সুহৃদ সমাবেশ

সুহৃদ সমাবেশ

গীতিকার তনু

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০১৪

মণিকাঞ্চন ঘোষ প্রজীৎ

ছোটবেলা থেকেই তনু গান খুব ভালোবাসে। তাই ওর রেডিও শোনার প্রচুর শখ। গ্রামের এক নির্মল পরিবেশে জন্মেছে ও। সেটা এক অজপাড়া গাঁ বললে ভুল হয় না। কেননা এই প্রযুক্তির যুগেও ওদের ওখানে কারেন্টহীন অন্ধকারে এখনও কেরোসিনের প্রদীপ জ্বালিয়ে ওর মা রান্না করে, পিঁড়িতে বসে ভাত খায় ওরা। তনু এখন টগবগে তরুণ। বয়স প্রায় ২৫ বছর। আজ পর্যন্ত ও প্রায় ১০-১২টি রেডিও নিজের হাতে নষ্ট করেছে। এখনও ওর হাতে একটা ভাঙা রেডিও থাকে। প্রায়ই পুরনো দিনের গান শুনতে দেখা যায় ওকে। কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে ও বলে_ গানই আমার প্রাণ। আর সেই ছোটবেলা থেকেই একটা স্বপ্ন বুকে ধরে এ রেডিওটা ও ছাড়েনি। সেটা হচ্ছে কবে তার একটি গান এ রেডিওতে প্রচার হবে। উপস্থাপক কবে তার ছোট্ট নামটি বলবে_ এ গানটির গীতিকার তনু। কিংবা এ গানটির কথা লিখেছেন তনু। এই আশা যেন তার পূরণ হয়-ই না। তাই তনু আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যায় গান লেখার জন্য। গান লিখে আর রেডিওতে পাঠায়। কিন্তু রেডিও থেকে কোনো সাড়া আসে না। তনু তখন বুঝতে পারে গানটি ভালো হয়নি। তাই পুরনোকে ভুলে আবার নতুন গান শুরু করে। এভাবে প্রচুর গানের রচয়িতা হয়ে যায় তনু। কিন্তু তনু একটু লাজুক প্রকৃতির ছেলে। কারও কাছে তেমন বলতে চায় না। কেননা ও জানে নিজের ঢোল নিজে পেটানো ভালো নয়। কিন্তু বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে নিজের ঢোল নিজে পিটিয়েই সম্মান পাওয়া ভার। আর তনু তো অজপাড়া গাঁয়ের ছেলে।
তনু এক গরিব ঘরের ছেলে। তাই সাহিত্যচর্চায় বেশি সময় দিতে পারে না। ওর মা-বাবা এবং নিজের জন্য আহারের সন্ধানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দৌড়াতে হয় শহরের বাবুদের দ্বারে দ্বারে। কিন্তু লেখালেখি কিংবা সাহিত্যচর্চা ওর যেন রক্তে মিশে গেছে। নদীতে জোয়ার এলে মাছ যেমন আপন স্থান পরিবর্তন করে, ঠিক তেমনি তনুরও মনে জোয়ার এলে সে কয়েকটা শব্দ লিখে ফেলে। এ যেন ওদের বিদ্যার দেবী মা সরস্বতীর অপার করুণা। তার করুণার ওপর ভর করেই তনু পার করেছে এতটা বছর।
