প্রকৃতিতে চলছে হেমন্তকালীন মৃদুমন্দ হাওয়ার আধিপত্য। তবে মাঝে মাঝে হঠাৎ বৃষ্টি কিন্তু ঠিকই মনে করিয়ে দিচ্ছে দু-এক মাসের মধ্যেই আসতে চলেছে শীত। এ সময়কার ফ্যাশন কেমন হওয়া উচিত? পোশাক হতে হবে এমন, যাতে মানিয়ে নেওয়া যায় হঠাৎ বৃষ্টির ফলে আসা হালকা শীত শীত অনুভূতি থেকে শুরু করে রৌদ্রোজ্জ্বল মৃদুমন্দ হাওয়ার একটি স্বাভাবিক দিনের সঙ্গেও। পাশাপাশি হওয়া চাই আরামদায়ক।

এখনকার আবহাওয়া বিবেচনায় যে পোশাকটি সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পায় ফ্যাশন সচেতন নারীদের কাছে, তা হলো কটি। জামার ওপরে পরার জন্য একটি আলাদা বেশ ফ্যাশনেবল পোশাক হলো কটি। প্রতিদিনের অফিস লুক থেকে শুরু করে বন্ধুদের সঙ্গে রেস্টুুরেন্টে আড্ডাই হোক কিংবা কেনাকাটার উদ্দেশ্যে যাওয়া হোক শপিংমলে, সবটাতেই দিব্যি মানিয়ে যাবে একটি কটি। আবার চাইলে বিয়ের নিমন্ত্রণ কিংবা রাতের উৎসব, সবটাতেই আপনি অনায়াসে আপনার ফ্যাশনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে বেছে নিতে পারেন কটিকে। কটি হতে পারে আপনার করপোরেট সঙ্গী, বিয়েবাড়ির বসন কিংবা চায়ের নিত্যনৈমিত্তিক আড্ডার সবচাইতে ভালো বন্ধু। আপনার সাজে যে সৌন্দর্যের মাপকাঠিটি একটু ওপরে তুলে নিয়ে যেতে পারে, তা হলো আপনার পোশাকের সঙ্গে একটি কটির মিশেল।

আগে ধারণা করা হতো শুধু শীতের পোশাক হিসেবেই বেছে নেওয়া যায় কটিকে, তা কিন্তু একেবারেই নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যেমন সবকিছু বদলায়, বদলেছে এ ধারণাও। এখন প্রায় সব ঋতুতেই ফ্যাশন ডিজাইনাররা হাল ফ্যাশনের অংশ করে তুলছেন কটিকে। ফ্যাশন সচেতন নারীরাও পছন্দ করছেন তাদের রোজকার পোশাক হিসেবে। কটিরও রয়েছে আবার নানা ধরন। কে-কদ্ধ্যাফটের ডিজাইনার শরীফুল হুদা বিপ্লব জানান, এখনকার সময়ে খুব ট্রেন্ডি একটি পোশাক হিসেবে কটির চাহিদা আছে বেশ ভালোই। কটির ডিজাইনে আমরা সাধারণত ট্র্যাডিশনাল, ওয়েস্টার্ন এবং কনটেম্পরারি- এই তিনটি প্যাটার্নকে গুরুত্ব দিয়ে থাকি। ট্র্যাডিশনালের মধ্যে বিশেষ করে আমাদের ঐতিহ্যবাহী জামদানি কাপড়ে তৈরি কটি হাল ফ্যাশনের অংশ। লং, সেমি লং এবং শর্ট- এ তিন রকমের কটি হয়ে থাকে। লং কটি বিশেষত তরুণী এবং মহিলাদের কথা মাথায় রেখে ডিজাইন করা হয় এবং বাকি দুই ধরনের কটি টিনএজার বা কিশোরীরাই বেশি পরেন। রঙের ক্ষেত্রে আজকাল হাল ফ্যাশনে আছে নীল, সাদা, কালো, টিল গ্রিন, ধূসর ইত্যাদি রং।

