শৈলী

শৈলী


বর্ষা যাপন

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২০      

ফ্লোরিডা এস রোজারিও

ঘরবন্দি এই সময়ে একেকজনের সময় কাটছে একেকভাবে। অনেকেই পুরোনো অভ্যাসগুলো ঝালিয়ে নিচ্ছেন। কেউ গাইছেন গান, কেউ পড়ছেন বই। গরম কফির মগে চুমুক দিতে দিতে বসেই পড়ুন ডায়েরিটা নিয়ে। হোক না আবোলতাবোল, তবুও লিখে ফেলুন কবিতা...



'আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদলদিনে/জানি নে, জানি নে কিছুতেই কেন মন লাগে না...'

গানের তালে তালে বর্ষা উদযাপনে রসিক বাঙালি মেতে থাকে সবসময়। কিন্ত আজ সবার ঘোর অসুখ। গোটা বিশ্বের মন খারাপ। তাই তো এই মেঘলা দিনে বন্দি পাখির মতো, খাঁচা ভেঙে উড়ে যেতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে বর্ষার স্বাদ নিতে। বিগত বছরগুলোর স্মৃতিগুলো হয়তো হাতড়াচ্ছেন সবাই। কারণ এবারের বর্ষা যাপন ঠিক যুতসই হচ্ছে না। মহামারিকালের ঘরবন্দি সময় কাটছে। তাই বাঙালির বর্ষাপ্রেমটা এবার আলাদা হবে এটাই স্বাভাবিক।

ছোট্ট মেঘ ওইটুকুন হাত দুটো বাড়িয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে মায়ের সঙ্গে বৃষ্টির স্বাদ নেয়। আর মায়ের কণ্ঠে ভেসে আসে সেই পরিচিত লাইনগুলো- বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর/ নদে এলো বান/শিব ঠাকুরের বিয়ে হল/তিন কন্যা দান।

বর্ষা এবং বাঙালির সম্পর্ক অনাদিকালের। খিটখিটে মেজাজের কাটখোট্টা মানুষটাও গুনগুন করে গেয়ে উঠে- এই মেঘলা দিনে একলা/ঘরে থাকে না তো মন/কাছে যাবো কবে পাবো/ওগো তোমার নিমন্ত্রণ। বৃষ্টি সত্যিই জাদু জানে। রসহীন মানুষটিকেও সে রোমান্টিক করে ফেলে। কেমন উদাস করে দেয় বৃষ্টির প্রতিটি শব্দ।

মহামারির এইসব দিনে এবারের বর্ষা উৎযাপনটা কাটছে ভিন্নভাবে। তবুও বৃষ্টির প্রতি বাঙালির প্রেম কিন্তু থেমে নেই।

গানে গানে বর্ষা

্তুবহুদিন হয় ক্যাম্পাসের পরিচিত মুখদের দেখা নেই। নেই একসঙ্গে চা খেতে খেতে গিটারের তালে গান গাওয়া। বন্ধুদের এই বৃষ্টি দিনগুলোতে খুব মিস করি। বলেছেন ঢাকা ইউনিভার্সিটি পড়ূয়া জীবন।

এই বর্ষা কিংবা বৃষ্টি নিয়ে কতশত গান রচিত হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। যারা গানে গানে থাকতে ভালোবাসেন তারা এই বর্ষাকালীন আড্ডাটা মিস করছে। গান তো মনের খোরাক মেটায়, ওটা তো জীবনেরই অংশ। তাই বৃষ্টি এলে বেরসিক বাঙালির মুখ ফস্কেও বেরিয়ে আসে গান। বৃষ্টিদিনে এসব গান গুনগুন করে বহু বর্ষাপ্রেমিক, বহু রবীন্দ্রপ্রেমিক। মনের অজান্তেই মনের এক কোনায় উঁকি দেয় প্রেম। ঘরে বসে বর্ষা উদযাপনে গানের চেয়ে ভালো থেরাপি আর কি-ই বা হতে পারে?

