শৈলী

শৈলী


বঙ্গীয় গ্রন্থ জাদুঘর

প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২০      

ফারুখ আহমেদ

গ্রামের নাম কনকসার। মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার একটি গ্রাম। মুন্সীগঞ্জ জেলার গ্রামগুলোর নাম খুব সুন্দর। এখানে সুবচনী নামের একটি গ্রাম আছে। সোনারং, বজ্রযোগিনী, নাটেশ্বরবট, রঘুরামপুরসহ কত কত চমৎকার নাম ও সৌন্দর্যের সব গ্রাম। আজ তেমন একটি গ্রামের গল্প করব, কনকসার নাম তার। আপনারা কি জানেন কনকসারে একটি গ্রন্থ জাদুঘর রয়েছে? ভাবা যায়, বই নিয়ে জাদুঘর! জীবনের জন্য বই। বই আলোকিত উপকরণ। সেই বই নিয়ে কনকসার গ্রামে গড়ে উঠেছে একটি জাদুঘর। আপনাদের আজ সেই জাদুঘরে নিয়ে যাব। গল্প শোনাব জাদুঘরটির আদ্যোপান্ত।

বঙ্গীয় গ্রন্থ জাদুঘর। দেশের প্রথম ও একমাত্র গ্রন্থ জাদুঘর। জাদুঘরটি স্থাপিত হয় ২০১৬ সালের ৪ মার্চ শুক্রবার। উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। গ্রন্থাগার জাদুঘরটির উদ্বোধন যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। চার বছরের সেই স্মৃতি মানসপটে উজ্জ্বল থাকলেও, সে সময় আর এ সময়ের ফারাক বিস্তর। গত চার বছর গ্রন্থ জাদুঘর নিয়ে কোনো গল্প শুনিনি। মাওয়া বা পদ্মা রিসোর্টের কত গল্প শুনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও পত্রিকায়। কিন্তু কারও লেখার কোথাও গ্রন্থ জাদুঘর উঠে আসেনি। এমন ঐতিহাসিক জায়গাটি কেমন আছে তার খোঁজ নিতে ১৭ মার্চ সকালে বাইক নিয়ে বের হলাম আমি আর জান্নাত। আজিমপুর থেকে রওনা হয়েছিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে হানিফ ফ্লাইওভারে চলে আসি। ফ্লাইওভার থেকে নেমে পোস্তগোলা ব্রিজ পার হতেই নতুন উদ্বোধন হওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে বাইকের গতি বাড়ে। শুনেছি, এটা দেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে, যেখানে কোনো প্রকার প্রতিবন্ধকতা ছাড়া দ্রুতগতিতে গাড়ি চলাচল করতে পারবে। কিন্তু আমরা কিছু সমস্যা দেখলাম। এক্সপ্রেসওয়েতে ধীরগতির ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও উল্টো পথে সে সব অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনের অবাধ চলাচল। এই যে নিরাপত্তাহীনতা ও অনিয়ম তা দেখে মনে খচখচানি শুরু হলো। সেই খচখচানি নিয়ে হাসারা বাজারে যাত্রাবিরতি নিই। হাসারার রঞ্জিত মোদকের দধি ও মিষ্টি খুব নামকরা। যাত্রাবিরতির উদ্দেশ্যই মিষ্টি ও দই খাওয়া!

