শৈলী

শৈলী


দাম্পত্য কলহ

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২০      

আসাদুজ্জামান

একদিন মধ্যরাতে হঠাৎ উচ্চশব্দে কথা কাটাকটি শুনে পাশের ফ্ল্যাটে নক করি। প্রতিবেশী ভাই-ভাবী দু'জনই বেরিয়ে আসেন। তাদের হাস্যোজ্জ্বল চেহারা দেখে বুঝতে পরলাম এটা কোনো সিরিয়াস ইস্যু নয়, শুধুই ঘরোয়া তর্কবিতর্ক ছাড়া। এরপর এরকম অনেকবারই হয়েছে। সময় যত গড়িয়েছে বিষয়টা ততই স্বাভাবিক হয়েছে। বছরখানেক হলো আমাদের পাশের ফ্ল্যাটেই থাকছেন এই নবদম্পতি। দু'জনেই চাকরিজীবী। দিন শেষে ঘরে ফিরে এরকম নানা বিষয়ের অবতারণা নবদাম্পত্য জীবনে খুবই স্বাভাবিক। তাদের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। তবুও অনেক সময় হিতে বিপরীত হতে পারে। তাই সংসার শুরুর প্রথম সময়গুলো অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে সামাল দিতে হয়। এই সময়ে দাম্পত্যকেন্দ্রিক নানা বিষয় নিয়ে তর্কবিতর্ক লেগেই থাকে। বাসা, অফিস, কাজ, খাবার, পোশাক, যোগাযোগ, অতিথি, কেনাকাটা, ইত্যাদি শত ধরনের বিষয় যেন চেপে ধরে সদ্য ব্যাচেলর জীবন থেকে দাম্পত্য জীবনে প্রবেশ করা যুগলদের। দু'জনের পছন্দ-অপছন্দের নানা ছন্দ পতন ও ছোটখাটো দ্বন্দ্বে জীবনের শুরুটা বেশ নাজুক অবস্থায় থাকে। সামান্য বিষয় নিয়েও তর্কবিতর্ক ও কথা কাটাকাটি লেগেই যায়। অনেকে মনে করেন, দাম্পত্য জীবনের ভালোবাসার সম্পর্কে তর্কবিতর্ক, রাগ-অভিমান থাকা ভালো। এতে সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত হয়। তবে খেয়াল রাখতে হবে সামান্য তর্ক যেন গুরুতর কোনো দ্বন্দ্বের দিকে ধাবিত না হয়।

আমাদের নিত্যদিনের সংসার জীবন নানা সংকট ও সম্পর্কের জালে আবদ্ধ। তাই অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ও সামাজিক অবস্থা, দাম্পত্য সম্পর্ককে যেন প্রভাবিত না করে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। দাম্পত্য কলহ সৃষ্টি করে এমন বিতর্কিত বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে নিতে হবে।

সব সময় মনে রাখা জরুরি, দাম্পত্য জীবন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে শুধু একটা কাগজের সম্পর্ক নয় বরং এটি ভালোবাসা, বিশ্বাস, আস্থা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক। এ সম্পর্ককে অটুট রাখতে উভয়ের প্রতি বিশ্বাস ও সম্মান থাকা জরুরি। দু'জনের চাওয়া-পাওয়া, চিন্তা-চেতনা, আদর্শিক মূল্যবোধের বিশ্বাস ছাড়া কখনই সুন্দর দাম্পত্য গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তবে সবক্ষেত্রে দুজনের চিন্তাধারা, মানসিকতা, মতামত ও আচার-আচরণ মিলে যাবে তা ভাবা ঠিক নয়, কিছু ক্ষেত্রে ভিন্নতা খুবই স্বাভাবিক। আবার স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মধুর দাম্পত্য সম্পর্কের পাশাপাশি মনোমালিন্য হওয়াটাও কোনো অবান্তর বিষয় নয়। সংসার হলো হাসি-কান্না ও আনন্দ-বেদনার সম্মিলন। কিছু বিষয়ে আল্পস্বল্প তর্কবিতর্ক দৈনন্দিন জীবনের অংশ, তবে সেটা যেন কলহে রূপ না নেয় সেদিকেও খেয়াল রাখা জরুরি। অনেকে আবার সব ধরনের ঝামেলা থেকে এড়িয়ে যেতে সব বিষয়ে নিশ্চুুপ থাকেন। সেটাও সুখকর কিছু বয়ে আনে না বরং নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আর তাই সমস্যা যতই গভীর হোক, কলহ এড়িয়ে যেতে কৌশুলী হতে হবে। আলোচনার মাধ্যমেই যে কোনো ভুল বোঝাবুঝির সমাধান করা বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।

