ষড়ঋতুর পালাবদল আর প্রকৃতির মন ভোলানো রূপলাবণ্য ধারণ করে বাংলাদেশ পৃথিবীর সব দেশ থেকে আলাদা হয়ে আছে। গ্রীষ্ফ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত কত রং-উচ্ছ্বাস আর সৌন্দর্য দিয়ে আচ্ছাদিত করে রাখে প্রকৃতিকে। প্রতিটি ঋতুতে থাকে ভিন্ন সাজ, থাকে একেক রূপ।

এই যেমন প্রত্যেক শীতে অপরূপ সাজে সেজে উঠে সিলেটের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত জৈন্তাপুর উপজেলার ডিবির হাওর। সকালে যখন কুয়াশা আর সুয্যিমামার লুকোচুরি খেলা চলে, এরই ফাঁকে নিজের রূপকে শানিত করে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য সঁপে দেয় এই শাপলার রাজ্য। রাস্তার দুই পাশে বিস্তীর্ণ হাওরজুড়ে সদ্য ফোটা ফুলগুলো যেন হাত বাড়িয়ে ডাকে পর্যটকদের। একেকটি সজীব শাপলা ফুলের মনকাড়া চাহনি যে কাউকে এক পলকেই মুগ্ধ করে দেয়।

কুয়াশার চাদর ভেদ করে রক্তিম সূর্য যখন আকাশে আগমন করে বীরের বেশে, রঙিন শাপলা ফুলগুলো ঝিকিমিকি করে তাকে অভিবাদন জানায়। এমন চোখ শীতলকারী দৃশ্যের জীবন্ত সাক্ষী শহরের দুরন্ত মেয়েটি বিলের পানিতে পা ভাসিয়ে মেতে ওঠে উন্মাদনায়। হাওরে যখন নৌকা চলে শাপলাপাতার ফাঁকে ফাঁকে স্নিগ্ধ জলের মাঝখানে ফুটে উঠে পর্যটকের প্রতিচ্ছবি, ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়ের সারি উঁকি মারে দূর থেকে। যেন শাপলার রাজ্যে সৌন্দর্যের হাতছানি তাদেরও ব্যাকুল করে তুলেছে। ভোরের শান্ত প্রকৃতিতে হরেকরকম পাখির কিচিরমিচির ডাক অন্যরকম আবহ তৈরি করে পর্যটকদের মনে। সব মিলিয়ে এ যেন রূপের আধিপত্য।

জানা যায়, ১৮৩৫ সালের ১৬ মার্চ হ্যারি নামক ইংরেজ রাজেন্দ্র সিংহকে কৌশলে বন্দি করে সব লুট করে নেয় রাজা বিজয় সিংহের রাজ্য থেকে। এই রাজ্যেরই স্মৃতি বিজড়িত ডিবির হাওর।

রাস্তার বাম পাশের হাওর ধরে এগুলে সামনে পাওয়া যায় প্রায় ২০০ বছরের প্রাচীন একটি মন্দির। গুল্মলতা আঁকড়ে ধরা প্রাচীন এ স্থাপনার কারুকাজ আর নিপুণতা নিমিষেই দৃষ্টি কাড়ে। ইতিহাস খুঁজে জানা যায়, জৈন্তার এক রাজাকে এখানে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। তার স্মৃতিতেই এই মন্দির।

যখন যাবেন ভ্রমণে

বছরের অন্যান্য ঋতুর তুলনায় শাপলা বিলের সৌন্দর্য বহুলাংশে বৃদ্ধি পায় হেমন্তের মাঝামাঝি সময় থেকে শীতের শেষ পর্যন্ত। তাই এখানে ভ্রমণের উপযুক্ত সময় হলো শীতকাল। ভ্রমণের ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে মাথায় রাখতে হবে; সেটি হচ্ছে শাপলা বিলের ফুলগুলো ফুটে খুব ভোরে, আবার রোদের তাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের সৌন্দর্যকে লুকিয়ে ফেলে তারা। তাই যত ভোরে এখানে পৌঁছা যাবে, ততই বাড়তি সৌন্দর্য অবলোকনের সুযোগ বাড়বে।

যেভাবে যাবেন

সিলেট শহর থেকে ৪২ কিলোমিটার দূরে ডিবির হাওরের অবস্থান। সিলেট-তামাবিল সড়কপথ ধরে বাস, লেগুনা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা অথবা প্রাইভেট কারে যেতে হবে জৈন্তাপুরে। জৈন্তাপুর বাজার থেকে সামান্য সামনে গেলেই সড়কের ডান দিকে দেখা যাবে 'বিজিবি ডিবির হাওর ক্যাম্প' লিখিত ফলক। এই গ্রামীণ সড়কে এক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলেই মিলবে শাপলা বিলের দেখা। রাস্তার দুই পাশে রয়েছে দুটি নৌকার স্ট্যান্ড। এখান থেকে প্রতিটি নৌকা ভাড়া নেবে ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা।

যেখানে থাকবেন

ডিবির হাওরে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সিলেট শহরের যে কোনো হোটেল বা রেস্ট হাউসে থাকাটাই উত্তম। যেহেতু ভোরে রওনা দিয়ে সূর্য ওঠার আগেই হাওরে পৌঁছা সম্ভব, তাই পর্যটকদের পছন্দ অনুযায়ী হোটেলে রাতযাপনের জন্য শহরে থেকে যাওয়াই ভালো।



টিপস

=যথাসম্ভব ভোরে আসার চেষ্টা করতে হবে। কারণ, খুব ভোরে শাপলা ফোটে আবার বেলা বাড়লে ঘুমিয়ে পড়ে।

= কাছাকাছি ভালো মানের রেস্টুরেন্ট না থাকায় সঙ্গে শুকনো খাবার রাখা যেতে পারে।

= রোদের তাপ যেহেতু সময়ের সঙ্গে বেড়ে যায়, তাই পর্যাপ্ত পানি সঙ্গে রাখা ভালো।

= ডিবির হাওর ঘুরে, পাশে জাফলংসহ অন্য দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে আসতে পারেন।

= সঙ্গে গাড়ি থাকলে পার্কিংয়ের ক্ষেত্রে জায়গা নির্বাচনে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হবে।



লেখক : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ

মুরারিচাঁদ কলেজ সিলেট

মন্তব্য করুন