সুহৃদ সমাবেশ

সুহৃদ সমাবেশ


অপরাজিতা

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০১৯      

শফিকুল ইসলাম শফিক

সংসারের কশাঘাতে পিষ্ট মায়ের সুখ-আহদ্মাদের পৃথিবী। না পাওয়ার বেদনায় ভারি চারপাশ। ব্যস্ত দিনের শেষে ক্লান্ত শরীরটা নিথর হয়ে যায়। আলো-আঁধারির খেলায় অপরাজিতা। মনে তার অদম্য শক্তি। কোথাও এক চিলতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারেন না। কোথায় যেন হারিয়ে যাওয়ার বড্ড ইচ্ছে হয়। অবিনাশী কষ্টগুলো তাকে আনন্দের গান শোনায়। কষ্ট আর কষ্ট মনে হয় না। জীবনের হাসিখুশিকে জলাঞ্জলি দিয়েছেন। এমনি হতভাগা মায়ের কোলজুড়ে জন্ম নিল ফুটফুটে একটি শিশু। মা আদর করে শিশুটির নাম রাখলেন প্রাপ্তি।

বাবা উচ্চশিক্ষিত; কিন্তু অকর্মঠ। অলসভাবে জীবন কাটান। এমনকি অসৎ বন্ধুদের সঙ্গে মিশে মদপানে আসক্ত। মা দীর্ঘদিন ধরে বিসিকে কাজ করেছেন। স্বল্প আয়ে টেনেটুনে সংসার চলে। প্রাপ্তির চাচা-চাচি স্কুলের টিচার। তারাও এতদিন সংসারের হাল ধরেছিলেন। কিছুদিন আগে মা বিসিকের কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। এখন বাড়িতে সেলাই কাজ করে কিছু টাকা উপার্জন করেন। কিন্তু সংসারের টানাটানি মাঝে মাঝে তাকেও বিচলিত করে দেয়। একজনের স্বল্প রোজগারে সংসার চালানো মুশকিল। প্রতি মাসে ঘরভাড়া বাবদ কিছু টাকা পান। মেয়ের পড়াশোনার কষ্ট কিছুটা লাঘব করেন।

প্রাপ্তির শৈশবের সুন্দর দিনগুলো কেটেছে হতাশায়। বাবা ঘরকুনো ও রুক্ষ মেজাজি। মেয়েটা মোটেও বাবার ভালোবাসা পায় না। পড়ার টেবিলে মন বসে না। সে গতবার দুর্ভাগ্যবশত জেএসসি পরীক্ষায় অঙ্কে অকৃতকার্য হয়েছে। চাচা-চাচি এখন তাদের দেখভাল করেন না। টাকার অভাবে চাচির কাছেই প্রাইভেট পড়ে। যেদিন পড়া হয় না, চাচি তাকে খুব বকা-ঝকা করেন। তার সরল মন ভেঙে যায়। মাঝে মাঝে পড়তে চায় না। সে মায়ের কষ্ট উপলব্ধি করে। চোখের অশ্রু মুছে আবারও প্রাইভেটে যায়।

বাবা অসৎ পথে চলেন। মায়ের কথায় কোনো তোয়াক্কা করেন না। ঠুনকো ব্যাপারে মারধরও করেন। কখনও প্রতিবেশী ছুটে এসে উদ্ধার করে। বাবা ভাবনা-চিন্তাহীন। মা টাকা জমিয়ে একটি অটোরিকশা কিনে দিলেন। বাবা ভালোই ভালো গাড়ি চালান কয়েক মাস। মা এবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। বাবা একদিন গাড়ি বিক্রি করে মাকে বললেন, গাড়িটা চুরি হয়েছে। মা বুঝেও না বোঝার ভান করে কথাটা হজম করলেন। বাবার ওপর আর কিছুতেই ভরসা পেলেন না। ভাবেন, যা করার নিজেকেই করতে হবে। দাদি এতদিন তাদের সঙ্গে ছিলেন। এখন তিনিও আলাদা থাকেন। প্রতি ঈদে দাদি, চাচা-চাচি প্রাপ্তিকে কয়েক সেট জামা উপহার দেন। মেয়েটা খুশিতে আত্মহারা! মায়ের হয়তো এক সেট জুতা-জামা কেনার সাধ্য আছে। যাহোক, পরীক্ষার আর মাত্র কয়েক মাস বাকি। মায়ের খুব ঘনিষ্ঠ বান্ধবী রুমা। তিনিও সুখে-দুঃখে তাদের পাশে দাঁড়ান। কখনও কখনও খাবার দিয়ে যান। কিছুদিন আগে একজন অঙ্ক টিচারের সঙ্গে মিটমাট করে দিয়েছেন। টিচার খুব যত্ন সহকারে পড়ান। ইনশাআল্লাহ, মেয়েটা এবার পাস করবে। তার চাচা-চাচি ভুল বুঝতে পারবেন।

বাল্যকাল থেকেই মায়ের বিভিন্ন ডিজাইনের হাতের কাজ প্রতি প্রবল ঝোঁক ছিল। আজও তার ব্যতিক্রম নয়। তিনি আরেকটি কাজের সন্ধান পেয়েছেন। জামা প্রতি ৩০০ টাকা। আগে পেতেন ১৫০ টাকা। বাড়ির কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি মাসে ১০-১২টা জামা তৈরি করেন। সেখানে খুব শিগগিরই যোগদান করবেন। বাবাও নিজের ভুল বুঝতে পারবেন। মা ভাবেন, মেয়েটা অনেক বড় হবে। সংসারে শান্তির জোয়ার আসবে। একদিন স্বপ্ন পূরণ হবে।

হ নওগাঁ