পল্লীকবি জসীমউদ্‌দীন লিখেছিলেন, 'রূপশালী ওই অঙ্গখানি, গয়না শাড়ীর ভাঁজে,/আয়নাখানা সামনে নিয়ে দেখছ কত সাজে।/সত্যি করে বল কন্যে! সবার যেমন লাগে,/তোমার কাছে লাগে কি তার হাজার ভাগের ভাগে?'

নারীর চিরন্তন সৌন্দর্যের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হিসেবে যে জিনিসটি না পরলেই নয় তা হলো গহনা। গহনা ছাড়া নারীর সাজ সম্পূর্ণ হয় না। অলংকার এবং নারী যেন একে অপরের পরিপূরক। ফ্যাশন জগতের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ এটি। যে কোনো পোশাকের সঙ্গে মানানসই গহনায় নারী যেন ফুটে ওঠে অপরূপ রূপে। নারীর রূপের বর্ণনা নিয়ে কবিতা গান, গল্প, উপন্যাসের শেষ নেই। কেউ নারীকে সাজিয়েছেন সিন্ধু সেচে মুক্ত এনে, কেউ চিত্রকর্মে, কেউবা বিনি সুতোর মালায় গেঁথে। আর এখনকার ডিজাইনাররা নারীকে সাজিয়েছেন বাহারি রং ও মোটিফের ব্যতিক্রমী গহনায়।

সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে ও সাজে গহনার প্রাধান্য হাজার বছর আগে যেমন ছিল, আজও তা আছে। শুধু পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় যুগের সঙ্গে মিলিয়ে গহনার রং, নকশা, মোটিফ ও উপাদানে এসেছে ভিন্নতা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের রুচিবোধ, ফ্যাশন এবং চাহিদার পরিবর্তন হয়। একটা সময় বাঙালি মেয়েরা গহনা বলতে জানত সোনা, রুপা বা পাথরের গহনাকেই। এসব গহনা তো সবসময়ই চলে এসেছে। তাই এখনকার ফ্যাশনপ্রেমী তরুণীরা চায় ভিন্ন কিছু। ভারী গহনার চেয়ে হালকা অথচ স্টাইলিশ এমন বিকল্প গহনাতেই তরুণীরা সাবলীল।

মেটাল, সুতা, কড়ি, রুদ্রাক্ষ, পুঁতি, ঝিনুক ও বিডসের নানারকম গহনা এখন বেশ জনপ্রিয়। এ ছাড়া রয়েছে কাপড়, কাঠ, বোতাম, প্লাস্টিক, ধাতব পদার্থ ইত্যাদি উপাদানের গহনাও বানাচ্ছেন ডিজাইনাররা।

কাঠের ওপর ময়ূর, পালকি, রিকশা প্রিন্ট, ফুল পাতা, বিখ্যাত মানুষের ছবিসহ পেনডেন্ট, আংটি, কানের দুলগুলো এখনকার গহনাগুলোতে দিয়েছে ভিন্ন রূপ।

ট্রেন্ডি গহনা

আধুনিক নারীদের পছন্দের ধরন বেশ পাল্টেছে। তাদের চেতনার রঙে উঠে এসেছে দেশীয় সংস্কৃতিকে ধারণ করার আনন্দ। গহনায় প্রাকৃতিক উপাদান, দেশীয় মোটিফ, উপকরণ ও নকশাশৈলীর অসাধারণ ব্যবহারে গহনাগুলো পেয়েছে ব্যতিক্রমী সৌন্দর্য।

খুঁত-এর ডিজাইনার ঊর্মিলা শুক্লা জানান, প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে আমাদের গহনাগুলো ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কাঠ দিয়ে তৈরি পুঁতির গহনা এখন 'ফ্যাশনে ইন'। প্রতিটি পুঁতিকে ভেজিটেবল ডাইতে ডুবিয়ে তৈরি করা হয়। আবার কিছু কিছু পুঁতির গহনা ন্যাচারাল রাখা হয়। এ ছাড়া সুতা, কড়ি, মাটির তৈরি গহনাগুলো যে কোনো পোশাকের সঙ্গে মানানসই। এসব গহনায় রঙের আধিক্য থাকায় ফ্যাশনের পাশাপাশি মনও থাকে রঙিন। এ ছাড়া নারিকেলের বাটনে চিত্রকর্মও ফুটে উঠেছে গহনাগুলোতে; যা খুবই সাধারণ, সুন্দর এবং পরিবেশবান্ধবও।

