সুহৃদ সমাবেশ

সুহৃদ সমাবেশ

চেতনায় বাজে তার বাঁশি

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০১৪

সমুদ্র প্রবাল

বাংলা সাহিত্য-সঙ্গীত তথা সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণপুরুষ কবি নজরুল। প্রেমের কবি, সাম্যের কবি ও বিদ্রোহের কবি কাজী নজরুলের লেখনী ধূমকেতুর মতো আঘাত হেনে আমাদের জাগিয়ে তুলেছিল।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে ১৮৯৯ সালের ২৪ মে কাজী নজরুল জন্মগ্রহণ করেন। বাবা কাজী ফকির আহমদ এবং মাতা জাহেদা খাতুন। নজরুলের ছেলেবেলার ডাকনাম ছিল দুখু। নজরুলের যখন নয় বছর বয়স, তখন তার বাবা মারা যান। আর্থিক কারণে লেখাপড়ার সুযোগ না পেয়ে বাড়ির পাশেই অবস্থিত এক মাজারে খাদেম ও মসজিদে মোয়াজ্জিনের কাজ করেছেন তিনি কিছুদিন। ছোটবেলা থেকেই নজরুলের মন ছিল গান-বাজনার দিকে। তাই তিনি লেটোর দল নামে পরিচিত এক যাত্রা দলে মাত্র ১২ বছর বয়সে হাসির নাটক ও গান রচনা করে খুব সুনাম অর্জন করেন। এভাবেই শুরু হয়েছিল কাজী নজরুলের সাহিত্যজীবন। লেটোর দলে শিশু নজরুলের কৌতুক-রচনা,
রবনা কৈলাসপুর, আই এম ক্যালকাটা গোইং, যত সব ইংলিস ফেসেন, আহা মরি কি লাইটনিং, ইংলিস ফেসেন সবি তার, মরি কি সুন্দর বাহার, দেখলে বন্ধু দেয় চেয়ার, কাম অন ডিয়ার গুড মর্নিং।
ছোটবেলা থেকে নজরুল ভরঘুরে ছিলেন। এ জন্য কোনো স্কুলেই দীর্ঘসময় নিয়ে লেখাপড়া করেননি। চার-পাঁচটা স্কুলের নাম আমরা জানতে পারি। দশম শ্রেণীতেই কবির স্কুলজীবন শেষ হয়। তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছিল, ব্রিটিশ সরকার বাঙালিদের নিয়ে বেঙ্গল রেজিমেন্ট নামে একটা সেনাদল গঠন করলে ১৯১৭ সালে কাজী নজরুল সেখানে যোগ দেন। সেখানে থাকা অবস্থায় রাশিয়ার বিপ্লব ও লেনিনের লালফৌজের সমর্থনে অনেক কবিতা লিখেছিলেন কিন্তু বিধিনিষেধ থাকায় খবরের কাগজে ছাপানো সম্ভব হয়নি। কবি নজরুল দুই বছর সেনাবাহিনীতে কাজ করেছেন। ১৯২০ সালে কলকাতা থেকে নবযুগ নামে একটি বামপন্থি পত্রিকা বের হলে কবি নজরুল সেখানে সহকারী সম্পাদক ছিলেন। পত্রিকার অফিসেই থাকার জায়গা হয়েছিল তার। ১৯২১ সালে মোজাফ্ফর আহমদের সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের কাজে সাহায্য করেছেন। হিন্দুদেবতার নামে গান কবিতা লিখতেন এ জন্য নজরুলকে ইসলামের শত্রু বা কাফের কবি বলে অনেকে ডাকত। কাজী নজরুল লিখেছেন_
মৌ-লোভী যত মৌলবী আর মোল্লারা কন হাত নেড়ে,
দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে।
ফতোয়া দিলাম কাফের কাজী ও,
যদিও শহীদ হইতে রাজী ও।
বাংলা সাহিত্যে আরবি ও পার্শি শব্দের ব্যবহার তিনিই প্রথম করেছিলেন। এ জন্য অনেক হিন্দু লেখক নজরুলকে পছন্দ করতেন না। কাজী নজরুলের সাহিত্যজীবন খুব লম্বা ছিল না, তিনি বাংলা সাহিত্যের আকাশে ঝড়ের বেগে এসেছিলেন প্রেম আর বিদ্রোহের গান গেয়ে। প্রায় তিন হাজার গান ও কবিতা রচনা করেছেন। কয়েকটা বইয়ের নাম এখানে উল্লেখ করলাম। ব্যথার দান, অগি্নবীণা, বিষের বাঁশি, ভাঙ্গার গান, ছায়ানট, ফণিমনসা, সঞ্চিতা।
১৯২২ সালে ধূমকেতু নামে একটা পত্রিকায় ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে কাজী নজরুল লিখেছিলেন। এই অপরাধে ১৩ মাস জেলে থাকতে হয়েছিল। জেলে থাকা অবস্থায় রবীন্দ্রনাথ বসন্ত নামে একটা নাটক নজরুলের নামে নিবেদন করেন।
যেদিন রবীন্দ্রনাথ মারা যান সেদিন নজরুল লিখলেন_ বিশ্বের কবি, ভারতের রবি, শ্যামল বাংলার হৃদয়ের ছবি, তুমি চলে গেলে, তোমাকে নিয়ে কত গর্ব করেছি, ভগবান তোমাকে পাঠিয়ে ছিল আবার ফিরিয়ে নিল কেন? বিদায়ের সময় তোমার পায়ে আমার চুম্বন নিয়ে যাও। কথা দাও যেখানেই থাক এই হতভাগ্য বাঙালি জাতিকে মনে রাখিও। নজরুল রবীন্দ্রনাথকে কতটা শ্রদ্ধা করতেন তার প্রমাণ পাই।
কাজী নজরুলের সংসারজীবন খুব আর্থিক কষ্টে কাটে। তার জীবনের শেষ ভাষণে আমি আনন্দের গান গেয়ে যাব। আমি প্রেম-ভালোবাসা দিতেই পৃথিবীতে এসেছিলাম, কোনো নেতা ও কবি হতে আসি নাই।
১৯৪২ সালের ৯ জুলাই সন্ধ্যায় কলকাতা বেতার কেন্দ্রে অনুষ্ঠান চলার সময় কাজী নজরুলের মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়, কথা বলার শক্তি হারান। বিদেশে ডাক্তার দেখানো হলেও তেমন উন্নতি হয়নি। এভাবে তিনি প্রায় ৩৪ বছর বেঁচে ছিলেন। কাজী নজরুল ইসলাম জীবনের শেষ চার বছর ঢাকায় কাটান। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকায় তিনি মারা যান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের কাছে কবির সমাধি আছে। তিনি আমাদের জাতীয় কবি। তার ভাষায়_
মহা বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি সেইদিন হব শান্ত
যবে উতপীড়িতের ক্রন্দনরোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না
অত্যাচারীর খৰ কৃপাণ ভীম রণ ভূমে রণিবে না
মহা বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি সেইদিন হব শান্ত।
হসুহৃদ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়