স্কুল শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নয়, শিশুদের জন্য এ যেন উন্মুক্ত বিশ্ব। করোনাভাইরাসের কারণে দীর্ঘ ১৮ মাস দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। দীর্ঘ এই স্থবিরতা কাটিয়ে আবারও দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেছে। স্কুল প্রাঙ্গণ আবারও মুখরিত হয়েছে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পদচারণায়। স্কুল যেন খুঁজে পেয়েছে তার নবরূপ। শিশুরা ফিরে পেয়েছে তাদের প্রাণের বন্ধুটিকেও। এতদিন যে উচ্ছ্বাস ঘরবন্দি ছিল, তা হয়েছে উন্মুক্ত। খেয়াল রাখতে হবে, স্কুল খুলে দিলেও করোনার বেড়াজাল থেকে এখনও বের হতে পারেনি বিশ্ব। কোনো কারণে করোনার সংক্রমণ বেড়ে গেলে স্থবির হয়ে যেতে পারে পুরো বিশ্ব। সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হবে স্কুলগুলো। তা নিয়ে বাড়াতে হবে সচেতনতা। শুধু শিক্ষক বা শিক্ষার্থী নয়, পুরো সমাজের প্রতিটি মানুষকেই হতে হবে সচেতন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জীবনযাত্রায় এসেছে নানা পরিবর্তন। এমন পরিস্থিতিতে স্কুল পরিপাটি করার পাশাপাশি প্রয়োজন অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী মিলে সুন্দর পদক্ষেপ গ্রহণ, যা শিক্ষার্থীকে করবে স্কুলবান্ধব। যেমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার পাশাপাশি কার্যক্রমগুলো চালু করা। প্রথম থেকেই পড়াশোনার দিকে লক্ষ্য না দিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সহজ ও সাবলীল সম্পর্ক গড়ে তোলা, অভিভাবকদের প্যারেন্টিং দক্ষতার ওপর সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ, শিক্ষার্থীদের ছোট ছোট দলীয় কাজে অংশগ্রহণ করানো, বিতর্ক, খেলাধুলা, আর্ট বা বিভিন্ন সৃজনশীলতার চর্চা করা। সেই সঙ্গে করোনাকালে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে কিছু কার্যক্রম হাতে নেওয়া; যা ক্লাসের পাশাপাশি শিশুদের আনন্দ দেবে। সেই সঙ্গে করবে সচেতনও। আর তেমনই একটি কার্যক্রম হাতে নিয়েছে সেফহ্যান্ডস। 'সুরক্ষিত থাকবো, স্কুল খোলা রাখবো'- এই স্লোগান সামনে রেখে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করে যাচ্ছে। গত শনিবার রাজধানীর শুক্রাবাদে অবস্থিত নিউ মডেল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে তেমনই একটি কার্যক্রমে দেখা যায় তাদের উদ্যোগটি। সেখানে শিশুদের করোনাভাইরাস আক্রমণ এবং তার থেকে রক্ষার সঠিক উপায় নিয়ে অ্যাক্টিভিশন চালানো হয়। পরে মিরপুর রূপনগরেও পথশিশুদের 'স্কুল অব লাইফ' নামে একটি স্কুলেও চালানো হয় দারুণ এই অ্যাক্টিভিশন। যেখানে তাদের করোনা থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে বিভিন্ন উপায় খুব সহজে বলা হয়। কার্যক্রমটি শেষ হলেই তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় মাস্ক এবং হ্যান্ড স্যানিটাইজার। শিশুদের সচেতন করতে অভিনব এই কার্যক্রম হাতে নিয়েছে কাজী এন্টারপ্রাইজেস লিমিটেড। সেফ হ্যান্ডস লিকুইড হ্যান্ডওয়াশ তাদেরই একটি ব্র্যান্ড। প্রতিষ্ঠানটির ব্র্যান্ড ম্যানেজার নাহিদা বেগম জানান, আমরা জীবাণুমুক্ত, সুরক্ষিত ও হাতের কোমলতা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি দীর্ঘদিন ধরে। কারণ সুরক্ষিত হাত নিশ্চিত করে সুস্থ ও সুন্দরজীবন। করোনাকালে এই সময়ে মানুষের জীবনে সেফহ্যান্ডসের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে গেছে। আর ব্র্যান্ডটিও তার অবস্থান থেকে নানা সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশজুড়ে স্কুলগুলোতে শুরু করেছি সচেতনতামূলক এই ক্যাম্পেইন। আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য, মূলধারার স্কুলগুলোর পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের স্কুলেও চালু রয়েছে একই ক্যাম্পেইন।

