শৈলী

শৈলী


নিজেদের সময় দিন

প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২০      

ফ্লোরিডা এস রোজারিও

সময়টা কাটছে বড্ড অস্থিরতায়। কভিড-১৯ কিংবা করোনার কথা এখন গোটা বিশ্বের জানা। তাই সারাবিশ্বের মতো আমাদের দেশও থমকে আছে এক ভয়ংকর ভয়ে। কাজকর্ম, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত বন্ধ থাকার কারণে দৈনন্দিন জীবনের স্বাচ্ছন্দ্যও ব্যাহত হচ্ছে। যে শহরটায় রোজ ট্রাফিক জ্যাম লেগেই থাকত, সেই শহরটাও আজ কেমন থমথমে! করোনার ঝুঁকি মোকাবিলা করার লক্ষ্যে দেশের সিংহভাগ মানুষ এখন কোয়ারেন্টাইনে। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পৃথক থাকা। কোয়ারেন্টাইনের ব্যাপার এখন কারোরই অজানা নয়। মূলত কোয়ারেন্টাইন মানে হলো, বাড়িতে বা বদ্ধ ঘরে থেকে অথবা সম্পূর্ণ নিরাপদ স্থানে থেকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

দেশের এই জরুরি অবস্থায় ঘরবন্দি এখন সবাই। কীভাবে কাটছে এই সময়গুলো? মিউজিশিয়ান গোপী দেবনাথ বলছেন, 'পরিবারকে সময় দেওয়া হচ্ছে। শেলফে থাকা বইগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্ব করার এই তো সময়। নিজেকে সময় দেওয়ার বিষয়টি আমি আগে থেকেই উপভোগ করি। সে জন্য মানিয়ে নিতে সমস্যা হচ্ছে না।'

আবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জুমিক কস্তা বলছেন, 'একটানা ঘরে থেকে থেকে হাঁপিয়ে উঠেছি। প্রতিদিন একইভাবে চলাতে যেন তৈরি হচ্ছে বিরক্তি আর রাগ। সেই সঙ্গে আতঙ্ক তো রয়েছেই।'

'বহুদিন বাদে যেন একটা লম্বা ছুটি মিলল। কিন্তু এ কেমন ছুটি, যেখানে বাসা থেকে বের হওয়াটাই যেন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারাদিন বাসায় থেকে থেকে চলে এসেছে একঘেয়েমি। খুব মন চাইলেও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া যাচ্ছে না। তাই শেষ ভরসা ভিডিও কল।' এমনটাই বলছিলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ব্র্যাকের ছাত্র নিলয় আহমেদ।

এখন মিশ্র প্রতিক্রিয়া চলছে সবার মনেই। একেকজনের কোয়ারেন্টাইন কাটছে একেক অনুভূতিতে।

একটানা বাড়িতে থাকার ফলে যেমন অনেক সুফল মিলছে, তেমন বাড়ছে অনেকের ডিপ্রেশনও। কারণ, সারাদিনে একই রকম কাজ করার কারণে আমাদের মধ্যে রাগ ও একঘেয়েমিপনা তৈরি হচ্ছে। বাচ্চাদের কোনো কাজকর্ম না থাকার কারণে তারাও বিরক্ত করছে, অস্থির হয়ে যাচ্ছে। করোনাভাইরাস নিজেকে বা পরিবারের কাউকে সংক্রমিত করবে কিনা- এ ভয়েও উদ্বিগ্ন অনেকে। এই ভাইরাসের কারণে কতদিন এভাবে থাকতে হবে, তাও জানা নেই সঠিকভাবে। এই নিয়েও অনিশ্চয়তায় ভুগছে দেশবাসী। দিনের বেশিরভাগ সময় মন খারাপ থাকছে। কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। সবকিছু নিয়ে মনে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা কুরে কুরে খাচ্ছে সবাইকে।

এ সময় নিজে নিজে কীভাবে এ সমস্যাগুলো থেকে বের হয়ে আসতে পারি সে সম্পর্কে কিছু কৌশল নিয়ে বলেন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট জিয়ানুর কবির। আপনি নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে দেখুন কোন কোন কৌশল আপনার জন্য উপযোগী, সেগুলো ব্যবহার করতে পারেন :

ষ দৈনন্দিন কাজের রুটিন তৈরি করে সারাদিনের কাজ ভাগ করে নিতে পারেন। সারাদিনের খাবার সময়, ঘুমানোর সময়, ব্যায়ামের সময়, সৃজনশীল কাজ, ইন্টারনেট ব্যবহারের সময়, এমনকি টিভি দেখার সময় সব রুটিনে থাকবে। রুটিন করে চললে অনেক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সহজ হবে।

ষ বাসায় শিশু বা প্রবীণ থাকলে রুটিনে তাদের জন্য সময় রাখতে পারেন। তাদের সময় দিন। তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। তাদের সঙ্গে ইনডোর গেমস খেলতে পারেন। এক সঙ্গে প্রার্থনা করতে পারেন। তাদের উপযোগী সিনেমা দেখতে পারেন। তাদের ভয়ের ঘটনা বেশি শেয়ার না করে খুব অল্প পরিমাণ বলুন।

