সুহৃদ সমাবেশ

সুহৃদ সমাবেশ

ঝরা শিউলির কাব্য

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০১৪

নূরন্নবী খান জুয়েল

নীল আকাশে হাওয়ায় ওড়া তুলার মতো খণ্ড মেঘ আর কাশফুলের নরম শরীরে শরতের বার্তা এসেছে। বহুদূরে দিগন্তের ওপারে আকাশ আর মাটির যেখানে মিতালি তার গা ঘেঁষে খণ্ড মেঘের আবাস। ভাদ্রের এই কাঠফাটা রোদেও হাঁটার নেশা আমাকে পেয়ে বসেছে। আর কদ্দুর কে জানে। গোধূলি নামতে বেশি দেরি নেই। তবুও রোদের তেজ দেখে মনে হচ্ছে সন্ধ্যা বুঝি আর আসবে না এ ধরায়। দীর্ঘ সময় বাসে ছিলাম। তারপর আবার এই লম্বা হাঁটাহাঁটি, একটু জিরিয়ে নিলে মন্দ হয় না। মায়ের খেয়েদেয়ে কাজ নেই। ছেলের বউ হিসেবে একেবারে খাঁটি গাঁয়ের মেয়ে চাই। চাইলেই হলো, গাঁয়ের মেয়েরা কি আর গাঁয়ের হাওয়া লাগিয়ে বসে আছে তার ছেলের জন্য? এখন খুঁজে আনো যেখানে পাও। বাবার বন্ধুর গ্রাম। সেই শৈশবে আসা হয়েছিল। তোর বাবা আমার বাবার বন্ধু আর তুই আমার...। হিরণের বলা কথাগুলো এখনও মনে পড়ে। আজ এতদিন পর, না তারা আমাকে চিনবে, না আমি চিনব তাদের। নতুন করে পরিচিত হওয়া যাবে, মজাই হবে। মফস্বলের চা ঘরগুলো বেশ মজার। এক কোণে টিভিতে দেশি-বিদেশি সিনেমা চলে। সামনে ছেলে বুড়ো, মাঝবয়সী নানা পেশার মানুষ মজা করে চায়ের কাপে চুমুক দেয়, কেউবা এক হাতের আঙুলের ফাঁকে সিগারেট রেখে অন্য হাতে আয়েশ করে চায়ের কাপে চুমুক দিতে থাকে আর দেশ, রাজনীতি, সিনেমার হিরো-হিরোইনের জীবনযাপন নিয়ে খোশগল্পে মেতে থাকে। নিশ্চিন্তপুর বাজারে এমনই একটি চা ঘরে ঢুকে পড়লাম। চায়ে চুমুক দিচ্ছি পাশে বসা বৃদ্ধ পান চিবোতে চিবোতে বললেন_ বাবাজির বাড়ি কোনে? কোনে যাইবেন? এইহানে কি নতুন আইছেন? আমি সম্মতিসূচক মাথা নাড়ি। চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে উঠে পড়লাম।
বাজার থেকে বাঁয়ে গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠোপথ ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। দু'পাশে এলোমেলো বাড়িঘর। মাঝে মধ্যে বিস্তৃত ফাঁকা মাঠ। মাঠের দিকে যতদূর চোখ যায় দূরে সাদা কাশফুলের আস্তরণ আর আকাশের খণ্ড মেঘের সহাবস্থান চোখে পড়ে। পথ চলতে সারিবদ্ধ ইউক্যালিপটাসের ফাঁকে বিকেলের সোনালি রোদ গায়ে লাগে। ষড়ঋতুর বাংলাদেশে এমন মনকাড়া দৃশ্য এ দেশের গ্রামের মেঠোপথে হাঁটতে গেলে নানা রূপে নানা রঙে চোখে পড়ে। আমি ঠিক কোন পথ ধরলে নিশ্চিন্তপুর নয়াপাড়ায় পেঁৗছতে পারব মনে করতে পারছি না। তবুও হাঁটছি। যেখানটায় থেমে গেলাম সে জায়গাটা গ্রামের শেষ প্রান্ত। এখান থেকে অন্য গ্রামে যেতে হলে বিশাল মাঠ পার হতে হবে। সূর্যটা পশ্চিমে গাছগাছালি আর এলোমেলো ঘরবাড়ির আড়াল হয়ে গেছে। আন্দাজ করতে পারছি এটাই আমার গন্তব্য। কিন্তু কোন বাড়িটা ঠিক বুঝতে পারছি না। আমি আগন্তুক জেনে কেউ এগিয়েও আসছে না। ঘরে ঘরে সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বালানোর প্রস্তুতি চলছে। দূর থেকে মাগরিবের আজান ভেসে আসছে। আরও কিছুক্ষণ দাঁড়াতেই চারদিক থেকে শাঁখ আর পূজার ঘণ্টা বেজে উঠল। এখানে পাশাপাশি দু'তিনটি গ্রামে হিন্দু লোকের বাস। ছয় সাত বছর বয়সী একটি মেয়ে এগিয়ে এসে বলল_ আপনে কারে খোঁজেন? হিরণ রায়ের বাড়ি কোনটা? মুচকি হেসে বলল_ আইসেন।
সন্ধ্যায় এ বাড়িতে সুনসান নীরবতা। আমি মেয়েটিকে অনুসরণ করে চিপা গলির ভেতর দিয়ে একটি বাড়ির সামনে দাঁড়ালাম। বাগান বিলাস এলিয়ে পড়া একটি বাঁশের ঝাড়। চিকন গলিপথ। আমি ঢোকার আগেই মেয়েটি দৌড়ে কোথায় হারাল বুঝলাম না। আমি কিছু বলার আগেই অজ্ঞাত কণ্ঠে জবাব এলো_ হিরণ দা বাসায় নেই। আপনি পরে আসেন। দীর্ঘক্ষণ হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত। ভীষণ তৃষ্ণা পেয়েছে। ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসা মিষ্টি কণ্ঠ আমার আকণ্ঠ ভরিয়ে দিল। আঁধার নেমে এসেছে। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি। উঠোনের মাঝখানে। এখন কোথায় যাব। আমার ডান পাশে কয়েক গজ দূরে তুলসী গাছ। কিছুক্ষণ আগেই সান্ধ্যকালীন প্রার্থনা সেরে কেউ তার ভেজা চুলের গন্ধ ছড়িয়ে গেছে। বামে একটু দূরে একটি দোচালা গোয়াল ঘর। সামনে বারান্দাসহ দুটি টিনের ঘর পাশাপাশি। কোনো জবাব না পেয়ে একজন তরুণী এগিয়ে এলো, সঙ্গে ছোট মেয়েটি। আপনি? হ্যাঁ, ঢাকা থেকে এসেছি। হিরণ বাড়ি নেই? আপনি... মানে তুমি? মন্দিরা রায় ও আমার ছোটবোন মনীষা। হিরণ দা আমার পিসাতো ভাই। আমরা এ বাড়িতেই থাকি। মেয়েটির এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলা কথাগুলো মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনলাম। কে যে ওকে এত সুন্দর করে কথা বলতে শিখিয়েছে। মন্দিরার কথাগুলো শরতের এই সন্ধ্যায় অনিন্দ্য সুন্দর মাদকতায় আমাকে সম্মোহিত করল।
আমার আসার কথা কি আগে থেকেই জেনেছিল হিরণের পরিবার, কে জানে। হতে পারে বাবা তার পুরনো বন্ধুকে আগে থেকেই জানিয়েছেন। পুরো পরিবার আমাকে আন্তরিক আতিথেয়তায় বরণ করল। হিরণকে দেখেছি শৈশবে। চেহারা ভুলে গেছি। হিরণ ফিরে এলো। আমরা একে অপরকে দেখছি। কাকিমা
[এরপর পৃষ্ঠা ২৩]