গ্রামের এক কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে শহরের কলেজে বিএ পড়ছে তনু। মাঝে মধ্যে এ শহরের দুয়েকজন লেখকের সঙ্গে ওর দেখা সাক্ষাৎ হয়। তারা ওর লেখা দেখে মনে মনে কষ্ট পায়। ছলনার ছলে ওকে তিরস্কার করে। তনু কিছু বুঝতে পারে না। কেননা, অজপাড়া গাঁয়ের ছেলে কয়েকদিন শহরের চিকন চাল তার পেটে গেলেই দুয়েক দিনেই শহুরে বাবু হয়ে যায় না। তাই তনুরও তেমন পরিবর্তন ঘটেনি। আর এ সুযোগগুলোই ওই কথিত লেখকরা গ্রহণ করে। অনেকেই ওর লেখা পত্রিকায় ছাপিয়ে দেওয়ার কথা বলে টাকা নেয়। ও বেশি টাকা দিতে না পারায় ওই লেখকরা ওর লেখা ছাপায় না। এই তো সেদিনের কথা, ওর সঙ্গে আমার দেখা হলো। আমি বললাম, কিরে তনু তোর মনটা এত খারাপ কেন? তনু বলল, এমনিতেই রণজিৎ। মানুষ যে এত খারাপ হয় তা আর আমার আগে জানা ছিল না। কেন কি হয়েছে? আবার প্রশ্ন করি আমি। ও বলে, অমুক দাদা আমাকে বলেছিল তুমি যদি ৫০০ টাকা দাও তাহলে তোমার পাঁচটা কবিতা আমার সম্পাদনায় বইমেলায় একটা বইতে ছাপিয়ে দেব। তা টাকা কি তুই দিছিলি? আবার জানতে চাই আমি। আরে না? শুনবি তো! ও একটু আমাকে ধমক দিয়ে নিজের কথা বলতে থাকল, আমি দাদাকে ২০০ টাকা দিছিলাম। আর কইছিলাম দাদা এখন তো আমার কাছে কোনো টাকা নেই। তাছাড়া টিউশনি করে যা পাই মাস শেষে কিচ্ছু হাতে থাকে না। তখন তো দাদার বেশ ভালোই মনে হইছিল। কিন্তু কালকে সুমনের কাছ থেকে সেই বইটা দেখলাম। কিন্তু আমার কবিতা দেখলাম না। তাই দাদাকে ফোন করে বললাম, দাদা আমার কবিতা বইতে ছাপাননি? দাদা বলল, না? বললাম, কেন? আমি যে ২০০ টাকা দিলাম? দাদা বলল, তাতে কি হইছে? তুমি একটা বই নিয়ো। তা না হলে টাকাটা নিয়ো। তুই এখন বল? মানুষ কি আর এখন মানুষ আছে? আমি বললাম, সত্যি মানুষ আর মানুষ নেই রে তনু? সব অমানুষ হয়ে গেছে। তবে ভালো মানুষ না থাকলে দুনিয়া চলত না। তো দুনিয়া যখন চলছে তখন তো ভালো মানুষ অবশ্যই আছে। এমনি করে তনু বেশ কয়েকবার এসব দুই নম্বর লোকদের হাতে টাকা দিয়ে ধরা খেয়েছে। তবুও তনুর লেখা থেমে যায়নি। ইচ্ছে অন্তত একজন গীতিকার সে হবেই।
একদিন বিকেলে তনু পিয়নকে ফোন করে_ দাদা! আমার কোনো চিঠি আসছে কি? পিয়ন ইন্দ্র বলে, হ্যাঁ তোমার একটা চিঠি আসছে। আজকেই এসেছে। আমি কালকে তোমাকে দিয়ে আসব। তনুর পিয়নকে চিঠি আসার কথা জিজ্ঞাসা করার অর্থ হচ্ছে_ পিয়ন আগে একদিন চাকরির প্রবেশপত্র দিতে দেরি করেছিল। শনিবারে পরীক্ষা তো পিয়ন শুক্রবারে চিঠি দিতে এসেছে। সেদিন পিয়নের হাত থেকে চিঠি নিয়ে দেখল, ওর একটা পরীক্ষার জন্য কার্ড এসেছে। কালই পরীক্ষা। ও চিঠি পেয়ে সেদিনই ঢাকা চলে যায়। এ রকম ভুল এড়ানোর জন্য তনু প্রায়ই পিয়নকে ফোন করে। সেদিনও ফোন করেছিল। তনু জিজ্ঞাসা করে কোথা থেকে চিঠি এসেছে? পিয়ন বলল, বেতার থেকে। তারপর বলল, দাদা আমি আসছি। আপনি থাকেন। সন্ধ্যার