সুহৃদ সমাবেশ

সুহৃদ সমাবেশ


পূর্ণতা

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০১৯      

রুহুল আমিন রাকিব

দুপুরে পিচগলা তপ্ত রোদে, রেললাইনের পাশে উদাস মনে বসে আছে রাকিব। আজ কিছুই ভালো লাগছে না। ঝক-ঝকাঝক শব্দ করে রেলব্রিজ কাঁপিয়ে চলে গেল রংপুর মেইল ট্রেন। রাকিব রেললাইনের পাথর কণা একটার পর একটা ঢিল ছুড়ছে একটু দূরের লেকের পানিতে। পাথর কণা যেমন পানির অতলে হারিয়ে যাচ্ছে। রাকিবের জীবনের সোনালি স্বপ্নগুলোও তেমন করে যেন হারিয়ে যাচ্ছে হঠাৎ আসা ঝড়ে। কিছুদিন আগেও জীবনজুড়ে ছিল কবিতা, গান, গল্প! আর আজ রাকিবের জীবনজুড়ে ছেয়ে গেছে বেদনার নীল গরল। আজ কত দিন হলো হাসতেও যেন ভুলে গেছে। তবে রাকিবের জীবন এমন আঁধারে ঢাকা ছিল না। সবার মতো সেও চায় কোনো একজন প্রিয় মানুষ তার জীবনে আসুক। একটু খোঁজখবর রাখুক। তার আদুরে হাতের ছোঁয়া আর মায়াবী কণ্ঠে ভরিয়ে দিক, ভালোবাসা পাওয়ার অপেক্ষায় পিপাসার্ত হৃদয়। রাকিবের জীবনেও আজ থেকে তিন বছর আগে সেই প্রিয় মুহূর্তটি এসেছিল। তানিয়া আমিন নামের হালকা-পাতলা গড়নের একটা মেয়েকে প্রথম দেখায় ভালো লাগে রাকিবের। ভালো লাগা থেকে এক সময় ভালোবাসায় পরিণত হয়। বেশ হাসি আর আনন্দে চলছিল ওদের প্রতিদিনের ভালোবাসায় মোড়ানো মুহূর্তগুলো! ওদের এই সম্পর্কের কথা দুই পরিবারের সবার কাছে ফাঁস হয়ে যায় এক সময়। দুই পরিবারের কেউ বাধা দিত না ওদের এই সম্পর্ক চলার পথে। দেখতে দেখতে কয়েক বছর কেটে গেল। রাকিব সবসময় তানিয়া আমিনকে পুতুল বউ বলে ডাকে। রাকিবের মুখে পুতুল বউ ডাক শুনে লজ্জায় একদম লাল হয়ে যায় তানিয়া আমিন। একটা পবিত্র সম্পর্ক বলতে যা বোঝায় তার সবটাই ছিল ওদের সম্পর্কের মাঝে। ওদের দু'জনের কথা, একটাই সম্পর্ক যখন করছি, তখন বিয়ে করলে আমরা দু'জনকেই করব। নদীর পানি যেমন চলতে চলতে খুঁজে নেয় সাগরকে। রাকিব আর তানিয়া আমিনের ভালোবাসাও ঠিক তেমনি করে মিশে গেছে এক দেহে। যদিও ওদের দুটি দেহ আলাদা, তবে ওদের দু'জনের আত্মা যেন একটাই।

রোজ নানা রকম গল্প আর অপ্রয়োজনীও কথার মাঝে ডুবে থাকত অবসর সময়ে দু'জনেই। তবে সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। একদিন যে আপনজনেরা সবাই উৎসাহ দিয়ে এসেছে রাকিবের সঙ্গে রিলেশন করতে, আজ সেই তারাই তানিয়া আমিনকে বলছে, রাকিবের সঙ্গে যদি কোনো প্রকার যোগাযোগ রাখে তবে মরা মুখ দেখতে হবে ওদের সবার। কী থেকে হঠাৎ করে কী হয়ে গেল। কিছু বুঝতে পারল না রাকিব কিংবা তানিয়া আমিন। দিনে দিনে পরিবারের সবাই খুব খারাপ আচরণ শুরু করল তানিয়া আমিনের ওপর। যে মেয়ে পড়ালেখায় সব সময় ক্লাসে এক রোল থাকত। মুখে লেগে থাকত দুষ্টু মিষ্টি হাসির আলপনা, আজ সেই চাঁদ সুন্দর মুখে সবসময় লেগে থাকে বৈশাখী মেঘের কালো ছায়া। পড়ালেখায়ও মন বসে না আগের মতো। কেন এমন হলো ওদের এই পবিত্র সম্পর্কের? স্রষ্টা কেন এমন নিঠুর খেলা খেলল ওদের দু'জনকে নিয়ে। শতচেষ্টা করেও সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেল না কেউ।

