শৈলী

শৈলী

সুতোয় বোনা স্বপ্ন

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০

গোপি দেবনাথ

মানুষ প্রকৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রচীনকাল থেকেই মানুষ নানা প্রয়োজনে আবিস্কার করে যাচ্ছে নানা কিছু। এসব আবিস্কার মানুষের কাজকে বহু গুণ সহজ করে দিয়েছে। তবে যে আবিস্কারগুলো প্রকৃতির বিরুদ্ধে হানিকর রূপ ধারণ করেছে, সেগুলোকে সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে মানুষ। যেগুলো মানুষ বন্ধ করেনি সেগুলোর জন্য দিতে হয়েছে চরম মাশুল। প্রকৃতি নানা দুর্যোগের মাধ্যমে তার কড়া উত্তর দিয়েছে বারংবার। তবে যা প্রকৃতির জন্য সহনীয়, তা সে গ্রহণ করে নেয়।

চলমান জলবায়ু পরিবর্তনকে মাথায় রেখে আবিস্কারকরা নতুন নতুন আবিস্কার করছেন। প্রতিনিয়ত প্রকৃতিতে যে পরিমাণ কার্বন নির্গমন হচ্ছে, তা যে শুধু মানুষের জন্যই ক্ষতিকর, তা নয়। প্রকৃতির প্রতিটি অংশের জন্যই তা ক্ষতিকর। করোনার লকডাউনে পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যস্ততম শহরও শুনেছে অচেনা পাখির গান। তবে সেসব এখন ইতিহাস মাত্র। কারণ, আবার আগের ব্যস্ত নিয়মে ফিরেছে পৃথিবী।

ক্রিসতাংয়ের বানানো নানা অলঙ্কারে রয়েছে প্রাকৃতিক নানা উপকরণের ছোঁয়া। এর মধ্যে মুখ্য হলো সুতা। ক্রিসতাংয়ের তৈরি প্রতিটি অলংকারে রয়েছে শৈল্পিক হাতের ছোঁয়া। এ ছাড়া অলংকার তৈরির ডিজাইনের নানা মোটিভও প্রকৃতি থেকেই নেওয়া। অলংকারগুলো পরার পর দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন কেউ ফুল ও লতা-পাতা দিয়ে নিজেকে সাজিয়েছে। সেসঙ্গে রয়েছে বাঙালিয়ানার ছাপ।

অলংকারের পাশাপাশি ক্রিসতাং শাড়ি নিয়েও কাজ করছে। তবে তারা প্রধানত কাজ করছে হাতে বানানো গহনা নিয়ে। কিন্তু এই গহনা তৈরিতে সুতাকেই কেন প্রধান উপকরণ হিসেবে বেছে নিয়েছেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে এর উদ্যোক্তা হোসনা এমদাদ স্বর্ণা বলেন, 'বাঙালি সংস্কৃতির এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে সুতা খুব ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নকশিকাঁথা থেকে শুরু করে জামদানি, মসলিন শাড়িতে সুতা নিয়ে বাঙালির সোনালি অতীত রয়েছে। সেই সুতার ব্যবহারকে আমরা গহনায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছি।'

সুতার সঙ্গে আরও বেশকিছু প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার করছেন তারা। যেমন- তালের মুখ, নারিকেলের মালা, মেহগনি গাছের ফল ইত্যাদি। এই উপকরণগুলো খুব সহজেই তারা সংগ্রহ এবং নিজের হাতেই প্রক্রিয়াজাত করেন।

ক্রিসতাংয়ের শুরুর গল্পটা জানার আগে আমি এই নামটির প্রতি বেশি আগ্রহ বোধ করছিলাম। এমন একটি নাম পেলেন কোথায় এবং এর মানেই বা কী? এই প্রশ্নের উত্তরে স্বর্ণা বলেন, 'ক্রিসতাং শব্দটি একটি উপজাতীয় শব্দ। মূলত বান্দরবানের একটি পাহাড়ের নাম। ক্রিস অর্থ ছোট পাখি এবং তাং অর্থ পাহাড়। এ পাহাড়টি এখন অনেকটাই বিলুপ্তপ্রায়।' ঠিক একইভাবে প্রতিনিয়ত আমরা যান্ত্রিকতার ভিড়ে আমাদের অনেক মূল্যবান সংস্কৃতি হারাছি। এ নামটি উদ্যোক্তাদের তাই বারবার মনে করিয়ে দেয়। তাদের তৈরি করা গহনার মধ্য দিয়ে সবাইকে আরও একবার মনে করিয়ে দেয় যে, 'সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।'

ক্রিসতাং বেশ সফলতার সঙ্গে তাদের পথ পাড়ি দিচ্ছে এখন। তবে তাদের এই গহনাগুলো তৈরির মূল লক্ষ্য হলো, গহনাগুলো পরা বা দেখার পর যেন মানুষের মধ্যে শিল্প বোধ তৈরি হয়। মানুষ যেন তাদের সামর্থ্যের মধ্যে দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ঐতিহ্যকে লালন-পালন করতে পারে এবং একই সঙ্গে ধরে রাখতে পারে, এরই একটি উদ্যোগ হলো ক্রিসতাং।

ক্রিসতাংয়ের বীজ বপন হয়েছিল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৩ সালের পহেলা বৈশাখে। প্রতি বছরের বৈশাখী মেলার চেয়ে ওই বছরের মেলাটি বিশেষ ছিল প্রিন্ট মেকিং ডিসিপ্লিনের ছাত্রী হোসনা এমদাদ স্বর্ণার জন্য। বন্ধুরা মিলে একটি স্টল দেন সেই মেলায়। হাতে তৈরি ছোটখাটো নানা কাজ। কিন্তু কীভাবে যেন মেলার মধ্যমণি হয়ে প্রথম স্থান অধিকার করে নেয় কাজগুলো। আজকের ক্রিসতাং হয়ে ওঠার পেছনে সেই মেলাটি একটি বিশাল অনুপ্রেরণা হিসেবে মনে করেন স্বর্ণা। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেই মেলায় তাদের এই ছোট ছোট কাজ জনপ্রিয় হতে শুরু করল। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু তিথি রায়হানাকে সঙ্গে নিয়ে স্বর্ণা 'গাহন' নামে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতায় পুরো খুলনা শহরে প্রদর্শনীটি বেশ সাড়া পায়। গাহনের সেই সাড়ার অনুপ্রেরণার জন্যই আজকের ক্রিসতাং, জানালেন উদ্যোক্তা। ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ক্রিসতাং যাত্রা শুরু করে। পরে সেই যাত্রায় সঙ্গী হন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের তাহনিমা টুম্পা। ক্রিসতাংয়ের এই তিন উদ্যোক্তা নিজেদের সফল বলে দাবি করেন। কারণ, ইতোমধ্যেই তারা অনলাইনে মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পাচ্ছেন, নানা ইতিবাচক মন্তব্য পাচ্ছেন, যা তাদের আরও স্বপ্ন দেখাচ্ছে আরও বড় কিছু করার। তারা যেমন স্বপ্ন দেখেন মানুষ তার সংস্কৃতিকে আগলে বাঁচবে, তাকে ভুলবে না। তেমনি কখনও ভুলবে না তাদের এই কাজের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকা বিলুপ্ত পাহাড় ক্রিসতাংকে। া