সুহৃদ সমাবেশ

সুহৃদ সমাবেশ


করুণ বৃষ্টিদিন

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০১৯      

জোবায়দা আক্তার জবা

চারদিক জনশূন্য। দোকানপাট বন্ধ। পড়ন্ত বিকেলে ঘরে ফেরার ক্ষণ। শূন্য বৃক্ষতলে ঝরছিল অঝোর বৃষ্টি। বাসাবাড়িতে অলস সময় কাটাচ্ছে কেউ। কেউ দুপুরের খিচুড়ি আর ইলিশ ভাজায় মুখ ডুবিয়ে আছে, কেউবা আলু পটোলের ঝোল নিয়ে গরম ভাত পাতে বসে



আষাঢ় মাসের এমনই দিনের ঝুম বৃষ্টি আর মেঘমালা পুঞ্জীভূত ছিল সেদিন। বজ্রপাত নেই, তবে গাছের পাতার রঙ কালো লাগছিল। চারদিকে জনশূন্য দোকানপাট বন্ধ। পরন্ত বিকেলে ঘরে ফেরার ক্ষণ। শূন্য বৃক্ষতলে ঝরছিল অঝোর বৃষ্টি। বাসাবাড়িতে অলস সময় কাটাচ্ছে কেউ। কেউ দুপুরের খিচুড়ি আর ইলিশ ভাজায় মুখ ডুবিয়ে আছে, কেউবা আলু পটোলের ঝোল নিয়ে গরম ভাত পাতে বসে।

প্রচণ্ড ক্ষুধা পেটে। দুপুর ৩টা বাজে। স্কুলে যা টিফিন দেয় তা এত সময় থাকে না। বৃষ্টি মেঘের কারণে ছুটি হলো এক ঘণ্টা আগেই। একদিকে ছুটির ঘণ্টার আনন্দ অন্যদিকে ঝুম বৃষ্টি। রিয়ার ভিজতে ভীষণ লোভ হলো। ওরা চার বান্ধবী- সোমা, রিয়া, মিতু আর লাবণী। একসঙ্গে ব্যাগগুলো পলিথিন বন্দি করে হাঁটতে শুরু করল তারা। কিশোরীদের মনে কোনো সংকোচ নেই। চঞ্চলতা ওদের আষাঢ়ের বৃষ্টির মতো নাচাচ্ছে।

হঠাৎই একটা ঢিল এসে পড়ল ওদের সামনে। কিছুটা ভয় পেয়ে পেছনে তাকাল। আশপাশে কেউ নেই। ভয় পেল আবার পেল না। কিছু সময় পর আরও দুটি ঢিল। এবারও পেছনে কিছু নেই। ভূত ভেবে সবাই একসঙ্গে দিল দৌড়। কোনো রিকশা নেই। বৃষ্টিতে রাস্তা ফাঁকাই বলতে হবে। কিছুদূর আসার পর আর কোনো ঢিলের অস্তিত্ব টের পেল না।

প্রথমে এলো লাবণীর বাসা। ও বিদায় জানাল। এরপর সোমা, তারপর মিতু। রিয়ার বাসা আরেকটু দূরে। ক্ষুধার মাঝে রিয়ার মনে হলো মা নিশ্চয়ই ইলিশ মাছ রান্না করছে। আর এই বৃষ্টির দিনে রিয়া শাপলা ইলিশের ঝোল ভীষণ পছন্দ করে। সেই আনন্দে একটু জোরে হাঁটতে শুরু করল সে।

চলার পথে অন্ধকার একটি চিপাগলি আছে। সে পথ ধরে এগিয়ে যেতেই হঠাৎ রিয়ার মুখ চেপে ধরে কয়েকজন তাকে একটা বন্ধ ঘরে নিয়ে গেল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই হায়েনাদের আঁচড়ে শেষ হয়ে যায় রিয়ার জীবনের স্বপ্ন।

এদিকে অনেক সন্ধ্যা নেমে এলে রিয়ার মা উদ্বিগ্ন হয়! রিয়ার পছন্দের শাপলা ইলিশের ঝোল রান্না করেছে সে। ক্ষুধায় না জানি কত কষ্ট হচ্ছে মেয়েটার সে চিন্তায় রিয়ার বাবাকে খুঁজতে পাঠায় সে। সহপাঠীদের বাড়িতে খবর নিয়েও পাওয়া যায়নি তাকে। মেয়েটা কোথায় গেল? আধো ভেজা হয়ে ছাতা মাথায় ঘুরছে রিয়ার বাবা। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিন্তাও দ্বিগুণ হয়। কর্দমাক্ত রাস্তায় টর্চলাইটের আলোয় তেমন কিছু দেখা যায় না। বৃষ্টির কারণে বিদ্যুৎ নেই। হঠাৎ স্কুল পথের সেই গলি অতিক্রম করার সময় বাবার কানে তার বাঁ পাশ থেকে কোঁকানির আওয়াজ এলো। আরেকটু হাঁটলে পায়ে বাঁধত একটা মেয়ে ছেঁড়া জীর্ণ পোশাকে পরে আছে। কাছে গিয়ে টর্চের আলোটা মুখে ধরে নির্বাক বাবা। একি! এ তো সাদা স্কুল ড্রেস রক্তাক্ত হয়ে পড়ে আছে। তখনও অনেক কষ্টে বেঁচে থাকার শেষ নিঃশ্বাস টানছে রিয়া! কী হয়েছে রিয়ার?

তার চিৎকারে আশপাশের অনেক লোক জড়ো হয়। তাকে নিয়ে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যায় তারা। সেখানে নিরুপায় হয়ে তার নিস্তব্ধ শরীর হসপিটালে নেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু না, মায়ের হাতে শাপলা ইলিশের ঝোল খাওয়া আর হয়নি রিয়ার। নিষ্ঠুর অমানুষের হাতে বলি হতে হয় মেয়েটিকে। অসভ্য কিছু কীটের হাতে জীবনের সব স্বপ্ন শেষ যায়।

কিছু বলার সময়ও পায়নি মেয়েটা। কেমন এক কৌতূহল আর অজানা আতঙ্ক নিয়ে পৃথিবীকে প্রত্যাখ্যান করল সে।

আষাঢ় আসে আষাঢ় যায়, রিয়া ফিরে আসে না।

হগোপালগঞ্জ