নতুন দাম্পত্য জীবনে সুখ-শান্তি বজায় রাখার জন্য বিশ্বের কিছু দেশে এখন প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা রয়েছে। আবার কিছু দেশে বিয়ের সময় সে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের সনদও দেখাতে হয়। কেননা প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করলে দাম্পত্য জীবনে বিচ্ছেদের পরিবর্তে সুসম্পর্ক তৈরি হয় বলে মনে করা হয়। এদেশে এমন কোনো প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয় না। কেননা কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এ অঞ্চলে যুগ যুগ ধরে শত তর্কবিতর্ক ও খুনসুটির মধ্যেও বিশ্বাস ও ভালোবাসার বন্ধনে দাম্পত্য জীবন টিকে আছে। তবে এ ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই ধৈর্যশীল হতে হয়। কম্প্রোমাইজ করতে হয় অনেক বিষয়ে। এক ছাদের নিচে বাস করলে দু'জনের মধ্যে কখনও না কখনও মতের অমিল হবেই। বিয়ের পর উভয়ের খুব গোপন ও ক্ষুদ্র বিষয়গুলোও এড়িয়ে যাওয়ার উপায় থাকে না। কিছুু বিষয় নিয়ে তর্কবিতর্ক স্বামী-স্ত্রী উভযের মধ্যে সন্দেহের বীজ বুনতে পারে। মনের বিভিন্ন প্রবণতার মধ্যে সন্দেহ দানা বাঁধতে পারে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, সন্দেহ মানুষের নেতিবাচক মানসিক অবস্থার একটি রূপ, সন্দেহ এক ধরনের রোগ, এ রোগ ডিলিউশন প্যারানয়েড সাইকোসিস ও মরবিড জেলাসি। ভালোবাসা আর সন্দেহ কখনও একসঙ্গে থাকতে পারে না।

আমাদের মনে ভিত্তিহীন, ক্ষতিকর সন্দেহগুলোকে দানা বাঁধতে দেওয়া উচিত নয় কারণ এরকম সন্দেহ আমাদের মধ্যে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত সমস্ত বিশ্বাস ও সম্পর্ককে নষ্ট করে দিতে পারে। বিয়ের পরে দৃষ্টিভঙ্গি ও আচার-আচরণে ব্যাপক পরিবর্তন আসায় ভুল স্বীকারের মানসিকতা জন্ম নেয়। দায়িত্বে ভারসাম্য আসে- তাই একে অপরের প্রতি সহমর্মিতা ও পরিবারের প্রতি যত্নশীল হতে হয়।

কখনও সুখ আবার কখনও অশান্তি, খুনসুটি, রাগ, অভিমান এসব কিছু নিয়েই দাম্পত্য জীবন। এসব একটু স্বাচ্ছন্দ্যে সামলে নিতে পারলেই আপনিই সফলতা আসবে। দাম্পত্যের শুরুতে যত নতুনের মোড়ক থাকে, একসঙ্গে চলতে চলতে টুকটাক তর্কবিতর্ক, মতান্তর ঝগড়া পেরোতে পেরোতে সম্পর্কের রসায়নে আর সেই চাকচিক্য থাকে না বলেই বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন। দু'জন মানুষের নিজস্ব মত, চিন্তাভাবনা ও জীবনযাপনের পন্থাই দীর্ঘ দাম্পত্যে নানা দূরত্ব তৈরি করে বলে মনে করেন মনোবিদরাও। তাই একে অপরের রাগ ভাঙাতে হবে। সম্পর্কের সুতোয় যে কখনও টান না পড়ে সে জন্য আলোচনার মধ্য দিয়ে যে কোনো সমস্যার যৌক্তিক সমাধান বের করতে হবে।

করোনার এ সময় অধিকাংশ মানুষই ঘরে অবস্থান করছে। সবচেয়ে কাছাকাছি থাকছেন দম্পতিরা। কর্মব্যস্ত জীবনে এত দীর্ঘ সময় একত্রে থাকা হয়নি কখনও। এ সময়ে মান-অভিমান, তর্কবিতর্ক হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তাই দাম্পত্যের সুন্দর সম্পর্ক সুদৃঢ় রাখতে যে কোনো প্রতিকূলতাকে যৌক্তিভাবে দু'জনের ভালোবাসা আর বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে জয় করতে হবে। া