শৈলী

শৈলী


গ্ল্যাডিয়েটরের আর্তনাদ কলোসিয়ামের দেয়ালে

প্রকাশ: ১৮ মার্চ ২০২০      

ইমদাদ হক

ইতালিতে আমাদের দ্বিতীয় দিন। গাইড হিসেবে এবার সঙ্গী দূতাবাসে কর্মরত ইতালির নাগরিক আদ্রো ফিন্নি। ভদ্র মহিলা কাজ করছেন ১২ বছরের বেশি সময় ধরে। দারুণ ইংরেজি বলতে পারেন। সকালে নাশতার পর রোমের পার্কো দেই প্রিন্সিপি গ্র্যান্ড হোটেল অ্যান্ডস্ত্রা থেকে বের হই। অলিগলি সব পার হয়ে আমাদের গাড়ি এসে থামল কলোসিয়ামের সামনে। সেই কলোসিয়াম। রোমান সাম্রাজ্যের স্মৃতি ধারণ করে কালের সাক্ষী এই অনন্য স্থাপনা আজও মুগ্ধতা ছড়ায় পর্যটকদের মনে। সম্রাট নিরোর গোল্ডেন হাউসের পাশেই স্থাপন করা হয় কলোসিয়াম। এক সময় এটিই ছিল সব উৎসব আয়োজনের কেন্দ্র। আজও পর্যটকরা এখানে খুঁজে ফেরেন সেই সব বীর গ্ল্যাডিয়েটরদের।

মনে পড়ে অস্কার জেতা ছবি গ্ল্যাডিয়েটরের কথা। 'তরবারিওয়ালা মানব'খ্যাত গ্ল্যাডিয়েটররা সেরা তলোয়ার হাতে নিয়ে সজোরে আঘাত করতেন প্রতিপক্ষকে। 'গ্ল্যাডিয়াস' বা 'সোর্ড' অর্থাৎ তরবারির আঘাতে যখন বের হতো পরাজিতের তাজা রক্ত, তখন সম্রাটসহ দর্শকরা পৈশাচিক এক আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে যেতেন। মাঝে মাঝে দাগি আসামিদের দাঁড় করানো হতো প্রশিক্ষিত গ্ল্যাডিয়েটরের বিপরীতে। হাতি, গন্ডার, সিংহ, নেকড়ে, ভালুক, বাঘের মতো হিংস্র বন্যপ্রাণীর বিরুদ্ধেও লড়াই করতে হতো গ্ল্যাডিয়টরদের। গ্ল্যাডিয়েটররা ছিল মূলত দাস ও যুদ্ধবন্দি। তাদের বিশেষ ব্যবস্থায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। গুগল বলছে, এসব লড়াই যতটা ভয়ংকর শোনাচ্ছে, বাস্তবে ততটা ছিল না। কেননা, এক প্রদর্শনীতে ১৮ জনের মধ্যে ১৫ জনই বেঁচে থাকতে সক্ষম হতো। তবে প্রতিপক্ষকে কেবল নিরস্ত্র বা পরাজিতেই ভাগ্য শেষ নয়। লড়াইয়ের পর গ্ল্যাডিয়েটর ঘুরে দাঁড়াত সম্রাটের দিকে। সম্রাটের হাতের ইশারায় নির্ধারিত হতো তার বাঁচা-মরা। ইউটিউবে দেখে নিলাম কলোসিয়ামের কয়েকটি ভিডিও। হাতড়ে বেড়ানো জ্ঞানের সঙ্গে সরাসরি দেখার অভিজ্ঞতার সমন্বয় করা আর কি।