ষ করোনাভাইরাসের খবর বেশি বেশি শুনলে মনের ওপর অযথা চাপ বাড়বে, আপনি আতঙ্কিত হবেন। তাই দিনের খুব অল্প সময়ের জন্য করোনাভাইরাস সম্পর্কিত নির্ভরযোগ্য সূত্র (যেমন সরকারি সংস্থা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, রেডক্রস ইত্যাদি) থেকে খবর নিতে পারেন। অবশ্যই গুজবে কান দেবেন না। অনির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য শেয়ার করবেন না।

ষ এ সময়ে মোবাইল, মেসেঞ্জার বা সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব বা সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ান। তাদের কারও প্রতি নেগেটিভ ইমোশন অর্থাৎ রাগ, ক্ষোভ, হতাশা থাকলে তা থেকে বের হয়ে আসুন। তাদের সঙ্গে মন খুলে কথা বলুন।

ষ পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে খোলা মনে কথা বলুন। নিজের মনের সুখ, উৎফুল্লতা, সফলতা, রাগ, হতাশা, ভাবাবেগ তাদের সঙ্গে বেশি বেশি শেয়ার করুন। তাদের কঠিন অভিজ্ঞতাগুলো শুনুন এবং এগুলোতে তারা কী কী কৌশল অবলম্বন করেছে তা বোঝার চেষ্টা করুন। মন খুলে কথা বললে আপনার মনের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। তবে ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগের তথ্য শেয়ার সম্পর্কে সচেতন থাকবেন।

ষ রিলাক্স থাকার চেষ্টা করুন। নিয়মিত ধর্মীয় কার্যকলাপ বা আধ্যাত্মিক চর্চা রিলাক্স হতে সহায়তা করে। ব্রিদিং এক্সারসাইজ করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে জোরে জোরে নাক দিয়ে নিঃশ্বাস নিয়ে ৫-৭ সেকেন্ড বুকের মধ্যে আটকে রেখে আস্তে আস্তে মুখ দিয়ে ছেড়ে দিতে পারেন। কিছু সময়ের জন্য ধ্যান করে কাটাতে পারেন। মেডিটেশন মন এবং শরীরের ক্ষেত্রে খুবই উপকারী।

ষ এ সময় নেগেটিভ চিন্তা বা ইমোশন এলে সেগুলোকে খাতায় লিখে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। নিজের পজিটিভ কোয়ালিটিগুলো বেশি করে খাতায় লিখুন। যে বিষয়গুলো আপনাকে হাসায় বা মজা দেয় সে বিষয়গুলো আবিস্কার করে পরিবারের সঙ্গে শেয়ার করুন।

ষ অতীত নিয়ে কিছুই করার নেই। আর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমরা জানি না। তাই অতীত বা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে না ভেবে বর্তমানকে নিয়ে ব্যস্ত থাকুন। তাহলে নেতিবাচক চিন্তা অনেক কমে যাবে। বর্তমানের কাজগুলোয় মনোযোগ দিন।

ষ এ সময়ে গান শুনতে পারেন, রান্না করতে পারেন, বাসা পরিস্কার রাখতে পারেন, অনলাইন কোর্স করতে পারেন, ইউটিউবে ভালো ভিডিও বানাতে পারেন, সৃজনশীল কাজ করতে পারেন।

ষ অবশ্যই নিজের খাদ্য ও পুষ্টির দিকে মনোযোগ দেবেন।

ষ নিজের বা পরিবারের কোনো সদস্যের মানসিক কোনো সমস্যা হলে সেই সমস্যা লুকিয়ে রাখবেন না। আপনার বা পরিবারের কারও মনে অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ঘন ঘন তীব্র উদ্বিগ্নতা, আতঙ্ক, রাগ, হতাশা বা বিষণ্ণতা এলে প্রয়োজনে সাইকিয়াট্রিস্ট বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট বা অভিজ্ঞ মনোবিজ্ঞানীর সহায়তা নিন। এ সময় অনলাইনে সেশন নিতে পারেন।

করোনার এই দিনগুলোতে অস্থিরতা এবং আতঙ্কে কাটছে কমবেশি সবারই। কিন্তু ভয় পেয়ে বসে থাকলে হবে না। বাড়িতে থাকার এই সময়টাকে কাজে লাগাতে হবে সুন্দরভাবে। সেই সঙ্গে থাকতে হবে খুব সতর্ক। পরিবার, বন্ধু এবং সবাইকে সঠিক তথ্যের মাধ্যমে সাবধান করতে হবে। বিষণ্ণতা কিংবা ডিপ্রেশনে থেকে একঘেয়েমি সময় পার করার কোনো মানে নেই। সময় এখন নিজেকে সময় দেওয়ার, পছন্দের সিনেমাটি দেখে ফেলার কিংবা, ধুলা পড়া হারমোনিয়ামটা মুছে নিয়ে আবার গান গাওয়ার।





ছবি : শৈলী আর্কাইভ