এক ঘণ্টা আমরা হাসারায় ছিলাম। আবার ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে যখন নামি তখন দুপুর ১টা। হাসারা থেকে রওনা দিয়ে ঠিক দশ মিনিট পর চলে আসি মাওয়া। চলতি পথে অনেক মোটরসাইকেল দেখেছি। মাওয়া এসে দেখলাম মোটরসাইকেলের হাট। দলবেঁধে সব এক্সপ্রেসওয়ে দেখতে এসেছে। আমরা পদ্মা সেতুর কাছে এক চক্কর মেরে লৌহজংয়ের দিকে ছুটলাম। এখন গ্রামগুলো সব শহর হয়ে গেছে। মেঠোপথ, জঙ্গল আর দু'পাশের জলাধার নেই বলা চলে। তবে লৌহজং যেতে পুরো পথে বিভিন্ন প্রকার গাছের সারি দেখেছি। এখানে একটা গাছ ও তার ফুল নজরকাড়া। বসন্তের দুপুরে বিস্ময়ের চার চোখ ঘুরে ফিরে দেখে সেসব গাছ। প্রথম আলোতে গাছের ফুল নিয়ে বহু আগে লিখেছিলাম। জান্নাতের সে ফুল দেখা প্রথম। তার জন্যই আবার বিরতি। বরুণ ফুল। বন্না বলে কেউ কেউ। বইন্না, বউন্নাসহ কত নাম তার! লৌহজংয়ের এই গ্রামটির নাম হলুদিয়া। মুন্সীগঞ্জের গ্রামের চমৎকার সব নামের কথা বলেছিলাম। হলুদিয়া তার প্রমাণ। গ্রামের পথে নামতেই বিশাল এক বরুণ গাছের পাশেই ছোট্ট একটা ডালিম গাছ। সে ডালিম গাছে বসে আছে এক ফিঙ্গে। ছবি তুলতে গেলে সে দিল দৌড়। ছবি তোলা হলো, তবে ফিঙ্গের নয়। ডালিম ফুল, জান্নাত ও বরুণ ফুলের। পাশেই একটা চাড়িতে দুটো গরু পালা করে খাবার খাচ্ছে। একটি যখন মুখ ডোবাচ্ছে, অন্যটি তখন সতর্ক দৃষ্টিতে চারপাশ দেখছে আর অপেক্ষা করছে কখন সে মুখ ডোবার সময় পাবে! তাদেরও ছবি তুলে নিলাম। এবার হলুদিয়া গ্রাম পিছু ফেলার পালা। প্রবল শুকনো ধুলো উড়িয়ে বাইক নিয়ে ছুটলাম, পরপর দুটো ব্রিজ পার হলাম। আরও কিছুটা এগিয়ে বাম দিকে থমকে দাঁড়ালাম। তারপর বাইক স্ট্যান্ড করা। এখন আমরা কাঙ্ক্ষিত বঙ্গীয় গ্রন্থ জাদুঘরের সামনে!