এখনকার তরুণীরা চায় ভিন্নভাবে নিজেকে ফুটিয়ে তুলতে। তেমনই একটি ব্যতিক্রমী অথচ স্টাইলিশ গহনা হলো আদিবাসী মালা।

ফিনারি-র ডিজাইনার ড চিং চিং এ বিষয়ে বলেন, এই মালা গারোদের বসন দকমান্দা দিয়ে বানানো। গারোরা সচরাচর পিতল, রুপার গহনা পরিধান করতে পছন্দ করে। তবে আদিবাসীদের পোশাকের তালিকায় সবসময় স্থান পায় তাঁতের কাপড়, তাও আবার নিজেদের ডিজাইনে গড়া নিজ তাঁতে। আর এই তাঁতবস্ত্রকে আমরা সবার ব্যবহারের জন্য নিয়ে এসেছি গলার মালা বানিয়ে। রঙিন সুতোয় বোনা এই মালা যে কোনো পোশাকের সঙ্গে যে কোনো বয়সের মেয়েই পরিধান করতে পারবে।

এ ছাড়া টি-শার্ট কিংবা ফতুয়া, এমনকি শাড়ির সঙ্গেও মানাবে এমন কিছু রিকশাচিত্রের মালাও তৈরি করা হয়েছে ফিনারিতে। রাজধানী ঢাকাকে রিকশার শহর বলা চলে। আর এই রিকশাকে একটু অন্য আঙ্গিকে রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টায় কাঠের ওপর রিকশাচিত্র করে মালা তৈরি করা হয়েছে। দাম সাধ্যের মধ্যে বলে এই বিভাগের গহনার প্রতি টিনেজারদের আগ্রহ খুব বেশি।

ফ্যাশন দুনিয়া সবসময় নতুন কিছু খোঁজে। হাল ফ্যাশনে সুতার তৈরি গহনার জনপ্রিয়তা বেড়েছে। সুই-সুতার নকশা যা কিনা এতকাল ছিল কাঁথা কিংবা পোশাকের জমিনে। তা এখন উঠে এসেছে গহনায়। তা ছাড়া সুতা বা কাপড়ের গহনাগুলো খুব আরামদায়ক।

অনলাইন শপ ক্রিসতাং-এর ডিজাইনার হোসনা এমদাদ স্বর্ণা বলেন, গহনা ছাড়া নারীদের সাজসজ্জার অনেকাংশই অপূর্ণ থেকে যায় বলে আমার মনে হয়। যদিও গহনা বলতে আমরা অনেকেই সোনা-রূপা ও অন্যান্য ধাতব গহনার কথাই বলে থাকি। তবে বর্তমানে এসব ধাতুর পাশাপাশি সুতার তৈরি গহনা জনপ্রিয়তা পেয়েছে আমাদের দেশে। বিশেষ করে দেশীয় উৎসবগুলোতে এর চাহিদা অনেক বেশি। সুতার তৈরি গহনা জামদানি, মসলিন থেকে শুরু করে তাঁতের শাড়ি এবং ট্রেন্ডি ফ্যাশনের সঙ্গে খুব সহজেই মানিয়ে যায়। ফলে দেখা যায় বিয়েবাড়ি থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে খুব সহজেই এটি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। তরুণীদের কাছে সুতার তৈরি গহনা পছন্দনীয় হওয়ার অন্যতম কারণ হলো এর আকর্ষণীয় রং। বিভিন্ন রঙের সুতোর সংমিশ্রণে তৈরি হয় এই গহনাগুলো। গ্রাহকের নান্দনিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেখা যায় এসব গহনার বিক্রয়মূল্য গ্রাহকের অনেকটাই সাধ্যের ভেতর।

তবে শুধু সুতা, কাঠ কিংবা পুঁতির তৈরি গহনাই শুধু নয়, একশ্রেণির মেয়ের পছন্দ মুক্তা, মেটাল, শেল কিংবা শামুক- ঝিনুকের তৈরি গহনাও।