ঘরবন্দি এসব মেঘলা দিনে এক কাপ চা নিয়ে বসে যেতে পারেন আপনার প্রিয় বারান্দায়। তারপর শুনতে পারেন হৃদয়ছোঁয়া এই গানগুলো...

= পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ষ এমনও দিনে তারে বলা যায়- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

=আজি ঝড় ঝড় মুখর বাদল দিনে- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ষ আমি বৃষ্টি দেখেছি- অঞ্জন দত্ত

= আষাঢ় শ্রাবণ মানে নাতো মন- লতা মুঙ্গেশকর

= ওগো বৃষ্টি আমার চোখের পাতা- হৈমন্তি শুক্লা

= আমি বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে শিখেছি- সুবীর নন্দী

= বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর- জলের গান

=ষ যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো- শাওন

= এই বৃষ্টি ভেজা রাতে তুমি নেই বলে- আর্টসেল

= শিরোনামহীনের 'বৃষ্টিকাব্য'

= বৃষ্টি তোমাকে দিলাম

=বৃষ্টি নেমেছে আজ আকাশ ভেঙে- অর্থহীন (সুমন)

=এই বৃষ্টি ভেজা রাতে চলে যেও না- রুনা লায়লা

কবির কলমে বর্ষা

কবিমন বড্ড নাছোড়বান্দা। যখন তখন বাঁধ ভেঙে সে তৈরি করে ফেলতে পারে প্রেম। এই প্রেম, কলমের কালিতে ফুটিয়ে তোলে উন্মাদনা। ঘরবন্দি সময়েও কবির কলম থামেনি। বর্ষার স্বাদকে শিল্পীমন কোনোভাবেই এড়িয়ে যেতে পারে না। কবিমনের রোমান্টিকতার স্পর্শে কত লেখা হয়ে উঠে কবিতা। আর সেটার বড় আদর্শ তো আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই। 'মেঘদূত' কবিতায় কবি বর্ষাদিনের জল-ছল-ছল হাওয়া-উচ্ছল রূপের ছবি এঁকেছেন এভাবে-

'আজি অন্ধকার দিবা বৃষ্টি ঝরঝর/দুরন্ত পবন অতি/আক্রমণে তার বিদ্যুৎ দিতেছে উঁকি ছিড়ি মেঘ ভার/খরতর বক্রহাসি শূন্যে বরষিয়া।'

ঘরবন্দি এ সময়ে একেকজনের সময় কাটছে একেকভাবে। অনেকেই পুরোনো অভ্যাসগুলো ঝালিয়ে নিচ্ছেন। কেউ গাইছে গান, কেউ পড়ছে বই। আবার টুকটাক লিখতে অনেকেই পছন্দ করে। গরম কফির মগে চুমুক দিতে দিতে বসেই পড়ুন ডায়েরিটা নিয়ে। হোক না আবোল তাবোল, তবুও লিখে ফেলুন কবিতা।

খিচুড়ির স্বাদে...

বৃষ্টি এবং খিচুড়ি। এর চেয়ে সুন্দর কম্বিনেশন হয়তো হয় না। বৃষ্টির পর সোঁদা মাটির গন্ধ আর পেল্গট ভর্তি খিচুড়ি। বাঙালির বর্ষা উদযাপনে আর কি চাই। দীর্ঘ সময়ের ঘরবন্দি অবস্থায় অনেকেই হয়ে উঠেছে পাকা রাঁধুনি। যে কোনোদিন রান্নাঘর অব্দিও যায়নি, সে এখন রান্নাতেই আনন্দ খুঁজে পাচ্ছে। আর বৃষ্টি দিনের আকর্ষণ হলো- খিচুড়ি। গরম গরম খিচুড়ির সঙ্গে বেগুন ভাজা, ইলিশ মাছ আর কাঁচা মরিচ। বৃষ্টিদিনে ঘরের আনন্দের খোরাক হতে পারে এই পেটপুজো।

