সুহৃদ সমাবেশ

সুহৃদ সমাবেশ

সেরা তিনের গল্প

প্রকাশ: ১০ জুন ২০১৪

রাজীব নূর

মাত্র এক বছর আগে আঞ্চলিক পর্যায়ের বিতর্কেই ঝরে পড়েছিল ওরা। মাঝখানে অনেক পুরস্কার পেলেও বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশন-সমকাল জাতীয় স্কুল বিজ্ঞান বিতর্ক প্রতিযোগিতার প্রথম আসরে শুরুতেই ঝরে পড়ার গ্গ্নানি কাটছিল না। তবে এক বছর পর একই প্রতিযোগিতায় সেরা দলের পুরস্কার জয়ের মধ্যদিয়ে সেই দুঃখের অবসান হয়েছে ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী শাওন চৌধুরী, সেজান মাহমুদ প্রান্ত ও নাফিস গাজীর।
তিন জনের এ বিতর্ক দলটির নেতা শাওনের মতে, শুধু দুঃখের অবসানই হয়নি। এ পুরস্কার বিজয়টা তার ছোট্ট বিতার্কিক জীবনের সেরা ঘটনা।
চূড়ান্তপর্বে কুষ্টিয়া জিলা স্কুলের সঙ্গে রেসিডেন্সিয়ালের এ দলটি সহজ বিজয় পেয়েছে। তবে এবারও বিতর্কের শুরুটা তত সহজ ছিল না। আঞ্চলিক পর্যায় থেকে চূড়ান্তপর্বে আসার পথে দু'বার হারতে হারতে জয় পেয়েছে তারা। শাওন জানাল, ঢাকারই আরেকটি স্কুলের সঙ্গে মাত্র দশমিক পাঁচের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিল তারা।
চূড়ান্তপর্বে দলগতভাবে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি শাওন সেরা বিতার্কিকের পুরস্কারও পেয়েছে। তৃতীয় শ্রেণী থেকেই রেসিডেন্সিয়ালে পড়ছে সে। সেই থেকে রেসিডেন্সিয়ালের হোস্টেলের বাসিন্দা সে। স্কুলের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছে ছিল শুরু থেকেই। তবে ইচ্ছেটা পূর্ণ হয়েছে হাই স্কুলে ওঠার পর। তবে সাফল্য আসতে শুরু করেছে আরও পরে।
শাওনদের চার ভাইয়ের মধ্যে সে সবার ছোট। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীতে যথেষ্ট ভালো ফল করলেও বিতর্ক নিয়ে তার মাতামাতি মা-বাবা ভালো চোখে দেখেন না। তাদের ধারণা, শাওন যদি পড়াশোনায় আরেকটু মনোযোগী হতো তাহলে আরও ভালো ফল করতে পারত। শাওন অবশ্য মা-বাবার এ মতটা পুরোপুরি মানতে রাজি নয়। তার মতে, বিতর্ক চর্চার ফলে তার মধ্যে যে যুক্তিবোধ তৈরি হচ্ছে, সেটি বিদ্যায়তনিক পড়াশোনাতেও কাজে লাগে।
সেরা দলের সদস্য হিসেবে শাওন ও তার দলের অন্য দুই সদস্যের প্রত্যেকেই পুরস্কার হিসেবে একটি করে ল্যাপটপ পেয়েছে। ল্যাপটপ পেয়ে শাওনের খুশির সীমা নেই। বরিশালের মুলাদী উপজেলার কৃষক পরিবারের সন্তান শাওনের নিজের কোনো ল্যাপটপ ছিল না। এ ল্যাপটপ তাকে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা জ্ঞানের সন্ধান দেবে।
শাওনদের তিন জনের দলটির অন্য দুই সদস্যের মধ্যে সেজান দশম এবং নাফিস নবম শ্রেণীর ছাত্র। তাদের দু'জনের বাসা রেসিডেন্সিয়ালের পাশে মোহাম্মদপুরে।
সেজান জানায়, এবারের পুরস্কার হয়তো মা-বাবাকে খুশি করবে। এখন থেকে আর ঘর পালিয়ে বিতর্ক করতে যাওয়া লাগবে না। সেজানের মা-বাবা দু'জনই দেশের বাইরে থাকেন। সেজান থাকে তার খালার সঙ্গে। পড়াশোনায় তার ফল যথেষ্ট ভালো। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীতে বৃত্তি পেয়েছে সে। তার বিশ্বাস, এসএসসি পরীক্ষাতেও ভালো ফলের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারবে।
নাফিসের সরল স্বীকারোক্তি, 'আমি শাওন ভাই ও প্রান্ত ভাইয়ের তুলনায় খারাপ ছাত্র। তবে লাড্ডাগুড্ডা বলা যাবে না। মোটামুটি ভালোই করি সবসময়।' নাফিস জানায়, শেখার তো শেষ নেই। এবারের বিতর্কের নানা পর্যায়ে শিখেছে সে।
শাওন, সেজান ও নাফিস_ বিতর্কের আলোয় উদ্ভাসিত এ তিনজনের মূল্যায়ন তারা সমকালের সুহৃদ সমাবেশ আয়োজিত এ বিতর্কের চূড়ান্ত পর্বের অতিথিদের বক্তব্য থেকেও শিখেছে অনেক কিছু। সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার রাজনীতিবিদদের যুক্তিহীন আলাপের উদাহরণ দিয়ে শিখিয়েছেন, কীভাবে যৌক্তিক হতে হয়। ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও একসময়কার দেশসেরা বিতার্কিক মাহফুজ আনাম বলেন, বিতর্কে কীভাবে নিজের ব্যক্তিত্বকে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়, কেমন হতে হয় বিতার্কিকদের উচ্চারণ ও বাচনভঙ্গি। খোদ শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ আলোকপাত করেছেন তাদের বিতর্কের বিষয় 'বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গঠনে সহায়ক নয়' প্রসঙ্গে। সেখান থেকে তারা পেয়েছে বিজ্ঞান শিক্ষাসংক্রান্ত তথ্যউপাত্ত।
'বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গঠনে সহায়ক নয়' এ বিষয়ের ওপর চূড়ান্ত পর্বের বিতর্কে অংশগ্রহণ করে রানারআপ হয়েছে কুষ্টিয়া জিলা স্কুলের মো. নূর ইসলাম, আফজালউদ্দীন খান ও মুজতবা আকিব খান।
গত শনিবার রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ মিলনায়তনে প্রতিযোগিতার চূড়ান্তপর্ব অনুষ্ঠিত হয়।