সিক্স ইয়ার্ডস স্টোরির স্বত্বাধিকারী ও ডিজাইনার লোরা খান জানান, দেশীর মোটিফ, গহনায় অক্ষর, মুক্তা, শেল, সোনালির পাশাপাশি তামাটে-রুপা বা অক্সিডাইজ রঙের তৈরি গহনাগুলো যে কোনো বয়সী মেয়েকেই দেবে আলাদা সৌন্দর্য। এ ছাড়া দেশীয় সংস্কৃৃতি ও অহংকার জামদানি মোটিফের শাড়ি, জামা পরেছেন অনেকেই। গহনাতেও তা ফুটে উঠেছে এবার। এ ছাড়া বাংলা ভাষা ও অক্ষরের ব্যবহারও রয়েছে এবারের কালেকশনে। জন্মের পর থেকে যে শব্দটি আমাদের চিরচেনা তা হলো মা। আর তা যদি উঠে আসে গহনায় তাহলে যেন ষোলোকলাই পূর্ণ। মুক্তার সঙ্গে মেটালে 'মা' লেখা গহনাটি দেশীয় পোশাক শাড়ি এমনকি ওয়েস্টার্নের সঙ্গেও মানানসই। এ ছাড়া শেলের গহনাও ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে সব বয়সী মেয়ের কাছে।

পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে

শাড়ি, ফতুয়া, টি-শার্ট, কুর্তি, টপস, সালোয়ার-কামিজ যে কোনো জামার সঙ্গে মানানসই এমন গহনা বেছে নিতে হবে। পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু করে বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি সব দিবসের উপযোগী গহনা পাওয়া যায় বিপণিবিতান এবং অনলাইন শপগুলোতে। অফিস, নিমন্ত্রণ যে কোনো জায়গায় পরার জন্য এসব ট্রেন্ডি গহনা নিজের কালেকশনে রাখতেই পারেন। টপসের সঙ্গে মিলিয়ে মেটাল কিংবা মুক্তার গহনা পরতে পারেন। আবার সালোয়ার-কামিজের সঙ্গে পরতে পারেন কাঠ, পুঁতি ও নানারকম বিডসের গহনা।

সুতার গহনা, কাঠের পুঁতির সঙ্গে কড়ি ও রুদ্রাক্ষ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ভিন্নধর্মী গহনা, যা সুতি এমনকি জামদানি শাড়ির সঙ্গে ভালো মানাবে। শেল ও মুক্তার গহনার সঙ্গে কাতান, সিল্ক্ক, জর্জেট শাড়ি পরলেও ভালো লাগবে। এ ছাড়া টি-শার্ট কিংবা ফতুয়ার সঙ্গে আদিবাসী মোটিফ ও রিকশাচিত্রের গহনা ফ্যাশনে এনে দেবে ফিউশন লুক।

একরঙা পোশাকের সঙ্গে নানান রঙের পুঁতির গহনা পরলে বেশ ফুটে উঠবে। পোশাক যদি হয় অনেক বেশি রঙিন, সে ক্ষেত্রে পোশাকের জমিনে যে রঙের আধিক্য কিছুটা কম সেই রঙের গহনায় সাজ হয়ে উঠবে আকর্ষণীয়। হালকা রঙের পোশাকের সঙ্গে গাঢ় রঙের গয়নাও পরতে পারেন।

পোশাক যদি হয় বড় গলার সে ক্ষেত্রে গলার সঙ্গে মিলিয়ে ছোট গহনা পরতে পারেন। উঁচু কলারের পোশাক হলে লম্বা গহনা ভালো লাগবে।

অতিরিক্ত গহনা নয়

ব্যস্ত জীবনে সহজেই ব্যবহার-উপযোগী এই গহনাগুলো আমাদের সাজকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। অনুষ্ঠান, অফিসে পরে যাওয়া থেকে শুরু করে সাধারণ কাজে বাইরে গেলেও হালকা গহনা মেয়েদের নিত্যসঙ্গী। গহনায় নানারকম ভেরিয়েশন থাকায় ফ্যাশনপ্রেমী তরুণীরা যে কোনো পোশাকের সঙ্গেই মিলিয়ে পরতে পারে এসব গহনা। তবে গহনা পরার ক্ষেত্রে খেয়াল রাখা উচিত তা যেন পোশাক এবং হাল ফ্যাশনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। কারণ একসঙ্গে বিভিন্ন ধরনের এবং অতিরিক্ত গহনা আপনার সাজের সৌন্দর্যকে ম্লান করে দিতে পারে।