আমাদের হাতে ছিল চিপসের প্যাকেট। চিপস খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কদম ফেলি সামনের দিকে। কলোসিয়ামের সেন্ট্রাল অ্যারেনা বা মঞ্চের আকার ডিমের মতো। যা লম্বায় ৮৭ মিটার ও প্রস্থে ৫৫ মিটার। প্রায় ৫ মিটার উচ্চতার একটি দেয়াল দিয়ে ঘেরা পুরো প্রাঙ্গণ। এর ওপর থেকেই আসনবিন্যাস শুরু। নিচে সুড়ঙ্গাকারে অগভীর প্যাসেজওয়ে তৈরি করা হয়েছে পশু আনা-নেওয়া ও গ্ল্যাডিয়েটরদের যাতায়াতের জন্য। রোমান আমলে নির্মিত এই অ্যাম্ম্ফিথিয়েটার দেখার জন্য প্রতি বছর কমপক্ষে ৭ মিলিয়ন দর্শক রোম ভ্রমণ করেন। অ্যাম্ম্ফিথিয়েটার হচ্ছে একধরনের খোলা মঞ্চ, যেখানে মল্লযুদ্ধ, নাটক ইত্যাদি আয়োজন করা হয়, অনেকটা আজকের দিনের ওপেন স্টেডিয়ামের মতো। এখানে ৫০ থেকে ৮০ হাজার দর্শকের বসার ব্যবস্থা ছিল। প্রাচীনকালের আশ্চর্যের তালিকায় স্থান করে নেওয়া কলোসিয়াম রোমানদের সবচেয়ে বড় স্থাপনা। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অ্যাম্ম্ফিথিয়েটার হিসেবে এটি এখনও গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ধরে রেখেছে। রোমান সম্রাট ভেসপাজিয়ান ৭০-৭২ খ্রিষ্টাব্দে জনসভা এবং নাট্যোৎসবের কথা মাথায় রেখেই এর নির্মাণ কাজ শুরু করেন। যার পূর্ণতা পায় তার ছেলে টাইটাসের আমলে। রোমানদের বিশ্বাস ছিল গোটা বিশ্বে যাই ঘটুক না কেন, রোম শহরটি অনন্তকাল টিকে থাকবে। তবে ৪৪৩ ও ১৩৪৯ খ্রিষ্টাব্দে দুটি ভূমিকম্পে কলোসিয়ামের দুই-তৃতীয়াংশ ধ্বংস হয়ে যায়। তখন এখানকার ইট-পাথর রোমের কিছু চার্চ ও হাসপাতাল তৈরির কাজে ব্যবহার হয়। ইউনেস্কো ১৯৯০ সালে এটিকে বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার স্বীকৃতি দেয়। আর মানুষের তৈরি আধুনিক আশ্চর্যের তালিকায় যোগ হয় ২০০৭ সালে।

দিনের বড় সময় চলে যায় কলোসিয়ামে। ঘণ্টা তিনেক পর বের হই। বড় শহর তবে ঘোর প্যাঁচ বেশি মনে হলো। তবে শহরজুড়েই নানা স্থাপনা।

রোম কেবল ইতালির রাজধানীই নয়; ইতিহাস, ঐতিহ্য, স্থাপত্য, শিল্পকলা, সভ্যতার নানা চিহ্নে ভরপুর একটি নগরী। দারুণ সব খাবার আর ঐতিহাসিক স্থাপত্যের কারণে ইতালির রাজধানী রোম গোটা বিশ্বের পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় এক স্থান। এক হাজার ২৮৫ বর্গকিলোমিটারের এই নগরীতে রয়েছে শতাধিক ঐতিহাসিক স্থাপনা; যার সবই আকর্ষণীয়। মার্কেটিং রিসার্চ সংস্থা ইউরোমনিটরের গত বছরের তথ্য বলছে, পর্যটকদের সেরা ১০০টি শহরের মধ্যে রোমের অবস্থান ১২তম। কেবল ২০১৯ সালেই ইতালির এই শহরে ভ্রমণপিপাসুদের আনাগোনা ছিল এক কোটি চার লাখ। পুরো ইতালিতে সংখ্যাটা ছাড়িয়েছে পাঁচ কোটির ঘর। লম্বা এই তালিকায় নতুন করে যোগ হলাম আমরা ক'জন। ইতালিতে যাওয়ার আগে ইচ্ছা ছিল শহরটির ইতিবৃত্ত জানার। মজা করে কেউ কেউ বলেছিলেন নিরো, টাইটাস বা ডমিশিয়ানদের স্মৃতির আয়না দেখতে হলে রোম ঘুরে দেখতে হবে হেঁটে; এর বিকল্প হিসেবে বড়জোর ব্যবহার করা যেতে পারে ভেসপা স্কুটার। মোটামুটি মাস খানেক সময় যদি হাতে থাকে, তাহলে রোম আসবে নখদর্পণে।