যেহেতু সব বয়সী নারীরা আজকাল কটি পরলেও কটির চাহিদা বেশি দেখা যায় কিশোরী এবং তরুণীদের মধ্যেই। সে কটির কাটছাঁটেও আবার রয়েছে নানা ঢং। কোনোটার সামনে কাটা, কোনোটার ডিজাইন আবার মাছের আকৃতির অর্থাৎ ফিশকাট, রয়েছে স্লিম ফিট এবং ব্যান গলা দিয়ে কামিজ কাটের কটিও। তবে লম্বার পরিমাপের দিক দিয়ে বাজারে সাধারণত তিন ধরনের কটিই চোখে পড়ে সব মিলিয়ে। লং, শর্ট এবং মাঝারি সেমি লং কটি। কটির নিচের দিকের ডিজাইনের বৈচিত্র্যই সাধারণত চোখে পড়ার মতো। কোনোটা একেবারে গোল ঘের দেওয়া, বর্ডারে রয়েছে লেস কিংবা জরির কাজ, কোনোটা আবার তিনকোণা ছাঁট। এ ছাড়া সামনের ডিজাইনেও রয়েছে ভিন্নতা। সামনের দিকে দুটি ফিতা দেওয়া কটি চলেছে বেশ কিছুদিন। সেই দুটি ফিতায় ঝুনঝুনি এবং টার্সেল লাগিয়ে সৌন্দর্যবর্ধনের ব্যাপারটিও বেশ চোখে পড়ার মতো। চলেছে বোতাম দেওয়া কটিও। তবে এখন সামনে বোতাম দেওয়া কটিকে হাল ফ্যাশনের অংশ হতে দেখা যায় না খুব বেশি। কটির হাতা হতে পারে লং কিংবা কাটা। জামা যদি বড় হাতার হয় তবে কটি হাতা কাটা হলে ভালো লাগবে। তবে হাতা কাটা বা ছোট হাতার সঙ্গে মানিয়ে যায় ঝালর দেওয়া বা রুমাল ছাঁট হাতার কটি। হাতায় থাকতে পারে বিভিন্ন ধরনের লেসের প্রাধান্যও। শরীরের অংশে থাকতে পারে ডলার কিংবা জরি-চুমকির কাজ। এমব্রয়ডারিরও দেখা মেলে। দেখতে বেশ ট্রেন্ডি লাগে সামনের দিকে বেশ কয়েকটি ফিতা দিয়ে আঁকাবাঁকাভাবে ক্রিসকস করে পরা যায় এমন স্টাইলের কটি।

লং কটিকে সাধারণত সব ধরনের পোশাকের সঙ্গেই মানিয়ে নেওয়া যায় উপলক্ষ অনুসারে। এর মধ্যে রয়েছে লং কামিজ, ফ্লোর টাচ, এক ছাঁটের গোল জামা, আনারকলি ইত্যাদি পোশাক। অনেকে আবার স্কার্ট এবং টপসের সঙ্গেও পরছেন সেমি লং কটি। স্কার্ট এবং টপসের সঙ্গে শর্ট কটি পরার চল আছে অনেক আগে থেকেই। তবে সেমি লং এবং লং কটিও খারাপ লাগছে না দেখতে। অনেক ইন্দো ও ওয়েস্টার্ন জামার সঙ্গে কটি থাকছে একেবারে জুড়ে দেওয়া। সেক্ষেত্রে আলাদা করে কটি কেনার ঝামেলাটাও আর থাকছে না। বর্তমানে সামনের দিকটা খোলা থাকছে, এমন কটির বেশ চল। চলছে বিভিন্ন প্রিন্টের কটিও। মনে রাখবেন, প্রিন্টের কটি পরলে বেছে নিন একরঙা জামা। নয়তো দুটি ছাপার কাপড় একত্রে জবরজং দেখাবে। কটির রং উজ্জ্বল হলে দেখতে ভালো লাগে। একরঙা জামাও তবে দৃষ্টি আকর্ষক হতে বাধ্য। তবে অনেকেই আছে যারা সাদা, কালো, ধূসর, নেভি ব্লু এই জাতীয় রঙেই খুঁজে পান স্বাচ্ছন্দ্য। তারা নিজের পছন্দের রঙের সঙ্গে অন্য রঙের মিশেল ঘটাতে পারেন। যেমন, সাদা রঙের জামা হলে কটিতে থাকুক নীলের বিভিন্ন শেড। মন্দ কী!

কটির ফেব্রিক হিসেবে সাধারণত কাতান, জর্জেট, সিল্ক্ক, সামু সিল্ক্ক, জর্জেটের ওপর ফ্লোরাল প্রিন্ট, স্কিন প্রিন্ট, ডিজিটাল প্রিন্ট, টাই-ডাই, চুনরি, মসলিন, জামদানি ইত্যাদি বেশি ব্যবহূত হয়। কাতান কাপড়ের কটি বেশ গর্জিয়াস লুক এনে দিতে পারে। তাই কটির কাপড় হিসেবে এর চাহিদা তুলনামূলক বেশি। সুতি কাপড় কটি তৈরিতে তুলনামূলক কম প্রাধান্য পায়। তবে সুতি কাপড়ের ওপর হালকা হাতে করা সুতার কাজ, হ্যান্ডপেইন্ট করা কটি দেখতে বেশ সুন্দর লাগে। নকশিকাঁথার কাজ করা থাকলে বেশ দেশীয় ভাব এনে দিতে পারে। খুব সহজেই চালিয়ে নেওয়া যায় যে কোনো ধরনের ঐতিহ্যবাহী উৎসবের পোশাক হিসেবে। ফ্যাশনের নিত্য পরিবর্তনশীল যাত্রায় নতুন মাত্রার যোগ হিসেবে অনেক ফ্যাশন হাউস নিয়ে আসছে গ্রামীণ চেক ও গামছা প্রিন্টের কটিও। এসব কটি আমাদের দেশীয় পোশাকের সৌন্দর্য বাড়ানো থেকে শুরু করে পশ্চিমা পোশাকে দেশীয় ছোঁয়া এনে দেওয়া, সবটাতেই সমানভাবে পটু।