জাতীয় গ্রন্থ জাদুঘরের ইতিবৃত্ত :৩৫ হাজার বই নিয়ে বঙ্গীয় গ্রন্থ জাদুঘর যাত্রা করেছিল ২০১৬ সালের মার্চ মাসে। দেশের প্রথম গ্রন্থ জাদুঘর। জাদুঘরটি সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত হয়েছে। ইংরেজি এল ( খ) প্যাটার্নের ১৮০০ বর্গফুটের একটি টিনশেড ভবন। উনিশ শতকে স্থাপিত কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের আদলে গড়ে তোলা হয়েছে আমার দেশের এই জাতীয় প্রতিষ্ঠান বঙ্গীয় গ্রন্থ জাদুঘর ভবনটি। এ জাদুঘরে ঐতিহ্যবাহী ভূর্জপত্রে লেখা কোনো বই না থাকলেও তালপাতায় লেখা বইয়ের স্মৃতিচিহ্ন দেখতে পাবেন। তেমনি দেখতে পাবেন হাতে লেখা ও কাঠ খোদা করা বই। গ্রন্থাগারটির সংগ্রহে রয়েছে মহাত্মা কালী প্রসন্ন সিং সম্পাদিত মহাভারত গ্রন্থ। ১৩৩২ সালে প্রকাশিত ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত পাঁচু ঠাকুর। কুষ্টিয়ার কুমারখালীর কাঙাল হরিনাথের এমএন প্রেস থেকে ১২৯৮ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত পীঠমালা, প্রবোধ কুমার স্যান্যালের জনম জনম, জসীম উদ্‌দীনের মুর্শিদি গান, দীনবন্ধু মিত্রের বিয়ে পাগলা বুড়ো, কাঠ খোদাই বই অন্নদা মঙ্গল, ১৯১৮ সালে দীনেশ চন্দ্র সেন প্রণীত ফুল্লরা, বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ম্যাগাজিন কবিতা, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের প্রাচীন পুঁথির বিবরণ, ১১৮৩ বঙ্গাব্দে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রণীত বর্ণপরিচয় প্রথম ভাগসহ শিল্প-সাহিত্য, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, প্রাচীন ইতিহাস, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ধরনের গবেষণামূলক বই। বাংলায় যারা লেখেন প্রায় সবারই রচনাবলি-রচনাসমগ্র রয়েছে গ্রন্থ জাদুঘরে। গ্রন্থ জাদুঘরে বাংলা সাহিত্যই বেশি, ইংরেজি সাহিত্য বেশি নেই। বাংলার সাংস্কৃতি ও বাংলার ভাণ্ডার বলা যায় গ্রন্থ জাদুঘরকে। যাদের চেষ্টা ও পরিকল্পনা সংগ্রহ নিয়ে আজকের বঙ্গীয় গ্রন্থ জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তারা হলেন- প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. নূহ-উল-আলম লেনিন। তার অবদানই গ্রন্থ জাদুঘরে খুব বেশি। তারপর রয়েছেন অধ্যাপক শাহাজাহান মিয়া, মনোয়ার রফিক-উল-আলম, যিনি বঙ্গীয় গ্রন্থ জাদুঘরের পরিচালক। তারপর যাদের নাম নিতে হয় তারা হলেন- মনোয়ার মাহবুব-উল-আলম এবং মনোয়ার হাসান-উল-আলম। তাদের ৫০ থেকে ৬০ বছরের ব্যক্তিগত সংগ্রহ রূপ নিয়েছে আজকের গ্রন্থ জাদুঘরে।

আমাদের দেখা গ্রন্থ জাদুঘর :আমরা বিকেল ৩টা নাগাদ গ্রন্থ জাদুঘরের মূল ফটকে পৌঁছাই। ফটকের গায়ে গ্রন্থ জাদুঘরের পাশাপাশি লেখা রয়েছে অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন কেন্দ্রীয় কার্যালয়। আমরা পায়ে পায়ে গ্রন্থ জাদুঘর অভিমুখে এগিয়ে যাই। জাদুঘরের কাছে গিয়ে দেখি সেই বিকেল ৩টায় ভবনটি তালাবদ্ধ। পাশের অফিস কক্ষে খবর নিই। সেখান থেকে এক ভাই আমাদের অপেক্ষা করতে বলেন। অপেক্ষার সে সময় আমরা ঘুরে দেখি কনকসার গ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী বিশাল এক দিঘি। এমন দিঘি মুন্সীগঞ্জ এলাকার ঐতিহ্য। অন্য যে কোনো এলাকায় হলে কনকসার গ্রামের এই দিঘিটির জন্য হলেও একবার বেড়াতে যেতেন। বিশাল সেই দিঘি নিয়ে লিখতে গেলে আলাদা গল্প বলতে হবে। যেমন কনকসার গ্রামের আরেক গল্পের উপকরণ অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় পানকৌড়ি। যার স্থাপত্যশৈলী একান্তই মুন্সীগঞ্জ এলাকার ঘরবাড়ির অনুকরণ বা আদলের। আমরা কনকসার দিঘি, পানকৌড়ি ভবন এবং আব্দুল জব্বার খান উন্মুক্ত মঞ্চ ঘুরে দেখে জাদুঘরের সামনে আসতেই দেখা হয় মুনিরা মনোয়ার দ্যুতির সঙ্গে। তিনি বর্তমানে জাদুঘরটির দায়িত্বে রয়েছেন। আমরা তার সঙ্গে গ্রন্থ জাদুঘরে প্রবেশ করি।

