সুহৃদ সমাবেশ

সুহৃদ সমাবেশ

মেঘের পালক

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০১৪

রেজাউল ইসলাম হাসু

মধ্যরাত। চারদিক নিঝুম-নির্ঝর। বাইরে নির্বাক কালবাউশ পৃথিবী। ছোট ছোট আঁশের মতো গ্রামগুলো ঘুমিয়ে। কয়েক গ্রাম পর স্বপ্নপুর স্টেশন। স্টেশন হাত বাড়িয়ে ডাকছে পরীকে। এসো পরী।
কিছুদিন আগে পাওয়া বইগুলো থেকে এখনও মলাটের গন্ধ যায়নি। নতুন বইগুলো পরী বুকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে শিশুর মতো। অদৃশ্য মেঘ আর বজ্রপাতে ভেঙে চুরমার প্রায় ওর পৃথিবী। তুমুল বৃষ্টিতে ও আজ ভীষণ বিষণ্ন। ও আজ ভীষণ রিক্ত-সিক্ত একা।
ভাবনার সীমান্তে হেঁটে-হুঁটে ও আজ ক্লান্ত প্রায়। কী করবে ও? এক কঠিনতর প্রশ্ন ওকে কয়েকদিন ধরেই তাড়া করছে এভাবে। একদিকে অভিভাবকদের নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে তার দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে ও কি অভিভাবকদের নিষ্ঠুর সিদ্ধান্তকে অনুগত সন্তানের মতো মেনে নেবে? নাকি স্বপ্নকে বাস্তবরূপ দিতে স্বপ্নপুর স্টেশনের ডাকে সাড়া দেবে। আসন্ন ট্রেনের কামরায় সাহসী পালককে তুলে দেবে আলোর সন্ধানে।
ঘুমন্ত অভিভাবকদের মুখ শেষবারের মতো দেখে নেয় ও। করজোড় ক্ষমা চেয়ে নেয় মনে মনে। 'আমাকে ক্ষমা করো তোমরা। তোমাদের ইচ্ছার বলি হতে পারলাম না বলে দুঃখিত। তোমাদের মতো প্রথাগত রক্ত-মাংসের প্রাণী হতে পারলাম না বলে দুঃখিত।
জানি, তোমাদের কাছে আমি তেপান্তরের পরী। আমাকে তোমরা ভালোবাসার ফুলদানি করে সাজিয়ে রেখেছো তোমাদের হৃৎপিণ্ডে। তোমাদের জীবন দেয়ালে আমাকে টাঙিয়ে রেখেছো প্রিয় ফটোগ্রাফ করে।
কিন্তু তোমরা তো পূর্বপুরুষের প্রথাগত শৃঙ্খলে বন্দি। গতানুগতিক সুর ও সঙ্গীত মুখস্থে বিভোর তোমরা। এজন্য তোমরা বধির হয়ে গেছ ওসবে। এজন্য আমার হৃদয়ের কান্ন্নার অনুরণ তোমাদের শ্রুতি শুনতে পায় না। এজন্য আমার স্বপ্নের গান তোমাদের জাগাতে পারল না।
জানি, দরিদ্র্যের নিয়তিই তোমাদের বাধ্য করে তুলেছে দেবী বিসর্জনে। তোমাদের দেবী বিসর্জন না, চায় অর্জন। চায় মেঘে ঢাকা আকাশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সূর্যকে ছুঁয়ে দেখার প্রেরণা। চায় কুয়াশার গহ্বরে কমলা রোদের ঢেউ ছড়াতে। চায় বসন্তের মতো রঙিন হয়ে উঠতে।
আজ থেকে ষোলো বছর আগের কথা। কত বিষণ্ন গাথা সে কথা। মায়ের কাছে শোনা সে কথা। পরীর মা তখন পরীর বয়সীই। ওর মতোই চঞ্চলা চপলা এক স্বপ্নচারিণী। ওর মতোই মেঘে ঢাকা আকাশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সূর্যকে ছুঁয়ে দেখতে চেয়েছিল। ওর মতোই রক্ত-মাংসের ভেতর মানুষ হতে চেয়েছিল। কিন্তু ওই বয়সেই হাতে বিয়ের মেহেদি রাঙাতে হয়েছিল স্বপ্নকে ফিকে করে।
জানালার ফাঁক দিয়ে ওর প্রিয় পেয়ারা গাছগুলো দেখে নেয়। বাতাসে মৃদু মৃদু দুলছে ওগুলো। দেখে নেয় লাউভর্তি মাচাটা। কত সুন্দর শোভাবর্ধন করে আছে বাড়িজুড়ে। দেখে নেয় ছি-কিত-কিত খেলার দাগটানা উঠোনের দক্ষিণ কোণ।
ভোর ভাব ভাব। ঝাউবনে পাখিদের ডাক শোনা যাচ্ছে। নির্বাক কালবাউশ পৃথিবী ধীরে ধীরে কর্ণফুলী কাগজের মতো সাদা হয়ে আসছে। ছোট ছোট আঁশের মতো গ্রামগুলো তখনও জাগেনি। কয়েক গ্রাম পর স্বপ্নপুর স্টেশন। আসন্ন ট্রেনের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। পূর্বপুরুষের প্রথাগত শৃঙ্খল ভেঙে পরী পালক মেলে আলোর সন্ধানে।মধ্যরাত। চারদিক নিঝুম-নির্ঝর। বাইরে নির্বাক কালবাউশ পৃথিবী। ছোট ছোট আঁশের মতো গ্রামগুলো ঘুমিয়ে। স্টেশন হাত বাড়িয়ে ডাকছে পরীকে। এসো পরী।
হ সুহৃদ ঢাকা