শৈলী

শৈলী

লোলোদের গ্রামে...

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০

বেনজীর আহমেদ সিদ্দিকী

ভিয়েতনামের কাও বাং প্রদেশের উত্তরে বাও লাক ও মিও ভ্যাকের বিশাল বিশাল পাহাড়ের মাঝে আঁকাবাঁকা সর্পিল রাস্তা রোমাঞ্চ জাগানোর জন্য বেশ যথেষ্ট। বাড়তি পাওনা পাহাড়ের কোলজুড়ে স্তরে স্তরে সাজানো সবুজ ধানক্ষেত আর মাঝে মাঝে কিছু প্রাকৃতিক গ্রাম। ছবির মতো সুন্দর এসব গুচ্ছ গুচ্ছ গ্রামেই বসবাস করে ভিয়েতনামের ৫৪টি এথনিক গোষ্ঠীর মাঝে অন্যতম পুরোনো লোলো গোষ্ঠী। ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগে চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে লোলোরা পাহাড় বেয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল ভিয়েতনাম ও লাওসে। তবে চীনের পরে ভিয়েতনামেই তাদের সংখ্যা বেশি, প্রায় সাড়ে তিন লাখের কাছাকাছি। হ্যানয়ের হং নদীর মাঝিদের সঙ্গে নৌকাভ্রমণ ও আড্ডা সুযোগ এনে দিল ঐতিহ্যবাহী ও বৈচিত্র্যময় লোলো গোষ্ঠীর সঙ্গে প্রাথমিক পরিচয়ের। মাঝিদের সঙ্গে গল্পের মাঝেই যেন হারিয়ে গেলাম পাহাড়ি লোলো গ্রামে। পরের দিনই পরিকল্পনায় নিলাম লোলোদের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করার। হ্যানয়ের লুওং বাস টার্মিনালে গিয়ে দেড় লাখ ভিয়েতনামিজ ডং দিয়ে টিকিট কেটে ফেললাম। বাসে উঠেই পেয়ে গেলাম এক বোতল পানি, একটা ছোট্ট কেক আর এক ঠোঙা পেস্তা বাদাম। এসব রসদ নিয়েই শুরু হলো দীর্ঘ আট ঘণ্টার বাসযাত্রা। বাসের জানালা দিয়ে চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্যের মাঝে চোখ ও মন পুরোদমে সপে দিলাম। চিরসবুজ পাহাড়, নদী, গাছপালা, নীল-সাদা আকাশের মেলবন্ধনের নৈসর্গিক সৌন্দর্য যেন মুহূর্তেই মোহাবিষ্ট করে ফেলল। যাত্রাবিরতিতে বাস থেকে নেমে চোখ গেল ঘন গোলাপি সাদা রঙের একটা জুসের দিকে, আগ্রহ নিবারণ করতে গিয়ে জানতে পারলাম এটি স্থানীয় মহিষের দুধ, পুরোনো পনির, বাদাম ও হার্বসের একটি ঐতিহ্যবাহী মিশ্রণ। এটি পান করার সাহস না দেখিয়ে শুধু রাম্বুটানের জুস নিয়ে বাসে ফিরে এলাম। একটা অবস্থায় বাসের ঝাঁকুনি ও পাহাড়ি লম্বা পথ তন্দ্রাচ্ছন্ন করে ফেলল। গভীর ঘুম ভাঙল বাসের সাইরেনে। বাস গাইড জানাল আমরা পৌঁছে গেছি কাও বাংয়ে। বাস থেকে নেমে একটি ফলের দোকানের পাশে পেতে রাখা লম্বা কাঠের গুঁড়ির ওপর বসে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে গাইডের খোঁজে ছুটলাম। মোটামুটি ইংরেজি জানা একজন গাইড ঠিক করে লোলোদের গ্রামে উপস্থিত হলাম, তখন অপেক্ষা করছিল দারুণ এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। গ্রামপ্রধান মহিষের শিং দিয়ে বানানো একধরনের বাঁশি বাজিয়ে এবং ঐতিহ্যবাহী ভুট্টার স্যুপ দিয়ে আমাদের বরণ করে নিলেন। এরপর কয়েকজন লোলো নারী এসে ফুলের মালা গলায় পরিয়ে শুভেচ্ছা জানাল। গ্রামবাসীর সঙ্গে কথাবার্তা শুরু করা বেশ কঠিন ছিল। কারণ লোলোরা ইংরেজি তো দূরের কথা, ভিয়েতনামি ভাষাতেও কথা বলতে পারে না। ফলে আমি ও আমার ভিয়েতনামি গাইড ইশারায় কথা চালাতে লাগলাম। আমাদের ভাগ্য ভালো ছিল, গ্রামপ্রধান কিছুটা ইংরেজি ও ভিয়েতনামি ভাষা জানেন। 