রাস্তায় পার্ক করা সারি সারি গাড়ি। ঢাকার কয়েকটা রাস্তার কথা মনে পড়ে, যেখানে সিটি করপোরেশনকে নির্ধারিত ফি দিয়ে গাড়ি পার্ক করা যায়। রোমেও তাই। রাস্তায় গাড়ি চলছেও। সংখ্যায় একটু কম। অলিগলি পেরিয়ে মোড়ের রাস্তায় দু-এক মিনিটের যানজটও দেখলাম। গত বছর পর্যন্ত পুরো রোমে গাড়ির সংখ্যা ১৮ লাখ। আয়তনের তুলনায় নগণ্য। তাতেই উদ্বিগ্ন নগরের মেয়র ভার্জিনিয়া র‌্যাগি। গাড়ি বেড়ে যাচ্ছে, দূষণ ছড়াচ্ছে, কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে, রাস্তায় যানজট বাড়াচ্ছে ... আরও কত কী! রাস্তায় গাড়ি কমানোর জন্য বাড়তি শুল্ক্ক, ডিজেল ছাড়া গাড়ির ব্যবহার, নিয়মকানুনে কড়াকড়িসহ নিত্যনতুন ফন্দিফিকির। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপসহ উন্নত যে দেশেই যাই না কেন, সড়কে গাড়ির সংখ্যা দেখে মন ভরে না! ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি কতশত গাড়ি আমাদের ঢাকায়। রোমের জনসংখ্যা ২৮ লাখের মতো। এর মধ্যে আবার লাখ তিনেক রয়েছে বাংলাদেশিই। শহরে যাতায়াতে বেশিরভাগ লোকই নিজের গাড়ি ব্যবহার করে, এই সংখ্যা ৬৫%। হেঁটে চলাচল করে ৬%। পাবলিক ট্রান্সপোর্টে চড়ে ২৯% আর ১% লোক সাইক্লিং করে। বিভিন্ন স্থাপনা, শপিংমল বা ব্যস্ত জনপদে সাইকেলের জন্য করা হয়েছে আলাদা আলাদা পার্কিং।

রোমান ফোরাম, প্যানথিয়নের মতো প্রাচীন আইকনগুলো এ শহরের স্বর্ণযুগকে মনে করিয়ে দেয়। আর ক্যাপিটোলাইন হিলের কাছে বেশ কয়েকটি মিউজিয়ামও রয়েছে। যেখানে একাধিক যুগের ছাপ চোখে পড়ে। মিকেলেঞ্জেলো ও ক্ল্যাসিক রোমান যুগের নিদর্শন হিসেবে মার্কাস অরেলিয়াসের মূর্তি। এই দুই বিশাল ভাস্কর্য আসলে প্রাচীন গ্রিক যুগের নকল। রয়েছে মধ্যযুগের ব্যাসিলিকা সান্তা মারিয়া। বিভিন্ন যুগের এসব নিদর্শন পরস্পরের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যায়, যা এই শহরের বৈশিষ্ট্য। কয়েক পা এগোলেই ফোরাম রোমানাম। ক্ল্যাসিক রোমান যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খননের কাজ এখানেই হয়েছে। জুলিয়াস সিজার ও সম্রাট অগাস্টাসের আমলে মানুষ রোমে কীভাবে বসবাস করত, এখানে তার একটা ধারণা পাওয়া যায়।

আমাদের কোনো পার্কে যাওয়ার সময় হয়ে ওঠেনি। তবে রাস্তার পাশে থেকে কয়েকটা চোখে পড়ে। গাড়ি থেকে চোখে পড়ে প্যান্থিয়নের কয়েকটা সমতল গম্বুজ। তার পেছনে বাঁয়ে দুই টাওয়ারবিশিষ্ট গির্জা রয়েছে স্প্যানিশ স্পেসের সামনে। যার নাম ট্রিনিটা ডেই মন্টি। আরেকটু দূরে ভিলা মেদিচি। রোমে রয়েছে আকর্ষণীয় ট্রেভি ফোয়ারা। ফেডেরিকো ফেলিনি পরিচালিত 'লা দলচে ভিতা' ছবিতে আনিটা একবার্গের পাশে ছিলেন মার্সেলো মাস্ত্রোইয়ানি? এই ফোয়ারায় সেই ছবির শুটিং হয়েছিল। রোমে এলে ফোয়ারার সামনে ছবি তোলার লোভ সামলাতে পারেন খুব কম সংখ্যক মানুষ। আর ভ্যাটিকান সিটি অনেকেরই আকর্ষণের জায়গা। তাই ঘুরে আসুন।

ইতালিতে যাবেন কীভাবে :বৈধ পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকলে ইতালির ভিসা পাওয়া সহজ।

থাকা-খাওয়া :ইতালিতে প্রতি বছর লাখো দর্শনার্থীর ভিড় লেগেই থাকে। সাংস্কৃতিক প্রাচুর্যের দেশ ইতালিতে পর্যটকদের জন্য বিলাসবহুল হোটেল ও ভালো মানের খাবারের রেস্টুরেন্টের কোনো ঘাটতি নেই। ইতালির বড় ও পর্যটন শহরগুলো বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের শহরগুলোতে পর্যটকদের জন্য খরচ একটু বেশি। নজরকাড়া এসব বিলাসবহুল হোটেলে রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্যুট, বার, রেস্তোরাঁ, জিমনেশিয়াম, গেস্টরুম ইত্যাদি।