সুহৃদ সমাবেশ

সুহৃদ সমাবেশ


লাল মোহন স্ট্রিট

প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০১৯      

হাসান মাহাদি

জীবনটা আমার, তাই জীবনের সব দায়দায়িত্বও আমার। এই কথাটার মানে বুঝতে মাধ্যমিক আর উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি। এখানে নানা প্রান্তের, নানান ধরনের অসংখ্য জীবনের সমারোহ।

একেক জনের একেক রকম জীবন। একেক স্থানের প্রতিনিধি। এদের সঙ্গে চলতে চলতে একটা বিষয় উপলব্ধি করেছি, জীবনের মধ্যে বৈচিত্র্য থাকলেও একটা জায়গায় মিল আছে, সেটা হচ্ছে- সবারই টিকে থাকতে সংগ্রাম করতে হয়। আর এভাবেই ধীরে ধীরে সে দিনের কথাটার মানে বুঝে গিয়েছি।

নিম্নমধ্যবিত্তের কিংবা নিম্নবিত্তের জীবনে বহুকাল আগে থেকেই সংগ্রাম শব্দটা জড়িয়ে আছে। এই শব্দটা শুধু বিত্তের বিপরীতে থাকা মানুষগুলোর জন্যই সত্য।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রথম দিন থেকেই আমার সেই সংগ্রাম শুরু হয়েছিল। এ শহর বড় নির্মম। এ শহরের রাস্তায় প্রতিটি কদম আমাকে ভেবেচিন্তে ফেলতে হয়। হিসাব কষে কষে প্রতিটি পয়সা খরচ করতে হয়। দশ টাকার লেকচার শিট ফটোকপি করতে গিয়েও মানি ব্যাগে তাকাতে হয় কয়েকবার। মেসে মিল সংখ্যা কমাতে মাসের অনেক সকাল-দুপুর কেটে যায় অর্ধাহারে। একটা পাকুড়া আর শিঙাড়ায় হয় সকালের নাশতা।

এ শহরে একবেলা খাবার আর একটু মাথা গুঁজে টিকে থাকার জন্য আমার মতো জীবনগুলোর অন্যতম উপায় টিউশনি। কিন্তু শুরুতে টিউশনি জোগাড় করাও অনেক কষ্টসাধ্য। যদিও আমাকে অতটা কষ্ট করতে হয়নি টিউশনি পেতে। প্রতিদিন হাঁটি। দীর্ঘপথ হাঁটি। রাস্তার ধূলিগুলো আমার বন্ধু হয়ে গেছে। সন্ধ্যার ক্ষুধাগুলো সহনীয় হয়ে গেছে। বারবার বেঁকে বসা ছাত্রটিকে পরপর তিন দিন ব্যাকরণও পড়াতে পারি। সব বিরক্তি আর বদমেজাজি ভাবগুলো নির্বাক দীর্ঘশ্বাসে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। ছাত্রের মায়ের টহলদারি আর বেশি পড়ানোর তাগাদামূলক অনুরোধে এখন আর বিব্রতবোধ করি না। সব কিছু সয়ে গেছে। তবুও আরেক বাসায় যাওয়ার তাড়া থেকেই যায়। না হলে যে আমার চলবে না।

এই জীবন-সংগ্রামে টিকে থাকতে গিয়ে যেমন অনেক তিক্ততার মোকাবিলা করতে হয়, তেমনি কিছু মধুর অনুভূতি উঁকি দেয়। শত প্রতিবন্ধকতার মাঝেও একটা গল্প লেখার সাহস জোগায়।

এই তো সেদিনের কথা। পড়াতে এসেছি। ছাত্রের বাসার সামনে একটা মানিব্যাগ পড়ে থাকতে দেখে ব্যাগটা তুলে বাসায় নিয়ে গেলাম। ব্যাগটা আমার ছাত্রের বাবার। টাকার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রও ছিল। আমি ব্যাগটা ফিরিয়ে দেওয়ার কিছুক্ষণ পর উনি আমাকে তাচ্ছিল্যভরে কিছু বকশিশ দিতে চাইলেন। আমি অপমান বোধ করলাম। আমি খুবই নমনীয়তার সঙ্গে তাকে ফিরিয়ে দিলাম। কিন্তু নিজের প্রতিবাদটুকু প্রকাশ করতে পারলাম না। কয়েকদিন আগে যে টিউশনিটা চলে যাবে যাবে করছিল, কিছুদিন পর খেয়াল করলাম আমার সে ঝুলন্ত টিউশনিটা টিকে গেছে। এখন ছাত্রের মায়ের তাগাদা আসে না। নাশতা আসে।

আমি যখন বিষয়টি বুঝতে পারলাম। তখন আর দেরি না করে টিউশনি ছেড়ে দিলাম। কারণটা ওনারা জানতে চেয়েছিলেন। সত্যটা বলিনি। আমার টাকা দরকার ঠিকই। কিন্তু ব্যক্তিত্ব ও সততাকে কোনো কিছুর সঙ্গে বিনিময় করতে আমি রাজি নই। আমি জানি আমার সামনে পুরো মাস পড়ে আছে। রুমের ভাড়া, খাবারের টাকা, লেকচার শিট ফটোকপি করার মতো নানান খরচ আমাকে ঘিরে ধরবে। আরেকটা টিউশনি খোঁজার জন্য আমাকে আবার অনেক হাঁটতে হবে।

তাবুও কেন যেন পুরান ঢাকার এই লাল মোহন স্ট্রিটে আজ প্রথমবারের মতো তীব্র দুর্গন্ধের পরিবর্তে স্নিগ্ধতা অনুভব করলাম। এই শহরে এ রকম অনেক নিভৃত গলি রয়েছে, যেখানে দাঁড়িয়ে আমার মতো অগণিত স্বপ্নচারীরা ক্যাম্পাসে যাওয়ার পথে স্বপ্ন দেখে। আর এ রকম একেকটা অনুভূতি নিয়ে শত অপ্রাপ্তির মাঝেও হাজারো গল্পের ছক আঁকে। া

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়