শৈলী

শৈলী


ছোট পাখি টুনটুনি

প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২০      

মোহাম্মদ মহসীন

গাঁও গ্রামের অতি পরিচিত ছোট পাখি টুনটুনি। এই পাখি নাচতেও পটু। গাঁও গ্রামের ঝোপঝাড়ে, বনজঙ্গলে ও বনবাদাড়ে দেখা যায়। ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে পরিবেশ রক্ষায় এই পাখির কোনো জুড়ি নেই। এই পাখি সবচেয়ে বেশি বিচরণ করে ফাল্কগ্দুন ও বৈশাখ মাসে। টুনটুনি অনেক ক্ষতিকারক পোকা-মাকড়, কীটপতঙ্গ খাদ্য হিসেবে খায়। তা ছাড়াও ফুলের মধু, রেশম মথ, ধান-পাট-গম পাতার পোকা, শুয়োপোকা ও তার ডিম, আমপাতার বিছা পোকা তাদের খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।

টুনটুনি পাখি উচ্চৈঃস্বরে ডাকে। এ দেশে এক এলাকায় একেক নামে পাখিটিকে চিনে। যেমন- কালাগলা টুনটুনি, টুনটুনি, টুনি, দর্জি টুনটুনি, বেগুন টুনটুনি, মৌটুসি, নীল টুনটুনি, পাতি টুনটুনিসহ অনেক নামেও ডাকে ও চিনে। এই দর্জি পাখি টুনটুনি বিলুপ্ত না হলেও তিনটি প্রজাতির টুনটুনি চোখে পড়ে। বিশ্বে মোট ১৫ প্রজাতির টুনটুনি দেখতে পাওয়া যায়।

টুনটুনি বৈজ্ঞানিক নাম : অর্থোতমোস অত্রগুলারিস (ঙৎঃযড়ঃড়সঁং ধঃৎড়মঁষধৎরং), টুনটুনির ইংরেজি নাম : ডার্ক নেকড টেইলরবার্ড (উধৎশ-হবপশবফ ঞধরষড়ৎনরৎফ),

প্রতি বছর কাঁঠাল, শীতাফল, ডুমুর, শিম, লাউ, কাঠ বাদাম, সূর্যমুখী, লেবু গাছে এরা বেশি বাসা বাঁধে। পুরুষ ও স্ত্রী পাখি মিলে বাসা তৈরি করে। তবে টুনটুনির বাসা ৬-১০ সেমি উচ্চতায় বাসা তৈরি করে থাকে। নিপুণ কারিগর টুনটুনি। আর নির্মাণশৈলী এতই মনোরম, অন্যান্য পাখির চেয়ে একেবারেই আলাদা ও অন্যতম।

এই ছোট পাখিটিকে যতটুকু বোকা মনে করি, আসলে তত বোকা নয়। টুনটুনি একেবারেই চালাক প্রকৃতির পাখি। আবার কখনও কখনও বোকার পরিচয়ও মিলে। এরা বাড়ির আশপাশে ঝোপঝাড়ে মানুষের ছত্রছায়ায় থাকতে বেশ পছন্দ করে। অস্থির ও চঞ্চল প্রকৃতির পাখি। এই পাখি নানান জায়গায় ছুটে চলে। ছোট পাখি হলেও গাছে গাছে উড়ে বেড়ায়। ডাল-ডালে উড়ে বেড়ানোর সময় পিঠের ওপরে লেজ নাড়িয়ে সুরেলা আওয়াজে মুখরিতও করে।

এই দর্জি পাখিটি ঠোঁটে গাছের পাতা সেলাইয়ের মাধ্যমে সুন্দর বাসা তৈরি করে থাকে। স্ত্রী ও পুরুষ পাখি এক থেকে তিনটি পাতার মাধ্যমে মনের মাধুরী মিশিয়ে নির্মাণশৈলীতে বাসা তৈরি করে। আর স্ত্রী এবং পুরুষ পাখি বাসা তৈরি করতে সময় লাগে প্রায় এক সপ্তাহ। এরা নরম জাতীয় শিমুল তুলা, কাশফুল, ঘাসফুল, পাটের পরিত্যক্ত আশ, নরম সুতা, লতা, চুল ও পালক মিশিয়ে বাসা তৈরি করতে দারুণ পটু। তা দেখে যে কেউ মুগ্ধও হন।

এটি ছোট আকারের পাখি। টুনটুনির বুক ও পেট সাদাটে। অনেকটা মাটির ঢিলার মতো। ডানার উপরিভাগ জলপাই-লালচে। মাথা জলপাই-লালচে। চোখের মনি মরিচের মতো লাল। বুক সাদা পালকে ঢাকা। লেজ খাড়া, তাতে কালচে দাগ আছে। প্রজন্মের সময় পিঠ ও ডানার রং কিছুটা বদলায়। এই দৃষ্টিনন্দন পাখির প্রজনন মৌসুম ফাল্কগ্দুনের শেষের দিকে বাসা তৈরির কাজ সমাপ্তি ঘটলে চার থেকে পাঁচটি ডিম পাড়ে। স্ত্রী ও পুরুষ উভয় পাখি ১০ থেকে ১২ দিন ডিমে তা দেয়। ছানা ফুটলে একটু বড় হলেই অন্যত্র নিয়ে চলে যায়। এমন দৃশ্য অনেক অবলোকন করেছি। আর প্রতি বছর প্রজনন মৌসুমে স্ত্রী পাখি দুই থেকে তিনবার ডিম পাড়ে। বাচ্চাও ফোটায়। অনেক সময় ঝড়ের দিনে গাছের পাতা খসে পড়ে ডিম ও ছানা উভয়ই নষ্ট হয়ে যায়।

গাঁও গ্রামের কোমলমতি শিশুরা খেলাধুলার জন্য লতাপাতা কুড়ানোর সময় টুনটুনির বাসা নজরে পড়লেই ডাল ভেঙে পাখির বাসা ও ডিম কখনও ছানা ধ্বংসও করে থাকে। গেল বছর এমন দৃশ্যও প্রত্যক্ষ করেছি।