শৈলী

শৈলী


লাল সবুজে আঁকা

প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২০      

ফ্লোরিডা এস রোজারিও

মুক্তির জন্য পর্যাপ্ত প্রসববেদনা সইতে হয়েছে বাংলাদেশকে। একাত্তরের ২৫ মার্চ মানুষ হত্যার হিংস্রতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। এরপর শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ। এক সময় তা রূপ নেয় জনযুদ্ধে। ৯ মাসে বাংলাদেশের গেরিলা যোদ্ধাদের হাতে ব্যাপক নাস্তানাবুদ হয় পাকিস্তানের প্রশিক্ষিত মিলিটারি। বাংলাদেশের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় ভারতীয় মিত্রবাহিনী। ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর। এই ক্ষণটুকুতেই এক বিজয়ী জাতিতে পরিণত হয় বাঙালি।

প্রায় ৫০ বছরে পা রাখছে বাংলাদেশ। তারুণ্য শেষে এখন যেন দেশটি প্রাজ্ঞের পর্যায়ে। তাই স্বাধীন দেশে দেশ গড়ার সংগ্রাম এখনও থামেনি। বাংলাদেশ এগোচ্ছে। দেশের প্রায় ৬০ ভাগ জনগোষ্ঠী এখন তরুণ। এই তারুণ্য নতুনভাবে পথ দেখাচ্ছে বাংলাদেশকে।

প্রাচীন কাল থেকেই কাপড় বুননে শ্রেষ্ঠত্ব ছিল বাংলা জনপদের। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তার পোশাক শিল্প খাতে। এখন স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে তরুণরা হাল ধরছে পোশাক শিল্পের। আশির দশকের বুটিক শিল্প বর্তমানে ডানা মেলেছে। এরা হয়ে উঠেছে একেকটি আস্থাশীল ব্র্যান্ডে। পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি। দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত এই পোশাক শিল্প।

শুধু বিদেশে রপ্তানি নয়, দেশের মানুষের চাহিদাও পূরণ করে চলেছে এই পোশাক শিল্প। যে কারণে দেশে পোশাকের দাম এখনও হাতের নাগালে। তরুণদের উদ্ভাবনে ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো দৃঢ় ভিত্তি পেয়েছে। দেশের তরুণ-তরুণীরা হয়ে উঠছেন ফ্যাশনেবল।

একটা সময় দেখা যেত শুধু ঈদেই নতুন পোশাকের চাহিদা থাকত। এখন তা বদলেছে। বৈশাখ, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি, পহেলা ফাল্কগ্দুন এমন নানা দিবসে ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো তাদের সম্ভার নিয়ে সামনে আসছে। ক্রেতারাও ঝুঁকছেন এই নতুন পোশাকের দিকে।

স্বাধীনতা দিবসের পোশাকে মূলত প্রাধান্য পেয়ে থাকে লাল সবুজ রং। এসময় সবাই জাতীয় পতাকার রঙে সেজে উঠতে চান। আর ফ্যাশন হাউজগুলোও লক্ষ্য রাখছে পোশাকের উপাদানের ওপর। কারণ বসন্ত চললেও বেশ গরম রয়েছে এ সময়টায়। ক্রেতারা বেছে নিচ্ছেন পাতলা সুতি পোশাক। শাড়ি, থ্রি-পিস, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, শার্ট, টি-শার্টসহ সব পোশাকের ক্ষেত্রেই এটি ঘটছে।

২৬ মার্চ লাল-সবুজের পতাকায় চিত্রিত হয়ে সবার পোশাকই হয়ে ওঠে এক একটি পতাকা। বাঙালি জীবনের এই অবিস্মরণীয় দিনটি পালন করতে ফ্যাশন ডিজাইনাররাও দেশমাতৃকাকে নিবেদিত কবিতার পঙ্‌ক্তি থেকে শুরু করে নানা বিষয় নিয়ে কাজ করে চলেছেন।