ক্যাম্পেইনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য

বহুদিন পর আবারও ছাত্রছাত্রীদের পদচারণায় মুখর দেশের প্রায় সব স্কুল। তবে করোনা ও এই সংক্রান্ত ভয় এবং শঙ্কা এখনও সবার মনে গেঁথে আছে। সেই সঙ্গে সচেতনতা ও বিধিনিষেধ মেনে চলা ও নতুন সব অভ্যাসে অভ্যস্ত হওয়ার মতো কিছু বিষয়ও আছে। 'সুরক্ষিত থাকা ও স্কুল খোলা রাখা' পুরো গল্পটি তাই একই সুতায় গাঁথা। যেমন আমি নিয়ম মানলে অন্যের করোনা ঝুঁকি কমবে, তেমনি অন্যরা মানলে আমারও করোনা ঝুঁকি কমবে। তাই সুরক্ষা ও স্কুল খোলা থাকার বিষয়টি অনেকটাই নির্ভর করছে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবকসহ সংশ্নিষ্ট সবার সচেতনতার ওপর। আর সুরক্ষিত থাকলেই স্কুল থাকবে খোলা। তাই এ বিষয়গুলো মাথায় রেখেই সাজানো হয়েছে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনটি।

কতদিন চলবে ক্যাম্পেইনটি

দেশজুড়ে স্কুলে স্কুলে চলছে সেফ হ্যান্ডস লিকুইড হ্যান্ডওয়াশের সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন। গত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ক্যাম্পেইনটি শুরু হয়েছে; যা মাসজুড়ে চলবে দেশের অন্য স্কুলগুলোতেও। স্কুলগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, নওয়াব হাবিবুল্লাহ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রামপুরা একরামুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, খিলগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়, মিরপুর ন্যাশনাল বাংলা উচ্চ বিদ্যালয়, সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ইস্পাহানি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, চিটাগং কলেজিয়েট স্কুল, নাসিরাবাদ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়, নিউমডেল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, সাভার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, এম. ডব্লিউ উচ্চ বিদ্যালয়, বগুড়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, ইয়াকুবিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। এ ছাড়া রয়েছে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের স্কুল 'স্কুল অব লাইফ'। রোটারি ক্লাব অব ঢাকা অবনী'র একটি সিগনেচার প্রজেক্ট করছে। এর মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত ২৫ জন শিশুকে দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে নূ্যনতম ১০ বছরের জন্য নেওয়া হয়েছে। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবনবোধ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম উদ্যোক্তা ড. অনুপম হোসেন বলেন, অষ্টম শ্রেণির পর সব শিক্ষার্থীকে কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা হবে। দারুণ এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সেফ হ্যান্ডস।

কীভাবে চলছে কার্যক্রম

দেশের স্কুলগুলোতে উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়েই ক্যাম্পেইনটি শুরু হয়েছে। স্কুলের দেয়ালগুলো নানা রঙে রাঙিয়ে শিক্ষার্থীদের দেওয়া হচ্ছে মাস্ক পরা, হাত ধোয়া, দূরত্ব বজায় রাখার মতো স্বাস্থ্যবিধির বার্তা। 'সুরক্ষিত স্কুলে স্বাগতম' লেখা বর্ণিল গেটে শিক্ষার্থীদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাচ্ছে সেফ হ্যান্ডস ও করোনার মতো দেখতে মাপেটরা। স্কুলের মধ্যে ঢুকেই শিক্ষার্থীরা প্রথমে হাত ধুয়ে নিচ্ছে সেফ হ্যান্ডসের মোবাইল হ্যান্ডওয়াশ বুথে। তারপরই দেয়াল পার হয়ে ক্লাসে প্রবেশ করছে। আবার ক্লাসে ক্লাসে গিয়ে একজন তাদের বলছে, কীভাবে সঠিকভাবে মাস্ক পরতে হবে, হাত ধুতে হবে, দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে এবং অন্য কোন কোন স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে এবং এতে কী লাভ হবে। পুরো বিষয়টি তাদের দেখিয়ে, শিখিয়ে ও প্র্যাকটিস করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সেফ হ্যান্ডস ও করোনার মতো দেখতে মাপেটগুলো তাদের ছোটখাটো ভুলগুলো ধরিয়ে দিচ্ছে। আবার দেখিয়ে দিচ্ছে কীভাবে সঠিক উপায়ে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্নিষ্টদের অভিমত, এই ক্যাম্পেইনটি সুরক্ষিত থাকা ও স্কুল খোলা রাখার বিষয়টি দারুণভাবে আলোকপাত করেছে এবং এ বিষয়ে জনমত গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে; যা এই সময়ে আমাদের করণীয় বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম। কারণ বাস্তব অবস্থার নিরিখে ক্যাম্পেইনটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। সর্বোপরি শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্নিষ্টদের সবার মধ্যে এটি দারুণভাবে সাড়া ফেলেছে।

মন্তব্য করুন