চকবাজারের শাহি মসজিদের সামনের রাস্তায় পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ইফতারির বাজারে হাঁকডাক এবার নেই। তবে এই ইফতারি বানানোর রেওয়াজ পুরান ঢাকার প্রতি ঘরে ঘরে। চকবাজারের ঐতিহ্যবাহী তেমনই কিছু ইফতারের রেসিপি দিয়েছেন নুসরাত নিজাম এবং ছবি তুলেছেন নাকিব নিজাম




শাহি হালিম

উপকরণ :ডাল তৈরির জন্য দেড় টেবিল চামচ মসুর ডাল, মুগ ডাল দেড় টেবিল চামচ, মটর ডাল দেড় টেবিল চামচ, ছোলার ডাল দেড় টেবিল চামচ, খেসারি ডাল দেড় টেবিল চামচ, মাষকলাই ডাল দেড় টেবিল চামচ, গম দেড় টেবিল চামচ, পোলাওর চাল ৪ টেবিল চামচ। মসলার জন্য দারুচিনি ২ টুকরা, এলাচ ৩টি, লবঙ্গ ৫টি, মরিচ গুঁড়া আড়াই চা চামচ বা ঝাল বুঝে, আস্ত গোলমরিচ ৬টি, জিরা গুঁড়া আড়াই চা চামচ, হলুদ ১ চা চামচ, ধনে গুঁড়া ২ চা চামচ, জয়িত্রী আধা চা চামচ, পাঁচফোড়ন ২ চা চামচ, বিটলবণ দেড় চা চামচ। মাংসের জন্য গরু/খাসির মাংস ১ কেজি, পেঁয়াজ কুচি ১ কাপ, কাঁচামরিচ ছেঁচে নেওয়া ১টি, আদা বাটা ২ টেবিল চামচ, রসুন বাটা ১ টেবিল চামচ, দারুচিনি ৩ টুকরা, এলাচ ৩টি, লবঙ্গ ৩টি, তেজপাতা ২টি, লবণ পরিমাণমতো, গরম পানি পরিমাণমতো, তেল/ঘি আধা কাপ। পরিবেশনের জন্য পেঁয়াজ বেরেস্তা, কাঁচামরিচ কুচি, আদা কুচি, ধনেপাতা, শসা কুচি ও লেবু।

প্রস্তুত প্রণালি :মটর ডাল এবং ছোলার ডাল সারারাত পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। মুগ ডাল, মসুর ডাল, পোলাওর চাল, মাষকলাই ডাল, খেসারি ডাল, গম এবং ভিজিয়ে রাখা মটর ও ছোলার ডাল ভালো করে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিতে হবে। চাল ও ডাল থেকে পানি ঝরে গেলে সব একসঙ্গে বড় একটি পাত্রে নিয়ে ফ্যানের বাতাসে রেখে পানি পুরোপুরি শুকিয়ে ঝরঝরে করে নিয়ে একটি প্যান গরম করে চুলায় হালকা আঁচে টেলে নিতে হবে। ডাল থেকে সুন্দর একটা ঘ্রাণ বের হলেই মিশ্রণটি চুলা থেকে নামিয়ে ঠান্ডা করে নিয়ে ব্লেন্ডারে নিয়ে দানাদার গুঁড়া করে নিতে হবে। এবার হালিম মসলার সব উপকরণ একসঙ্গে নিয়ে পাটায় বা ব্লেন্ডারে গুঁড়া করে নিতে হবে। মাংস রান্নার জন্য প্রথমে তেল এবং মাংসের সব মসলা একসঙ্গে মেখে চুলায় বসিয়ে ভালোভাবে কষিয়ে নিতে হবে। এরপর এতে আগে থেকে গুঁড়া করে রাখা হালিম মসলা পুরোটা দিয়ে দিয়ে মাংস ভালো করে নেড়ে ঢেকে দিয়ে মাংস মোটামুটি সিদ্ধ হওয়া পর্যন্ত রান্না করতে হবে।