পোশাকে অনেক ফ্যাশন হাউস বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের অসামান্য বার্তাগুলো তুলে আনছেন। সেইসঙ্গে থাকছে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিকৃতিসহ নানা চিত্র। এসবই বাঙালির সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামের জরুরি মুহূর্তকে শনাক্ত করার চেষ্টা। মুক্তি আর ফ্যাশনের এ যেন এক ফিউশন। স্বাধীনতা দিবসের একেকটি পোশাক যেন মুক্তিকামী বাঙালির একেকটি পোস্টার। এটি এ জনগোষ্ঠীর চির স্বাধীনচেতা বৈশিষ্ট্যেরই প্রতিচ্ছবি।

মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস নির্মমতা দেখিয়েছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা। আমরা হারিয়েছি ৩০ লাখ স্বজন, স্বদেশবাসী। সেই নিষ্ঠুর সময়ও এপিটাফের মতো করে লিপিবদ্ধ হচ্ছে এলিজিরূপে ইদানীংকালের ফ্যাশন ডিজাইনে। শহীদরা চিরজাগ্রত। তাদের অব্যক্ত কথা সময়ের সঙ্গে মিলেমিশে যায়। এভাবে পোশাকেও মুক্তির চেতনা বিস্তৃত হয়।

মুক্তিযুদ্ধ শুধু হারানোর ব্যথা নয়। এর আছে অনেক অর্জন। স্বাধীন দেশে এই মুক্তিসংগ্রামকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে অনেক ভাস্কর্য। সেগুলোও পোশাকের মোটিফে আনছেন এ সময়ের পোশাক ডিজাইনাররা।

এভাবে পোশাকে ঘুরেফিরে আসছে স্বাধীনতা, যা বাঙালির নিজস্ব অর্জন। জাতিকে পরিশুদ্ধ করেছিল একাত্তরের সংগ্রাম। আমরা তখন একই সঙ্গে ছিলাম ব্যথাতুর ও দ্রোহী। কেউ ভেঙে পড়েনি। লড়াইয়ের ওপর সবার আস্থা ছিল। আক্রমণে বাঙালি পিছু হটেনি। সম্মুখ সমরের অভিজ্ঞতা ছাড়াই পুরো একটি জাতি হয়ে উঠেছিল যোদ্ধা। স্বাধীনতা দিবস এ সত্য মনে করায়।

পোশাকে স্বাধীনতা দিবস উপস্থাপন কোনো পোশাকি বিষয় নয়। এটিকে দেখা যেতে পারে সাবেক প্রজন্মের প্রতি উত্তর প্রজন্মের শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে। সবার ওপরে অনেক অমানিশা পেরিয়ে যে মুক্তি লাভ তাকেই মনে করা। তাকে ঘিরেই নৈবেদ্য সাজানো।

স্বাধীন দেশেও মানুষের সংগ্রাম শেষ হয়নি। এখন সময় দেশ গঠনের। এর জন্য চাই আদর্শ। সে আদর্শ অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আস্থা রেখে নির্মিত হবে। তাই মুক্তিযুদ্ধ অজর। এর শেষ নেই। এখনও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে উজ্জ্বল প্রদীপ্ত শিখা। বাঙালি দুঃসময় ভোলেনি। একই সঙ্গে ভোলেনি তার শহীদদের। কালরাত্রে আর স্বাধীনতা দিবসে বাঙালি ফেরে তার আপন নীড়ে। স্মরণে, শ্রদ্ধায় এই সময়টি পার করতে চায় সবাই।

স্বাধীনতার ৫০-এ পা রাখবে বাংলাদেশ। পূর্ণতা আর প্রাজ্ঞতার সময় এখন। সেইসঙ্গে একটি নতুন প্রজন্মের দায়িত্ব নেওয়ার সময়। চোখ থেকে আশ্রয়টুকু মুছে ফেলবার সময় এখন। সবাই মিলে স্বাধীনতার সুফল ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার ব্রত হতে পারে আজকের শপথ।