কটি নির্বাচনের সময় আপনার দৈহিক গড়নকে প্রাধান্য দিন। সব কটি সবাইকে মানাবে না। সাধারণত যারা লম্বা দেখা যায় তাদের প্রায় সব কটিই মানিয়ে যায়। তবে যাদের উচ্চতা একটু কম তারা ফিশকাট কটি বেছে নিতে পারেন। যাদের ওজন একটু বেশি তাদের খুব টাইটফিট কটি না পরাই ভালো। গায়ের সঙ্গে লেগে থেকে বাজে দেখানোর সম্ভাবনা থাকে। তাই যাদের ওজন একটু বেশি তারা একটু ঢিলেঢালা কটি বেছে নিন। এখন প্রশ্ন হতে পারে কটির সঙ্গে কী ধরনের সালোয়ার বেশি মানায়? উত্তর ভারতের পাঞ্জাবে কটির সঙ্গে পাতিয়ালা সালোয়ার পরারও প্রচলন আছে বহুকাল আগে থেকেই। তবে এখন যেহেতু ফিউশনের যুগ, কটির সঙ্গে পোশাক বিবেচনায় পরে নিতে পারেন রোজকার পালাজো থেকে শুরু করে লেগিংস এবং জিন্স সব।

এ ছাড়া কটি নির্বাচনে উপলক্ষ খুব বড় একটি বিবেচনার বিষয়। সিম্পল কিংবা হালকা কাজ করা কটিগুলো পরতে পারেন রোজকার অফিস কিংবা ভার্সিটির ক্লাস, অনলাইন ক্লাসে। বন্ধুদের চায়ের আড্ডায় পরে যেতে পারেন আপনার জর্জেটের ফ্লোরাল প্রিন্টের কটি। আর্ট এক্সিবিশন হোক বা গানের আসর, আপনার হ্যান্ডপেইন্টেড কটিটি হয়ে উঠতে পারে যোগ্য সাথী। আসছে শীত। করোনার প্রকোপ আগের থেকে কম। তাই বিয়ের নিমন্ত্রণ তো পাওয়ার সম্ভাবনা আছেই। আপনার হলুদ রঙের সিল্ক্কের আনারকলিটির সঙ্গে পরুন যে কোনো গাঢ় রঙের কটি। সঙ্গে কানে বড় কোনো দুল। ঠোঁট রাঙাতেই পারেন গাঢ় শেডের কোনো লিপস্টিকে। দেখতে লাগবে খুবই আকর্ষণীয়। এখন আবার শাড়ির সঙ্গেও অনেকে কটি পরে থাকেন। এটিও দেখতে বেশ আকর্ষণীয় লাগে। বিয়েবাড়ির জন্য বেছে নিতে পারেন তসর কাপড়ের তৈরি কটিও। একদমই অন্যরকম একটা লুক এনে দেবে। আর জামদানি কাপড়ে তৈরি একটি কটি! তার তো কোনো তুলনাই হয় না। বিয়ে, গায়েহলুদ থেকে শুরু করে অফিস পার্টি, সবকিছুতে এই কটিই আপনাকে করে তুলতে পারে শো স্টপার।



কোথায় পাবেন, কেমন দাম

ডিজাইনার কালেকশনের বিভিন্ন কটি পাওয়া যাবে বিশ্বরঙ, আড়ং, লা রিভ, এক্সটাসি, ইয়েলো, কে-কদ্ধ্যাফটসহ নামিদামি বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসে। প্যাচওয়ার্কের কটির জন্য রয়েছে খুঁত। হ্যান্ডপেইন্টেড কটি পেতে পারেন বিভিন্ন অনলাইন পেজে। আর নিজেই যদি হয়ে থাকেন শিল্পমনা, তবে তো কথাই নেই। গজ কাপড় কিনে নিজের পছন্দসই কটি বানিয়ে নিন দর্জিকে দিয়ে। তারপর রংতুলি হাতে নিয়ে এঁকে ফেলুন ফুল, পাতা কিংবা আপনার পছন্দের কোনো জ্যামিতিক নকশা। দেখতে খারাপ লাগবে না মোটেই। বরং দেখাবে ইউনিক। কটি কাস্টমাইজও করে নেওয়া যায় বিভিন্ন অনলাইন পেজ থেকে। সিল্ক্কের কটির দাম সাধারণত একটু বেশি হয়ে থাকে। জামদানি এবং মসলিন কাপড়ে তৈরি কটির ক্ষেত্রেও এ রকম। তবে সুতি, জর্জেট, নেট বা শিফন জর্জেট, সব মিলিয়ে কটি পাবেন ১২০০ থেকে শুরু করে ৪৫০০ টাকা অবধি যে কোনো দামে।

মন্তব্য করুন