আলাদা পাত্রে হালিমের চাল ও ডাল মিক্স নিয়ে ৩ কাপ ফুটন্ত গরম পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখতে হবে। মাংস প্রায় সিদ্ধ হয়ে এলে এর মধ্যে ভিজিয়ে রাখা চাল-ডালের মিশ্রণ দিয়ে সব একসঙ্গে মাংসের সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। এরপর মাংসে পরিমাণমতো গরম পানি দিয়ে চুলার আঁচ মাঝারি রেখে রান্না করতে হবে। ঝোল হালকা ঘন হয়ে গেলে হালিমের লবণ দেখে নামিয়ে ফেলতে হবে। হালিমের ওপর পেঁয়াজ বেরেস্তা, কাঁচামরিচ কুচি, আদা কুচি, ধনেপাতা, শসা কুচি ও লেবু দিয়ে পরিবেশন করতে হবে।



পনিরের সমুচা

উপকরণ :ঢাকাইয়া পনির কুচি ২৫০ গ্রাম, ময়দা ২ কাপ, পেঁয়াজ কুচি, কাঁচামরিচ কুচি, মরিচের গুঁড়া ১ চা চামচ, জিরা আধা চা চামচ, লেবুর রস ১ চা চামচ, মাখন ৩০ গ্রাম, তেল ভাজার জন্য এবং লবণ স্বাদমতো।

প্রস্তুত প্রণালি :প্রথমে একটি বাটিতে ময়দা, মাখন ও লবণ একসঙ্গে ভালো করে মিশিয়ে ডো তৈরি করে নিয়ে একটি প্যানে তেল গরম করে জিরা দিয়ে দিতে হবে। এখন এর মধ্যে পেঁয়াজ কুচি, কাঁচামরিচ কুচি, মরিচের গুঁড়া, লেবুর রস, লবণ ও পনির দিয়ে ভালো করে কষিয়ে চুলা থেকে নামিয়ে ঠান্ডা করে নিতে হবে। এবার ময়দার ডো দিয়ে রুটি বেলে সমুচার শেপে কেটে নিয়ে এর মধ্যে পনিরের মিশ্রণ দিয়ে সমুচা তৈরি করে নিতে হবে। প্যানে তেল গরম করে ডুবো তেলে সমুচাগুলো ভেজে নিয়ে বাদামি হয়ে গেলে চুলা থেকে নামিয়ে পরিবেশ করা যাবে মচমচে পনির সমুচা।



শাহি জাফরানি বাদাম শরবত

উপকরণ : দুধ ২ কাপ, চিনি ২ টেবিল চামচ, জাফরান এক চিমটি, সামান্য খাবার গোলাপজল, কাজু বাদাম কুচি ৫০ গ্রাম এবং বরফকুচি।

প্রস্তুত প্রণালি :প্রথমে একটি পাত্রে দুধ, চিনি, কাজু বাদাম ও গোলাপজল দিয়ে জ্বাল দিয়ে হাল্ক্কা ঘন করে নিতে হবে। এরপর মিশ্রণটিকে হাল্ক্কা ব্লেন্ড করে নিতে হবে যেন বাদাম মিশে যায়। এরপর এতে জাফরান মিশিয়ে দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে যেন রং চলে আসে। জাফরানের রং চলে এলে ফ্রিজে ঠান্ডা করে বরফকুচি দিয়ে পরিবেশন করতে হবে।



ফালুদা

উপকরণ :১ কাপ দুধ, ১ টেবিল চামচ সাবুদানা, পরিমাণমতো প্লেইন নুডলস, ১ কাপ আম, ১ কাপ কলা, ১ কাপ আপেল, পেস্তা বাদাম, কাজু বাদাম, পরিমাণমতো জেলাটিন, ১ স্টু্কপ ভ্যানিলা আইসক্রিম ও স্বাদমতো চিনি।