সময় চিঠিটা হাতে পেল তনু। তবে পিয়ন ইন্দ্রর হাত থেকে নয়। পোস্ট অফিসের মাস্টারের ছেলের হাত থেকে। তখনই চিঠি খুলে দেখতে পেল তনু গীতিকার হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছে। তনু তো মহাখুশি। সবাইকে এই খুশির সংবাদটি দেয়। সবাই বলে, ভালো। কিন্তু গীতিকার হওয়ার পর গীতিকারের করণীয় কি? তা তনুর অজানা। শেষে কোনো উপায়ান্তর না দেখে আঞ্চলিক পরিচালকের কাছে ফোন করে। আঞ্চলিক পরিচালক বলে, আমাদের প্রতিষ্ঠানে আপনার রচিত গান পাঠিয়ে দিন। আর গানগুলো আপনার পরিচিত শিল্পীদের হাতে তুলে দিন। তনু বেতারে গান পাঠায়। আর অন্যদিকে শিল্পী খুঁজতে শুরু করে। একসময় শিল্পী খুঁজতে ঢাকায় যায় তনু। শাহবাগের এক পিয়নের হাতে ধরা খেয়ে রেডিও স্টেশনের ভেতরে যেতে পারে না ও। পিয়নটা ওকে সাত পাঁচ বোঝায়। বলে, আপনাকে এখানে থাকতে হবে শিল্পীদের টাকা দিয়ে_ আপনার গান প্রচার করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। এখান থেকে তনু শিশু একাডেমিতে যায়। সেখানে তনুর গীতিকার মনোনয়নের সনদ দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করে_ কোনো যোগাযোগ ছিল কি? টাকা-পয়সা কত লেগেছে? ইত্যাদি ইত্যাদি। ওরা তনুর কথা বিশ্বাসই করতে চায় না যে, ওকে নয়, ওর গান দেখে ওকে গীতিকার মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
তারপর ইত্তেফাক পত্রিকার এক কতিপয় সম্পাদকের সঙ্গে কথা হয় ওর। তিনি পরিচয় দেন, ৩০ বছর রেডিওতে চাকরি করে অবসর নিয়েছেন। এখন তিনি এখানেও কাজ করেন। তনু তখন বলে, আমার এই গানগুলো থেকে একটা শিল্পীকে দিয়ে দুয়েকটা গান যদি গাইয়ে দিতেন। তিনি বলেন, গাইয়ে দিতে পারি। তবে গানপ্রতি ২০০০ টাকা দিতে হবে। তনু তখন ভাবতে থাকে। গীতিকার না হওয়াই যেন ওর ভালো ছিল। পরের দিন বেতারে যায় ও। সেখানে তেমন কোনো পরিচিত শিল্পীর দেখা মেলে না। তাছাড়া আঞ্চলিক পরিচালকের সঙ্গেও দেখা হয় না। যিনি তনুকে আশা দিয়েছিলেন। তাই তনু নিরাশ মনে ফিরে আসে ঢাকা থেকে। শহরে এসে দুয়েক শিল্পীর সন্ধান পায়। কিন্তু শিল্পীরা বলে, এটা কীভাবে পেলে? নিশ্চয়ই টাকা লেগেছে, কত লেগেছে? নাকি শক্ত কোনো যোগাযোগ ছিল? তনু যেন এ সত্যটা কিছুতেই কাউকে বোঝাতে পারছেই না এই সনদটা ওকে মা সরস্বতী নিজের হাতে ধরে আঞ্চলিক পরিচালকের কাছ থেকে এনে দিয়েছে।
এমনি করেই তনুর রেডিওর তালিকাভুক্ত গীতিকার জীবন অতিবাহিত হয়। অনেকে আশা দিয়ে আশার কাঁচকলা দেখায়। অনেকে উপদেশ দেয়। আবার অনেকে হিংসায় জ্বলে-পুড়ে মরে মনে মনে।
হসুহৃদ মাগুরা