রাতে পুরো গ্রামের বাড়িগুলোতে যখন একে একে আলো জ্বলে উঠতে লাগল, তখন মনে হচ্ছিল যেন একঝাঁক জোনাকি পাহাড়ের মাঝে এসে হাজির হয়েছে। মৃদু ঠান্ডা পাহাড়ি বাতাসের মাঝে এ যেন এক অপার্থিব অনুভূতি! যা হোক, রাতের বেলায় আমাদের ঠাঁই হলো গ্রামপ্রধানের বাড়িতেই। সন্ধ্যা রাতেই ডিনার সারতে হলো মহিষের শুকনো মাংস, পনির ও ভুট্টার আটা দিয়ে বানানো শক্ত রুটি, টমেটো ও মাশরুম পোড়া দিয়ে। ডিনারের মাঝেই গল্পের ঝাঁপি খুলে বসলেন গ্রামপ্রধান। লোলোরা পশ্চিম চীনের প্রাচীন কিয়াং সম্প্রদায়ের বংশোদ্ভূত। তারা দক্ষিণ-পূর্ব তিব্বত থেকে সিচুয়ান হয়ে ইউনান প্রদেশে পাড়ি জমায়। এরপর তারা ছড়িয়ে যায় পাশের দেশগুলোর দুর্গম পাহাড়ের মাঝে।   

লোলোরা ঐতিহ্যবাহী বেশ কিছু বাদ্যযন্ত্র যেমন- ধনুকযুক্ত স্ট্রিং ইনস্ট্রুমেন্টস, লিয়াংশান, বাউ, মাবু এবং শেংও বাজাতে বেশ পারদর্শী। ঘুম থেকে ওঠার পর একদল শিশু হৈচৈ করতে করতে আমাদের তাদের গ্রামে নিয়ে চলল। এরই মাঝে আগের গ্রামের প্রধান জানিয়েছেন লোলোদের পোশাক-আশাক ও বিশেষ কিছু প্রথা মানার ওপর ভিত্তি করে তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়- কালো লোলো, ফুল লোলো এবং লুং কিউয়ের লোলো। লোলোদের পরিপাটি থাকার চেষ্টা ও পোশাকের বৈচিত্র্য ভীষণ মুগ্ধতা ছড়িয়েছিল। নাভান গ্রামের লোলোরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ব্ল্যাক ব্যাগি ট্রাউজার্স, কালো পাগড়ি এবং সূক্ষ্ণ সূচিকর্মযুক্ত জ্যাকেট পরে। গোলাপি, সবুজ ও হলুদ রঙের বিভিন্ন জ্যামিতিক ডিজাইন পোশাককে ভিন্ন মাত্রা দান করে। পোশাকগুলোর সঙ্গে রুপার অলংকার দিয়ে ডিজাইন করা হয়। লোলোদের বিশ্বাস, এতে করে মন্দ আত্মা তাদের কাছ থেকে দূরে থাকবে। অনেক লোলো হাতের কাজ করা রঙিন স্কার্ফ মাথায় পরিধান করে।

আমাদের আসার সম্মানে নাভান গ্রামে বিকেলে শুরু হলো সূর্য ডোবা উৎসব। গ্রামের সবাই ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে হাজির হলো পুরোনো এক চেরি গাছের তলায়। সবাই নাচ ও গানে মেতে উঠল। লম্বা লম্বা বাঁশি, শিঙে বাজল। মোরগ লড়াই হলো। চলল স্থানীয় ভাত ও ভুট্টার বিয়ার দিয়ে একে অন্যকে শুভেচ্ছা জানানো। সূর্যদেবতার বন্দনায় এভাবেই তারা বিকেলের শেষ সূর্যকে বিদায় জানাল। গোধূলির শেষ লগ্নে আমরাও নাভানের সবাইকে বিদায় জানিয়ে অনেক ভালোবাসা নিয়ে রওনা হলাম।



জেনে রাখুন

=মার্চ-এপ্রিল এবং সেপ্টেম্বর-অক্টোবর হ্যালং-বে ভ্রমণের আদর্শ সময়।

= ঢাকা থেকে ভিয়েতনাম যেতে হলে ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর কিংবা থাইল্যান্ড হয়ে যেতে হয়। এসব ফ্লাইট ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টার হয়ে থাকে।

=হার্বস ও মুরগির মাংস মেশানো ভিয়েতনামিদের প্রিয় খাদ্য 'ফো' মিস করবেন না।

= ভিয়েতনামে প্রতিবছরই প্রচুর বৃষ্টি হয়। এমনকি অনেক অঞ্চল পল্গাবিতও হয়। তারপরও তাদের কাছে বৃষ্টি খুবই শুভ। তারা মনে করেন, বৃষ্টি মানেই দেশে ড্রাগন ঘুরে বেড়াচ্ছে।

= স্থানীয়দের ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতির প্রতি উপহাস করবেন না।

= শীতের যথেষ্ট কাপড় সঙ্গে নিয়ে যাবেন। রোদ চশমা, সানস্ট্ক্রিন, ওষুধপত্র, ছাতা, ডং (ভিয়েতনামের মুদ্রা) বা খুচরা ডলার সঙ্গে রাখুন।

= ট্যুরের আগেই ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে ঘুরবেন কতক্ষণ-থাকবেন বিস্তারিত কথা বলে নিন।

= যাওয়া-আসা বিমান কোম্পানিভেদে জনপ্রতি ৪০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচ হবে।

বিভিন্ন সময় বিমানের অফার থাকে। অফার দেখে আরও কম খরচে চাইলে যাতায়াত করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে হাতে সময় নিয়ে অগ্রিম বুকিং করতে হবে।

ভিয়েতনামে এগ্রিকালচার ট্যুরের ব্যবস্থাও রয়েছে। এই ট্যুরের অধীনে সেখানকার কৃষকদের জীবন ও কৃষিব্যবস্থা দেখতে পাবেন।