প্রস্তুত প্রণালি :প্রথমে দুধ ফুটিয়ে একটু ঘন করে এতে চিনি মিশিয়ে নিয়ে সাবুদানা দিয়ে রান্না করুন। সাবুদানা প্রায় রান্না হয়ে এলে এতে নুডলস দিয়ে সিদ্ধ করে নিতে হবে। সিদ্ধ হয়ে এলে নামিয়ে ঠান্ডা করে ফ্রিজে রাখতে হবে। এবার একটি পাত্রে ২ কাপ পানির সঙ্গে ২ চামচ চিনি মিশিয়ে এতে ২ টেবিল চামচ জেলেটিন দিয়ে নাড়তে থাকি যেন পানির সঙ্গে ভালোমতো মিশে যায়। এরপর একে নামিয়ে ফ্রিজে ঠান্ডা করতে দিই। ঠান্ডা হয়ে এলে যখন জমে যাবে তখন ইচ্ছামতো জেলেটিন কেটে নিই। এবার একটা গল্গাসে অথবা বাটিতে প্রথমে নুডলস সাবুদানার মিশ্রণ দিয়ে এর ওপরে জেলি, পেস্তা বাদাম, কাজু বাদাম, আম, কলা, আপেল ও বরফকুচি দিয়ে সবার ওপরে আইসক্রিম স্টু্কপ সাজিয়ে পরিবেশন করতে হবে।



মুরগির চাপ ও তন্দুর রুটি

উপকরণ :চাপের জন্য ১টি মুরগির বুকের অংশ, আদা বাটা ১ টেবিল চামচ, রসুন বাটা ১ টেবিল চামচ, কাঁচামরিচ বাটা ২ চা চামচ, মরিচ গুঁড়া ১ চা চামচ, লেবুর রস ১ টেবিল চামচ, গরম মসলার গুঁড়া ১ টেবিল চামচ, তেল ও লবণ পারিমাণমতো। রুটির জন্য ময়দা ৩ কাপ, চিনি ২ চামচ, লবণ পরিমাণমতো, সয়াবিন তেল পৌনে ১ চা চামচ, মাখন ২০ গ্রাম, টকদই কোয়ার্টার কাপ।

প্রস্তুত প্রণালি :মুরগির চাপ তৈরি করতে প্রথমে মুরগির বুকের অংশ কেটে নিয়ে ভালো করে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিয়ে আলতোভাবে থেঁতলে নিতে হবে। এবার মুরগির সঙ্গে তেল ছাড়া সব উপকরণ দিয়ে ভালো করে মাখিয়ে নিয়ে ২ ঘণ্টা রেখে দিই। একটি প্যানে তেল দিয়ে মাখানো মুরগিগুলো মাঝারি আঁচে ভেজে, মুরগির রং লালচে হয়ে এলে নামিয়ে নিতে হবে। ওপরে জিরা গুঁড়া ও ধনে গুঁড়া ছিটিয়ে স্বাদ বৃদ্ধি করা যায়।

তন্দুর রুটি :একটি পাত্রের মধ্যে মাখন বাদে সব উপকরণ ভালো করে মেখে ফেলতে হবে। ভালো করে মেখে নিয়ে অন্তত আধঘণ্টা রেখে দিতে হবে। এবার চুলায় লোহার তাওয়া গরম করতে হবে। তাওয়ার ওপরে সামান্য পানি ব্রাশ করে নিয়ে বড় রুটির আকারে গড়ে ভালো করে সেঁকে নিতে হবে। এরপর তাওয়া উল্টে আগুনের ওপর ধরতে হবে। এতে রুটি পড়ে যাবে না। রুটির নিচে পানি থাকার কারণে রুটি শক্ত হয়ে আটকে থাকবে। বেশ কিছুক্ষণ পরে যখন রুটির ওপর লাল লাল বা সামান্য কালো হয়ে আসবে সেই সময় নামিয়ে ওপরে একটু মাখন ব্রাশ করে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে 'তন্দুর রুটি'।