সত্যিকারের প্রেম-ভালোবাসাগুলো কোনো নিয়মের বেড়াজাল মানে না। কোনো অশুভশক্তি আটকাতে পারে না দুটি আত্মাকে। শত কষ্ট সহ্য করে হলেও সবসময় এক হতে চায় দুটি মন। রাকিব ও তানিয়া আমিনের বেলায়ও তাই ঘটল। একটার পর একটা পাথর টুকরো ছুড়ে মারার কোনো এক মুহূর্তে হঠাৎ করে ফোন বেজে উঠল রাকিবের। অপরিচিত নাম্বার দেখে ফোন রিসিভ করে সালাম দিতেই ফোনের ওপাশ থেকে তানিয়া আমিন পরিচিত কণ্ঠে বলল, এই যে মিস্টার রাকিব আপনি এখন কোথায় আছেন?

আজ স্কুল ছুটির পরে আমার সঙ্গে আপনাকে দেখা করতে হবে। কি পারবেন তো দেখা করতে- তানিয়া আমিনের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে রাকিব বলল, জি পারব দেখা করতে পুতুল বউ। ফোনের লাইন কেটে গেল। আজ অনেক দিন পরে রাকিব যেন প্রাণ খুলে হাসল।

অপেক্ষার সময় যেন কিছুতে কাটতে চায় না। দেখতে দেখতে বিকেল হয়ে এলো। রাকিব স্কুল ছুটি হওয়ার একটু আগেভাগে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্কুল গেটে তানিয়া আমিনের অপেক্ষায়। কিছুক্ষণের মধ্যে স্কুল ছুটি হলো। একটা রিকশায় চড়ে হুট তুলে দিয়ে পাশাপাশি দু'জনে বসল। আহা! আজ কতদিন পরে পুতুল বউয়ের চুলের মিষ্টি ঘ্রাণ শুঁকছে রাকিব। কতদিন পর কোমল হাতের ছোঁয়া পেল।

এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে এক সময় রাকিব ও তানিয়া আমিন আনন্দ পার্কের কাছে চলে এলো। রিকশা ভাড়া মিটিয়ে পার্কের এক কোনায় নির্জন জাগায় গিয়ে মুখোমুখি বসল দু'জনে। অনেক দিন পরে একজন আরেকজনের সঙ্গে দেখা। আবেগে নিজেকে ধরে রাখতে পারল না দু'জনের কেউ। দু'জন দু'জনকে জড়িয়ে ধরে অনেক কান্না করল। আশপাশের লোকদের লোভাতুর দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকা দেখে খানিকটা লজ্জাও পেল দু'জনে। সেদিন পার্কে বসে অনেক সময় ধরে কথা বলল ওরা।

ওদের দু'জনের এই সম্পর্ক কোনোভাবে মেনে নেবে না তানিয়া আমিনের পরিবার।

তাই ওরা সিদ্ধান্ত নিল, যে করেই হোক ওদের ভালোবাসাকে জয়ী করবেই। শত বাধা এলেও ওদের এই পবিত্র আত্মার বাঁধন ছিন্ন করতে পারবে না কেউ। আগামী মাসের ৭ তারিখ ওরা পালিয়ে গিয়ে নিজেদের মতো করে বিয়ে করবে। যেই ভাবা সেই কাজ, দেখতে দেখতে এসে গেল নতুন মাসের ৭ তারিখ। মৌচাক রেলওয়ে স্টেশনে অনেক আগে থেকে অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রাকিব ও তানিয়া আমিন। দেখতে দেখতে রংপুর মেইল ট্রেন এসে দাঁড়াল। তাড়াতাড়ি রাকিব ট্রেনে উঠে তানিয়াকে হাত ধরে টেনে তুলল। পাশাপাশি সিটে বসল দু'জন। একটু পরে হুইসেল দিয়ে এগিয়ে চলল রংপুর মেইল ট্রেন। তানিয়া আমিন রাকিবের কাঁধে মাথা রেখে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। রাকিবও পুতুল বউয়ের কপালে আদরভরা চুমু এঁকে স্বপ্ন আঁকে একটা নতুন দিনের। ওদের দু'জনের জীবনজুড়ে একটা নতুন সংসারের। পবিত্র ভালোবাসা দিয়ে সাজিয়ে নিতে ওদের আগামীর জীবনের গল্প ট্রেনের গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে গন্তেব্যে...।