দিগন্ত বিস্মৃত থইথই জলরাশির সঙ্গে হাওরের নৈসর্গিক সৌন্দর্য; আহ! এ যেন মন ছুটি চাওয়ার ইচ্ছেটাকে পরিপূর্ণতায় রূপ দিচ্ছে। এ যেন মনের কোণের ইচ্ছেগুলো ডানা মেলে উড়ছে। কিশোরগঞ্জের হাওরের সৌন্দর্যে হারাতে প্রকৃতিপ্রেমীরা ছুটে আসেন প্রতিনিয়ত। শহরের যান্ত্রিকতা একপাশে রেখে মনকে ছুটি দেওয়ার লক্ষ্যে গন্তব্য এবার কিশোরগঞ্জের পর্যটনকেন্দ্র হাওর। দিগন্ত বিস্মৃত হাওরের নির্মল বাতাস গায়ে মেখে ঘুরব। ভ্রমণ তালিকায় রয়েছে গুরুদয়াল সরকারি কলেজ সংলগ্ন ওয়াচ টাওয়ার, শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ, গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি, ছাতিরচর, ঈশা খাঁ জঙ্গলবাড়ি ও মসজিদ, বালিখোলা হাওর, মিঠামইন, ইটনা ও অষ্টগ্রাম।

এক স্থান থেকে অন্যত্র যেতে, মাছ আহরণ ও অন্যান্য প্রয়োজনে নৌকা যেন হাওরের মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। নৌকা হলো নিত্যদিনের সঙ্গী এবং মৎস্য শিকার উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম। সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের হাওর ভ্রমণপিপাসুদের কাছে বেশ পছন্দ ও আগ্রহের জায়গায় পরিণত হয়ে উঠেছে। জীবনের অর্থ খোঁজার প্রশ্নে বা জীবনকে উপভোগ করতে কেউ নদী, কেউ সমুদ্র আবার কেউবা পাহাড়কে বেছে নেন। প্রকৃতি জীবনবোধ শেখায়। মনের রং যেখানে ধূসর, প্রকৃতির সান্নিধ্যে তা হয়ে ওঠে রঙিন। প্রকৃতির কৃপায়-কল্যাণে আমরা জীবনকে উপভোগ করি। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় রয়েছে অনিন্দ্যসুন্দর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নিদর্শন, যেখানে মনের সুখ খোঁজেন ভ্রমণপ্রেমীরা। পর্যটকদের সুবিধার কথা চিন্তা করেই এখানে গড়ে উঠেছে আবাসন ব্যবস্থা। যেখানে পর্যটকরা রাতযাপন ও বিভিন্ন সুবিধা পেয়ে থাকেন।

এবারের ভ্রমণ সহজ ও উপভোগ্য হবে; কেননা বন্ধু তানিমের মোটরবাইকে চড়ে ঘুরব হাওরাঞ্চল। দেশের বৃহত্তর ঈদগাহ শোলাকিয়ায় ভ্রমণের সূচনা। তারপর গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি। প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন এই জমিদার বাড়িটি অষ্টাদশ শতকের গ্রিক স্থাপত্যকলায় নির্মিত। পরক্ষণে বারো ভূঁইয়াদের প্রধান ঈশা খাঁর জঙ্গলবাড়ি দুর্গে। এটি একটি প্রাচীন মোগল স্থাপনা। জমিদারি প্রথা না থাকলেও কালের সাক্ষী হয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে জমিদার বাড়ি, মসজিদ ও পুকুর প্রাঙ্গণ। বর্তমানে এটি বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর কর্তৃক তালিকাভুক্ত।

৩০-৪০ মিনিটে মোটরবাইকে চলে গেলাম বালিখোলা ঘাট। করিমগঞ্জ উপজেলা ও সড়কপথের সীমানা এখানেই শেষ। এখন ভ্রমণতরী হিসেবে বেছে নিতে হবে নৌকা, ট্রলার কিংবা লঞ্চ। হাওরে জেলেদের মাছ আহরণ, পাল তোলা নৌকা ছুটে চলছে, দিগন্ত বিস্মৃত আকাশে পাখিদের উড়ে চলা এ যেন শৈশবস্মৃতির রোমন্থন। শৈশবে ফিরে যেতে কে না চাইবে; বাস্তবে তার সুযোগ না থাকলেও শৈশবে পুস্তিকায় যা পড়েছি আজকের দিনে তা অবলোকন করছি। ছাতিরচরের ভাসমান সবুজ অরণ্য দেখলে যে কারও মনে হবে এক টুকরো রাতারগুল।

এক ঘণ্টার খানিক বেশি সময় নৌপথ পাড়ি দিয়ে মিঠামইন উপজেলায় পৌঁছে খানিকটা পথ অতিক্রম করতেই চোখে পড়ল হাওরের অপরূপ সৌন্দর্য। দৃষ্টি সীমানায় শুধুই হাওরের থইথই জলরাশি। হাওরে নির্মাণ করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন সাবমারসিবল রাস্তা, যা বর্ষা মৌসুমে পানিতে তলিয়ে থাকে; শুস্ক মৌসুমে যানবাহন চলাচল করে। ইটনা উপজেলায় খানিক সময় প্রদক্ষিণ করে ছুটে চললাম অষ্টগ্রামের দিকে। যতই যাচ্ছি মনে হচ্ছে সজীবতার পরশে শরীর ও মন উচ্ছ্বসিত হচ্ছে। সড়কের দু'পাশে সজ্জিত স্ন্যাকবার বা কফি হাউস। বন্ধু বা প্রিয়জনকে নিয়ে একটু আড্ডা সেখানে মন্দ নয়। 'বর্ষাকালে পাও আর শুকনোতে পাও'- এমন বহুল প্রবচনের জন্ম হয়েছে হাওরের মানুষের জীবন থেকে। মিঠামইন, ইটনা ও অষ্টগ্রাম হাওরের মানুষের জীবনমান আগের তুলনায় এখন অনেক সহজ ও উন্নত। হাওরে নির্মাণ করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন সড়ক। রয়েছে সুপেয় পানির ব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ। ঋতুভেদে হাওরের সৌন্দর্যের রূপ পরিবর্তিত হয়; তবে তুলনামূলক বর্ষায় বেশি মনোমুগ্ধকর ও উপভোগ্য। ফিরতি পথে দেখলাম বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পৈতৃক নিবাস, রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ মেমোরিয়াল ট্রাস্ট ইত্যাদি। হাওরের তাজা মাছ দিয়ে দুপুরের খাবার; স্বাদ যেন জিহ্বায় লেগে থাকার মতো। সন্ধ্যার পূর্বলগ্নে সূর্যের আলো হাওরের জলে আছড়ে পড়ছে, সঙ্গে মৃদু ঢেউ; এমন দৃশ্য যেমন উপভোগ্য, তেমনি ফ্রেমে বেঁধে রাখার মতো।

আনন্দ যেন বিষাদে রূপ না নেয় সে জন্য হাওরের পানিতে নামতে অবশ্যই কিছু সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি। যেমন সন্ধ্যার পর পানিতে নামা থেকে বিরত থাকতে হবে, কোন জায়গা দিয়ে পানিতে নামবেন, তা গাইড বা স্থানীয় কারও কাছে জেনে নেওয়াই ভালো এবং হাওরে ভ্রমণকালে লাইফ জ্যাকেট সঙ্গে রাখা ভালো।

ছবি :লেখক

মন্তব্য করুন