয়ে উঠতে পারে খিটখিটে মেজাজের। অনেক সময় তাদের খাদ্যে অরুচি জন্মায়। যাতে ব্যাহত হয় শিশুর সঠিক বিকাশ। শিশুর স্কুলে যাওয়ার আগের সময়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ এ কারণেই। স্কুলে একটি কাঠামোগত শিক্ষা পায় শিশু। কিন্তু জীবনের মৌলিক বিষয়ের শিক্ষা আসে পরিবার থেকেই। তাই শিশুর জন্য চাই পর্যাপ্ত সময়। এটি বাবা-মাকেই নিশ্চিত করতে হবে। এই সময়ে প্যারেন্টিং একটি কথা খুব ব্যবহূত হচ্ছে। তা হলো, কোয়ালিটি টাইম। শিশুকে পুরো সময়ের জন্য সময় না দিয়ে একটি বিশেষ সময়ে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া। এটি ঠিকমতো করা গেলে তা শিশুর জন্য খুব উপকার হবে। তবে একটি বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন- তাহলো, মানব শিশু খুবই মনোযোগী ও কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন প্রাণী। তাকে ছোট ভাবার সুযোগ নেই। মানুষে মানুষে সম্পর্কের শিক্ষা শিশু খুব ছোটবেলা থেকেই পেয়ে থাকে। তাই কোয়ালিটি টাইমের মতো নিয়মিতই শিশুকে সময় দিতে হবে। শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করে তাকে নিয়ে বাইরে যেতে হবে। তার খেলাধুলায় অংশগ্রহণ জরুরি। তাকে পরিচিত করানো উচিত পরিবারের সব স্বজনের সঙ্গে। শিশু যেন বুঝতে পারে পরিবারের সেই কেন্দ্র। তার আনন্দেই পরিবারের আনন্দ। তার দুঃখ পরিবারের দুঃখ। সব মিলিয়ে শিশুর জন্য নির্ভরযোগ্য একটি পরিবেশ তৈরি করা আমাদের সবারই দায়িত্ব। শিশুর টয়লেট, খাওয়া, খেলা এসবে যে শিশুরও অংশগ্রহণ জরুরি সেটি শিশুকে বোঝাতে হবে মা-বাবাকে। শিশুর অন্য আসক্তি কমিয়ে তাকে একটি স্বনির্ভর সত্তা হিসেবে তৈরি করার দায়িত্ব পরিবারের। তাহলেই পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের জন্য বিষয়টি ভালো হবে।



ছবি :শৈলী আর্কাইভ