বাগান বিলাস

বৃষ্টির দিনে গাছেরা হয়ে ওঠে আরও সতেজ। যে গাছগুলো শহরের খরতাপে বহুদিন সেভাবে জল পায়নি, তারাও অপেক্ষা করে বর্ষাকালের। মনের মেঘ কাটছে না, বৃষ্টিও লোভ দেখিয়ে আসছে। বাইরে বেরিয়ে কৃষ্ণচূড়া হাতে ভিজতে ভিজতে ভালোবাসার মানুষের হাত ধরাটা এখন বারণ। সময়টা তাই কাটাতে হবে নিজের সঙ্গে, পরিবারের সঙ্গে। আর সেই সঙ্গে আরেকটা কাজ করলে ষোলকলা হবে পূর্ণ। ছাদে কিংবা বারান্দায় পছন্দের গাছ লাগান। ঝুলন্ত টব বারান্দায় সুন্দর লাগে। সময়টা বাগানের সঙ্গে ভালো জমবে। সবুজ রং চোখকে আরাম দেয়। শহরের এই অসুখের সময়, গাছ মন ভালো করে দিতে জানে। ঝুম বৃষ্টিতে বারান্দায় গাছেদের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়ার সময় এখন। জলের স্পর্শে নেচে উঠে মন, আর আনমনেই সুর ভেসে আসে ...

'হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে ময়ূরের মতো নাচে রে...'

তুলির আঁচড়ে বর্ষা

শিল্পীমন, বর্ষার ছবি আঁকবে না সেটা হয় না। ষড়ঋতুর দেশে চিত্রশিল্পীরা বর্ষাকালের চিত্র ফুটিয়ে তোলে নানাভাবে। তুলির ডগায় রং লাগিয়ে ক্যানভাসের সঙ্গে প্রেম চলে। কখনও সেটা শাড়ির জমিনেও ফুটে ওঠে। বর্ষার সঙ্গে কদম ফুলের সখ্যের কথা কারও অজানা নয়। মসলিন সাদা শাড়িতে হলুদ সাদা কদম ফুল, আর সবুজ পাতা অনায়াসেই মানিয়ে যায় বর্ষার সঙ্গে। কিন্তু বাদ সেধেছে মহামারি। তাই এবারের বর্ষাটা ঘরকুনো। কিন্তু বৃষ্টি কি আর কোনো কিছুকে আটকে রাখতে দেয়? উচাটন শিল্পীমন এঁকে ফেলে বর্ষা। দস্যি মেয়েটা কদম শাড়ি পরে অপেক্ষা করে এই দুঃসময় কেটে যাওয়ার।

এবারের বর্ষায় সাবধানতা

বাঙালির জীবনে বর্ষা উদযাপনের ধারাটা বদলে নেওয়ার সময় চলছে এখন। বৃষ্টি এলে মন দোলা দেয়, আবেগি মন কবিতা লেখে। বাদল দিনের প্রথম কদমে প্রেম জমে যায় ছাতার তলে। কিন্তু সবকিছুর পরেও ভুলে গেলে চলবে না, পৃথিবীর এই অসুখে আমাদের লড়তে হবে শক্তভাবে। তাই নিজের মনের সুস্থতার সঙ্গে সঙ্গে শরীরকেও ঠিক রাখতে হবে। যারা খুব জরুরি কাজে বাইরে যাচ্ছেন তাদের সাবধানতাটা আরও জরুরি।

এখন বর্ষাকাল। বৃষ্টির জল থেকে ঠান্ডা লাগার সম্ভাবনা থাকে। ঠান্ডা লাগানো যাবে না এ সময়। সাবধানতার এসব নিয়মগুলো এখন সবারই জানা। তাই নিজের খেয়াল রাখুন, পরিবারের মানুষদেরও বলুন। পৃথিবীর এই অসুখ কেটে গেলে একসাথে হাতে হাত রেখে আবার পথ চলবে সবাই। া