বিশাল সংগ্রহ কিন্তু সাইজে অনেক বড় নয় গ্রন্থ জাদুঘরটি। লম্বা টেবিল ও বুক শেলফে বই থরে থরে সাজানো। আমি আগেও দেখেছি, তবুও বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থেকেছি। জান্নাতের এমন দেখা প্রথম। সে বাকশক্তি হারাল এমন আশ্চর্যে। বই ছুঁয়ে দেখার অনুমতি নেই। কিন্তু সে বইয়ের শেলফগুলো সব ছুঁয়ে দেখছিল আর ছবি তুলছিল। এর ফাঁকেই মুনিরা মনোয়ার দ্যুতির সঙ্গে কথা হয় গ্রন্থ জাদুঘর নিয়ে। যেহেতু কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের আদলে নির্মিত, সেহেতু বাংলাদেশের এই জাদুঘরটিতে তাদের মতোই চারটি বিভাগ রয়েছে। সাধারণ বিভাগ পাঠাগার, আর্কাইভ, সংগ্রহশালা ও প্রকাশনা বিভাগ। বঙ্গীয় গ্রন্থ জাদুঘর গবেষণা পত্রিকাও বের করে, নাম পথরেখা। জাতীয় গ্রন্থ জাদুঘর সাধারণ পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত নয়। সাধারণ পাঠকদের জন্য পাশেই রয়েছে রহমান মাস্টার স্মৃতি পাঠাগার। বঙ্গীয় গ্রন্থ জাদুঘর তাদের জন্য যারা গবেষণামূলক, যারা ফেলোশিপ নেবেন, পিএইচডি করবেন। এখানে রয়েছে এক থেকে দেড়শ' বছরের পুরোনো বই ও ম্যাগাজিন। কেবল কবিগুরুর ওপর গবেষণাধর্মী বই রয়েছে ৭০০-এর ওপর। এখানে ব্যক্তিগত সংগ্রহের বইয়ের ভাণ্ডারই বেশি। অনেক আগের পরিকল্পনা, তারপর চার বছর আগে বাস্তবায়ন। ইদানীং অনেকে নিজস্ব সংগ্রহ বা দুষ্প্রাপ্য কোনো সংগ্রহ কারও থাকলে সেসব জাদুঘরে দিয়ে যাচ্ছেন। তেমনিভাবে কিছুদিন আগে কথাসাহিত্যিক জাহানারা নওশিন তার ব্যক্তিগত সংগ্রহের প্রায় সাড়ে সাতশ' বই বঙ্গীয় গ্রন্থ জাদুঘরে দান করেছেন!

শেষ কথা :মুন্সীগঞ্জ পদ্মাপারের একটি জনপদ। অনেকেই তাকে বিক্রমপুর বলতে ভালোবাসেন। যদিও বিক্রমপুর বলে কিছু নেই মানচিত্রে। ঐতিহ্য, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে বর্তমান মুন্সীগঞ্জ। এখানে গ্রন্থ জাদুঘর একটা বিশেষায়িত গবেষণা ও জ্ঞানচর্চা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা দেশবাসীকে গর্বে ভাসিয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম শুরু হওয়া গ্রন্থ জাদুঘরটি দেখতে হলে আপনাকে যেতে হবে মুন্সীগঞ্জ জেলায়। অনেকেই মাওয়া আসেন ইলিশ খেতে। মাওয়া থেকে মাত্র সাত কিলোমিটার দূরত্বে বঙ্গীয় গ্রন্থ জাদুঘর। মুনিরা মনোয়ার দ্যুতি আক্ষেপ নিয়ে বলছিলেন, অনেকে এখানে এসে চারতলা পানকৌড়ি ভবন ও দিঘির পারে বসে আড্ডা দেন, ছবি তোলেন। কিন্তু জাদুঘরে আসেন না। এরপর আপনি মাওয়া গেলে নিশ্চয়ই গ্রন্থ জাদুঘরে আসবেন। শুধু জাদুঘরের জন্য পরিকল্পনা নিয়েই আসবেন। কী, আসবেন তো?

ছবি :লেখক