কোথায় পাবেন, কেমন দাম

বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস যেমন আড়ং, বিশ্বরঙ, কে-ক্রাফট, রঙ বাংলাদেশ, অরণ্য, বিবিয়ানা ছাড়াও বর্তমানে বিভিন্ন অনলাইন পেজ রয়েছে এসব গহনার। বিভিন্ন পোর্ট্রেট বা হাতে আঁকা থেকে শুরু করে ভিন্ন মোটিফের এই গহনাগুলো আপনি সহজেই কিনে নিতে পারেন এসব বিপণিবিতান থেকে। এ ছাড়া এ তালিকায় থাকছে সিক্স ইয়ার্ডস স্টোরি, খুঁত, ক্রিসতাং ও ফিনারি। খুঁতে মিলবে প্রকৃতির অনন্য উপাদানে তৈরি কাঠ, মাটি, সুতার বাহারি গহনা। আবার সিক্স ইয়ার্ডস স্টোরিতে পাবেন মেটাল, মুক্তা, এমনকি বাহারি শেলের গহনা। দেশীয় মোটিফ জামদানিকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে গহনায়।

অনলাইন শপ ফিনারিতে আপনি পাবেন আদিবাসী মোটিফের ভিন্ন সব গহনা। এ ছাড়া রয়েছে রিকশা প্রিন্টের গহনাও। ক্রিসতাং-এর সংগ্রহে মিলবে সুতা, নানারকম বিডস আর কড়ির গহনা। সব গহনাই আপনি পাবেন হাতের মুঠোয়, সাধ্যের মধ্যে। ২০০ থেকে শুরু করে দুই হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে গহনাগুলোর দাম। বিপণিবিতান ও অনলাইন শপগুলোতে একটু ঢু মেরেই আসুন। এ ছাড়া নিউমার্কেট ও গাউছিয়ার বিভিন্ন দোকানে সাশ্রয়ী মূল্যে গহনা তৈরির বিভিন্ন উপকরণ পাওয়া যাবে। সৃজনশীলতা ও ইচ্ছা থাকলে ঘরে বসেই এসব উপকরণ জোগাড় করে নিজেরাও তৈরি করে নিতে পারেন গহনা।



জেনে নিন

গহনা শুধু কিনলে এবং ব্যবহার করলেই হবে না, একটু যত্নশীলও হতে হবে সঙ্গে। যেন আপনার প্রিয় গহনা দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়।

গহনা ভিন্ন ভিন্ন বক্সে সংগ্রহ করুন। একই সঙ্গে অনেক গহনা সংগ্রহ করা থেকে বিরত থাকুন। বক্সে গহনা রাখার সময় নরম কাপড়, তুলা বা টিস্যুতে মুড়িয়ে রাখুন। আলাদা জিপার ব্যাগ ব্যবহার করলেও ভেতরে টিস্যু, তুলা অথবা কাপড় রাখুন। গহনা নিয়মিত পরিস্কার করে নেওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিন। দীর্ঘদিন অব্যবহারের ফলে গহনা অযত্নে বাক্সবন্দি করে রাখবেন না। মাঝে মাঝেই পরিস্কার করুন।

গহনা পরে সরাসরি পারফিউম ব্যবহার করবেন না। কারণ, এতে রং নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

ব্যবহারের পর গহনা তুলে রাখার আগে নরম কাপড় দিয়ে গহনা মুছে নিন। ঘাম লেগে থাকলে তা মুছে যাবে।

কাঠের বানানো গহনার সঙ্গে অন্য গহনা পরবেন না। এতে গহনায় গায়ে দাগ পড়ে সৌন্দর্য ম্লান হয়।

সুতার গহনা গরমের দিনে কিংবা অনুষ্ঠানে গেলে অনেক সময় ঘামে ভিজে যায়, পরা শেষে এই গহনা ভালোভাবে শুকিয়ে তারপর তুলে রাখতে হবে। কোনোভাবেই ভেজা অবস্থায় নয়; নাহলে রং নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

মুক্তার গহনা প্লাস্টিকের ব্যাগে রাখবেন না। এই গহনা ব্যবহার শেষে নরম, ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে ফেলতে হবে। যদি খুব বেশি ময়লা হয় তবে পানিতে সামান্য সাবান মিশিয়ে নিয়ে নরম ব্রাশ দিয়ে পরিস্কার করতে হবে।

মন্তব্য করুন