সুহৃদ সমাবেশ

সুহৃদ সমাবেশ


জীবনের বাঁক

প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০১৯      

আশিক মাহমুদ রিয়াদ

হেমন্ত এসেছে। উত্তর দিকে ঠান্ডা হাওয়া বইতে শুরু করেছে। আফজাল সাহেব এখন বসে আছেন ইজি চেয়ারে। তার শরীরটা আজকাল ভালো যাচ্ছে না! আট বছর আগের ঘটনা। শফিক লেখাপড়ার জন্য বিদেশ গেছে। বিদেশ যাওয়ার দুই বছর পর...



ডাক্তার সাহেব তার সাইকেল নিয়ে ছুটছেন। হাটে যাওয়ার পথে গ্রামের চায়ের দোকানদার মতির সঙ্গে দেখা হলো। মতি বলল, 'ডাক্তার সাব কই যান?' ডাক্তার সাহেব সাইকেল থামিয়ে বললেন, 'চেয়ারম্যান বাড়িতে যাচ্ছি। চেয়ারম্যান সাহেব অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।' মতি বলল, 'চেয়ারম্যান সাব অসুস্থ? আগে কইবেন না। তাইলে আফনারে দাঁড়া করাইতাম না।' ডাক্তার সাহেব, যাই মতি বলে সাইকেল চালিয়ে চেয়ারম্যান বাড়ির দিকে রওনা হলেন।

নদীবেষ্টিত গ্রামটির নাম ইলাবতী। নামের সঙ্গে গ্রামটিও বেশ সুন্দর। এই গ্রামে একটি জমিদার বাড়ি আছে। তবে এখন সেই জমিদার বাড়ির নাম পাল্টে হয়েছে চেয়ারম্যান বাড়ি। গ্রামের চেয়ারম্যান আফজাল খন্দকার এই বাড়িতে বসবাস করেন। আফজাল সাহেবের পূর্ব পুরুষ জমিদার ছিলেন। আফজাল সাহেব আজ সকালের দিকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। গ্রামের ডাক্তার মোক্তার আলীকে খবর দেওয়া হয়েছে, তিনি মাত্র এসে পৌঁছেছেন। চেয়ারম্যান সাহেব এর আগে দু'বার হার্ট অ্যাটাক করেছিলেন। দু'বারই তিনি প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন। তার বড় ছেলে নিয়ে এই বাড়িতে থাকেন। গ্রামের সবাই আফজাল সাহেবকে শ্রদ্ধা করেন এবং ভালোবাসেন। মানুষের বিপদ-আপদে তিনি যেমন মানুষের পাশে দাঁড়ান, তেমনি অন্যায়ের বিরুদ্ধেও তার কণ্ঠ সবসময় থাকে সোচ্চার।

দুই.

এলিন জানালার পাশে বসে সোয়েটারের জন্য কাপড় বুনছে। আজকাল খুব শীত পড়েছে। এলিন কাপড় বোনা রেখে ঘরের ভেতরে চলে গেল, ইরাশ ঘুম থেকে উঠে কাঁদছে। ইরাশের বয়স দুই বছর। ইরাশ কাঁদছে। এলিন আদুরে গলায় ইরাশকে শান্ত করছে। কাঁদে না বাবা...। এখনই তোমার বাবা চলে আসবে। কাঁদে না...। হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল, এলিন ইরাশকে কোলে নিয়ে দরজা খুলতে গেল। শফিক এসেছে ঘরে। ইরাশ বাবাকে দেখেই কান্না থামিয়ে দিল।

এলিন তুরস্কের মেয়ে। শফিক ও এলিন তাদের দু'বছরের ছেলে ইরাশকে নিয়ে তারা তুরস্কে থাকে। শফিক বাংলাদেশের ছেলে। আজ থেকে বছর দশেক আগে শফিক তুরস্কে এসেছিল স্কলারশিপ পেয়ে। লেখাপড়া শেষ করে এখানেই নিজের জীবন বেঁধেছে। শফিক ও এলিন দু'জনেই তুরস্কের ভাষায় কথা বলে। এলিন ভাঙা ভাঙা বাংলায় কথা বলতে পারে। এলিনের বাংলায় কথা শুনে শফিক হো হো করে হাসে।