সুতি কাবাব

উপকরণ :মিহি কিমা আধা কেজি (ব্লেন্ড করা), পেঁয়াজ কিউব আধা কাপ, কাঁচামরিচ কুচি ২ টেবিল চামচ, বেসন ১ কাপ, ধনেপাতা বাটা ২ টেবিল চামচ, টেস্টিং সল্ট আধা চা চামচ, আদা বাটা ১ চা চামচ, ডিম ১টা, রসুন বাটা ১ চা চামচ, লবণ পরিমাণমতো, লাল মরিচের গুঁড়া ১ টেবিল চামচ, কাবাব মসলা ১ চা চামচ, সাদা সরিষা বাটা ১ চা চামচ, বাদাম বাটা ১ চা চামচ, পোস্তদানা বাটা আধা চা চামচ, তেল ২ টেবিল চামচ ও চর্বিছাড়া মাংস আধা কেজি।

প্রস্তুত প্রণালি :সব ধরনের মসলা ভালো করে মাখিয়ে এক ঘণ্টা রেখে দিতে হবে। চর্বি ছাড়া মাংস পাতলা টুকরা করে সামান্য থেঁতলে নিন। ১ চা চামচ কাবাব মসলা, ১ চা চামচ লবণ ও ১ চা চামচ টেস্টিং সল্ট একসঙ্গে মিশিয়ে ওই থেঁতলানো মাংসের ওপর দিতে হবে। এবার মাংসের টুকরা দিতে হবে। তারপর মাখানো কিমা দিন। সবার ওপরে মাংসের টুকরা দিয়ে হাতে গোলা করে নিতে হবে। মাংসের গোলাটি সুতা দিয়ে পেঁচিয়ে নিন। এরপর ওভেনের ট্রে ও কিমার ওপর হালকা তেল মাখিয়ে নিয়ে ওভেনের ট্রেতে কিমাটি রেখে দিন। ২৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ৩০ মিনিট এবং পরে ১৮০ ডিগ্রিতে ৫ মিনিট রাখতে হবে। কিমা হয়ে এলে ব্রাশ দিয়ে ওপরে গরম মসলার গুঁড়া মেখে নিতে হবে। গ্যাসের চুলায় তাওয়া বসিয়ে তার ওপর গ্রিল দিয়ে সুতা কাবাব করা যায়।



দইবড়া

উপকরণ :মাষকলাই ডাল আধা কাপ, জিরা গুঁড়া ১ টেবিল চামচ, ধনে গুঁড়া ১ টেবিল চামচ, গোলমরিচ গুঁড়া আধা চা চামচ, শুকনা মরিচ ৬-৮টি, বিট লবণ আধা চা চামচ, তেল ১ কাপ, পুদিনা পাতা কুচি ২ চা চামচ, টক দই ৩ কাপ, মিষ্টি দই ১ কাপ ও লবণ স্বাদমতো।

প্রস্তুত প্রণালি :মাষকলাই ডাল ৩-৪ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে শিলপাটায় বেটে নিতে হবে। জিরা, ধনে, গোলমরিচ, পাঁচফোড়ন ও শুকনা মরিচ আলাদা আলাদা টেলে একসঙ্গে গুঁড়া করে ডালের সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। সামান্য পানি দিয়ে ডাল খুব ভালো করে ফেটে বাটিতে পানি নিয়ে ছোট একদলা ডাল পানিতে ফেলে দেখতে হবে ভাসছে কিনা। ভাসলে আর ফেটতে হবে না। একটি গামলায় ৬ কাপ পানি ও ২ চা চামচ লবণ মেশান। এবার অন্য একটি কড়াইয়ে তেল গরম করুন। অল্প ডাল নিয়ে চ্যাপ্টা আকারের বড়া ভেজে তেল থেকে তুলে লবণ পানিতে ছাড়তে হবে। এবার একটি পাত্রে টক দই ও মিষ্টি দই নিয়ে সামান্য পানি দিয়ে ফেটতে হবে। স্বাদমতো লবণ, চিনি ও মসলা মিশিয়ে বড়াগুলোর পানি সরিয়ে নিয়ে একটি বাটিতে বড়ার ওপর দই ঢেলে এর ওপরে পুদিনাপাতা কুচি বা ধনেপাতা কুচি এবং গুঁড়া মসলা ছিটিয়ে পরিবেশন করতে হবে।

মন্তব্য করুন