সুহৃদ সমাবেশ

সুহৃদ সমাবেশ

দূরালাপন

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৫

ফরিদুল ইসলাম নির্জন

বুকের মাঝে উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরি জ্বলছে। পুড়তে পুড়তে আমার ভেতর নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। আর দু'নয়ন যেন আষাঢ়ের ঢলের মতো হয়েছে। কিছুতেই চোখের ছাতা জল আটকাতে পারছে না। হায়রে মানুষ। আর হায়রে মানুষের জীবন। কোথায় ছিলাম। আর এখন কোথায় আছি। কেমন ছিলাম। আর এখন কেমন আছি। চার দেয়ালের মাঝে ইচ্ছা হয় না আর বন্দি থাকতে; ইচ্ছা হয় না হাসপাতালের বেডে শুয়ে থেকে সময় পাড় করতে। কিন্তু বাস্তবতা খুব কঠিন, খুব নির্মম। বাস্তবতাই আমাকে বাধ্য করেছে এখানে থাকতে। বাস্তবতাই আমাকে বাধ্য করেছে এই চার দেয়ালের মাঝে আটকে রাখতে। তবে আফসোস একটাই। যাদের জন্য আমার এই করুণ পরিণতি, করুণ সংকটময় অবস্থা তাদের এখন আর কোনো খবর নেই। দুর্ঘটনা ঘটার পর শুধু ফোন করে সান্ত্বনা দিয়েছিল। কিন্তু কোনোদিনও তারা আমায় একটিবারও দেখতে আসেনি। আর যাদের আমি সময় দেয়নি, যাদের থেকে দূরে দূরে রয়েছি তারাই এখন আমার পাশে। আসলে কথায় আছে না আপন কখনও পর হয় না। আমার বেলাতেও ঠিক একই রকম হয়েছে। ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ভীষণ মনে পড়ছে। একটা সময় ফোনে কথা বলতাম অফুরন্ত কথা। কথা ছাড়া যেন চলতেই পারতাম না। কথা! কথা! কথা! সারাক্ষণ কথা। সময় নেই, অসময় নেই। শুধু কথা। হেঁটে হেঁটে পথ চলতে কথা, বাসে উঠে কথা, কলেজে গিয়ে কথা, ক্লাস রুমে ঢুকে শিক্ষককে ফাঁকি দিয়ে কানে ইয়ার ফোন লাগিয়ে কথা, ওয়াশ রুমে ঢুকে কথা। কথার ভেতর যে কী মায়া, কী মহব্বত, কী ভালোবাসা_ সবই যেন খুঁজে পেতাম আমি। কথা না বলে আমি চলতেই পারতাম না। মন অস্থির হয়ে যেত। হৃদয় ব্যাকুল হয়ে যেত। কথা বলতাম সবার সঙ্গে। একটা মেয়ের নম্বর বন্ধ থাকলে অন্য নম্বরে ফোন দিতাম। নতুন মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে কি-না অনুভূতি হতো। শুধু ফোনেই কথা বলতাম। কখনও কারও সঙ্গে দেখা করিনি। আমার এই করুণ পরিণতি দেখে মা কতইনা কী সব বলত, পাড়ার মানুষজন কত বোঝাত, বড় ভাইরা কত উপদেশ দিত। আমি তাদের কোনো কথাকে তোয়াক্কা করতাম না। চালিয়ে যেতাম শুধু কথা আর কথা। পরীক্ষার রাতে কথা বলতাম। আসলে কথা আমার নেশার মতো হয়ে দাঁড়ায়। কথা একটা সময় আমার খাবারের মতো হয়ে দাঁড়ায়। কে আমার বড়, কে আমার ছোট এগুলো কোনো কিছুই আমি বিবেচনা করিনি। আমি শুধু বিবেচনা করেছি আমাকে ফোনে কথা বলতে হবে। আমার আর কোনো বাজে অভ্যাস ছিল না, আমার কোনো নেশা ছিল না। বদাভ্যাস আর নেশা ছিল একটাই আমাকে কথা বলতে হবে। এসএসসি পরীক্ষা ফেল করলাম। মা আমাকে রুমে ডেকে নিয়ে গেল। বলল,
অসিন, বাবা তুই ভালো হবি কবে?
মা আমি তো ভালোই আছি।
তাহলে পরীক্ষায় ফেল করলি। বাবা ভালো করে পড়াশোনা কর। বলে মা আমার হাত ধরে কান্না করতে লাগল। মায়ের চোখে পানি দেখে নিজের প্রতি খুব অনুশোচনা বোধ করলাম। মাকে কথা দিলাম, আমি আর ফোনে কথা বলব না। কিন্তু মার সঙ্গে এই কথা রাখতে পারলাম না। কয়েকদিন ভালোই গেল। কিন্তু থাকতে পারলাম না। শুরু করলাম আবার কথা। আমার আসলে মাথায় তখন কী হয়েছিল। কোনো কিছুই যেন বুঝতে পারছিলাম না। এক রাতে শাহবাগে কথা বলছিলাম শাহনাজের সঙ্গে। ওর কণ্ঠটা ছিল বেশ মিষ্টি। মায়াবতী। কথার ফাঁকে ফাঁকেই খিলখিল করে হাসে। আবার গানও শোনাত। ওর গান শুনতে শুনতেই রাস্তা পার হচ্ছিলাম। গানের মগ্নতায় নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। বেখেয়ালি হয়ে গিয়েছিলাম। কখন যে বাস এসে আমায় ধাক্কা দিল আমি বুঝতেই পারিনি। মনে আছে জোরে একটা চিৎকার দিয়েছিলাম। জ্ঞান যখন ফিরল তখন আমি পঙ্গু হাসপাতালে। আমার একটা পায়ের অর্ধ অংশ নেই। এই কথার জন্যই আমার আজ করুণ পরিণতি। নিয়ম মেনে চললে আমার জীবনে আজ কালো অধ্যায় নেমে আসত না। পঙ্গু হয়ে হাসপাতালে সময় কাটাতে হতো না। হসুহৃদ ঢাকা