আজ শুক্রবার। শফিক সোফায় বসে পেপার পড়ছে। ইরাশ ঘুমিয়ে পড়েছে। এলিন চা নিয়ে ঘরে ঢুকল। এলিন খুব সুন্দর করে চা বানায়। এলিন চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলল, 'তোমাকে আজ বিষণ্ণ দেখাচ্ছে।' (তুর্কি ভাষায়)। শফিক বলে, 'সকালে বড় ভাইয়া ফোন দিয়েছিল। বাবার শরীরটা ভালো না।'

এলিন বলল, 'সামনের সপ্তাহে আমাদের মিসরে যাওয়ার কথা না?' শফিক বিরক্তির সুর এনে বলে 'হ্যাঁ'। এলিন বলে, 'মিসরে যাওয়া বাদ। আমরা বাংলাদেশে যাব।' 'শফিক এলিনের দিকে তাকাল। যেন এলিন তার মনের কথাই বলেছে।'

তিন.

হেমন্তকাল এসেছে। উত্তরদিকে ঠান্ডা হাওয়া বইতে শুরু করেছে। আফজাল সাহেব এখন বসে আছেন ইজি চেয়ারে। তার শরীরটা আজকাল ভালো যাচ্ছে না!

আট বছর আগের ঘটনা। শফিক লেখাপড়ার জন্য বিদেশ গেছে। বিদেশ যাওয়ার দুই বছর পর শফিকের বাবা ছেলের বিয়ের জন্য পাত্রী ঠিক করে রেখেছিলেন। তারই বন্ধু ইব্রাহিম সাহেবের মেয়ে আনিশার সঙ্গে শফিকের বিয়ে হওয়ার কথা। বিয়ের দিনক্ষণ সব পাকা হয়ে গিয়েছিল। শফিক সময়মতো ফিরলেই বিয়ের অনুষ্ঠান হবে। কিন্তু শফিক না ফেরায় কেটে গেল অনেক দিন।

এদিকে ঘটে গেল এক মর্মান্তিক ঘটনা। শফিকের মা মারা যান। শফিক জানল না কিছুই, কোনোভাবে যোগাযোগও করা যায়নি তার সঙ্গে। হঠাৎ একদিন বিকেলে শফিক দেশে এসে তার মাকে খুঁজতে লাগল। 'মা? মা কোথায়।' আফজাল সাহেব রাগান্বিত হয়ে দু'ফোঁটা জল ফেলে বললেন, 'তোমার মা মারা গিয়েছেন এক মাস আগে।'

দশ বছর পর আজ শুধু সে একা আসেনি। সঙ্গে এসেছে এলিন এবং তার দু'বছরের ছেলে ইরাশ। দশ বছর পরেও বাবার মন একটু গলেনি। তিনি এখনও তার জায়গায় অনঢ়। শফিক এসে দাঁড়াল মায়ের কবরের কাছে। তারপর নীরবে রইল বেশ কিছুক্ষণ। এলিন তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।

এখন রাত ৯টা। শফিক তার বাবার পায়ের কাছে বসে আছে। ইরাশ আফজাল সাহেবের কোলে খেলা করছে। নাতিকে পেয়ে দারুণ খুশি। যেন তার শরীর থেকে রোগবালাই সব দূর হয়ে গেছে। এলিন বসে বসে রফিকের স্ত্রীর সঙ্গে ভাঙা ভাঙা বাংলায় গল্প করছে। শফিক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। এখন মা থাকলে যেন সব পরিপূর্ণ হতো। তার মনটা বারবার কেঁদে ওঠে মায়ের জন্য। চোখের কোণে জল আসে। সে কাঁদে নীরবে-নিভৃতে। া